বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা আনছে সিউইড

আবুল বাশার মিরাজ:পর্যটন শহর হিসেবে দেশ-বিদেশে প্রচুর খ্যাতি ও সুনাম রয়েছে কক্সবাজারের। এখন সেই বিশ্বজোড়া খ্যাতির পাশাপাশি অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হচ্ছে কক্সবাজারে। সমুদ্রসৈকতে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ শুরু হয়েছে বহু মূল্যবান শ্যাওলা বা শৈবালের(সিউইড)। যা বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা আনবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শৈবাল একটি সুষম ও সুস্বাদু, বলদায়ক ও শক্তিবর্ধক ঔষধি খাদ্য। বিশ্বের দেশে দেশে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকে সুস্বাদু সিউইড। পরীক্ষামূলক শৈবাল চাষ সফল ও টেকসই হলে শুধু কক্সবাজারের নয়, একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের মানুষ, অর্থনীতি উপকৃত হবে। পরে তা দেশের অপরাপর নদী, উপকূলবর্তী জেলা-উপজেলায় এর সম্প্রসারণ হবে।

সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের সাগরতীরে চলছে পরীক্ষামূলক সামুদ্রিক সিউইড চাষ। শহরের উত্তর নুনিয়াছড়ার মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী নদীর মোহনার চরে শৈবাল চাষ করা হচ্ছে। সিউইড মানুষের খাবার ছাড়াও ওষুধ, অয়েন্টমেন্ট, ক্রিম, দাঁতের মাজন, চকোলেট, আইসক্রিম, ডিসটেম্পার পেইন্ট, লিপস্টিক ও নারীর মেকআপসহ অনেক কাজে ব্যবহার হয়।

এদিকে সিউইড চাষ প্রসারে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) যৌথভাবে কয়েকটি কর্মশালা করেছে। এতে কৃষিবিদ ও কৃষি বিভাগের কর্মীসহ স্থানীয়দের কাছে সিউইড চাষাবাদ পদ্ধতি ও বীজ উৎপাদন থেকে যাবতীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কৃষিবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলেছেন, দেশের ৭১০ বর্গকিলোমিটারের সামুদ্রিক উপকূলীয় এলাকায় সিউইড চাষ হবে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সিউইড চাষ হচ্ছে অন্যান্য দেশেও। উন্নত মানের সিউইড ব্যাপক বাজারও পেয়েছে কানাডা ও ফিলিপাইনে। এসব দেশে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে সিউইড দিয়ে স্যুপসহ নানা খাবার তৈরি হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, সিউইড চাষ জনপ্রিয় করতে সরকার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশে ‘সিউইড চাষ’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় দেশের সাগর তীরবর্তী এলাকায়, চরাঞ্চলে সিউইড চাষের জন্য হাতে নিয়েছে ‘সিউইড চাষ’ প্রকল্প। গত বছরের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। আগামী জুনে শেষ হবে প্রকল্পের মেয়াদ। ‘সিউইড চাষ প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় টেকনাফের নাফ নদে। গত বছরের জানুয়ারিতে নাফ নদে পরীক্ষামূলক শৈবাল চাষ করে দেখা যায়, সেখানে পানির লবণাক্ততা তুলনামূলক কম। এছাড়া নাফ নদের পানির কারণে শৈবালে এক ধরনের আবরণ পড়ে যায়। এসব কারণে সিউইড চাষের পরীক্ষামূলক স্থান পরিবর্তন করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় কক্সবাজার বিমানবন্দরের উত্তর পাশে নুনিয়াছড়া সৈকতে।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাগর উপকূলে পাওয়া সিউইড নিয়ে বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথা জনসাধারণকে জানানো এবং খাবার হিসেবে এর ব্যবহার ও চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা। ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ ও উৎসাহ দেখা গেছে। এতে সংশ্লিষ্ট চাষি উপকৃত হবেন। অল্প খরচে, অল্প সময়ে যথেষ্ট লাভবান হবেন কৃষক।

গবেষকরা বলছেন, জোয়ারভাটার লবণাক্ত পানিতে দ্রুত বাড়ে সিউইড। মাত্র দুই সপ্তাহে এগুলো আহরণ করা হয়। চরের অনেক বড় জায়গাজুড়ে রশি দিয়ে চাষ করা হচ্ছে সিউইড। এতে ভালো ফলনও দেখা যাচ্ছ । পর্যাপ্ত পরিমাণ সিউইড উৎপাদন হলে তা রফতানির মাধ্যমে আয় করা যাবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। সেই সম্ভাবনার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। একজন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদ বলেছেন, ‘পুষ্টিতে ভরপুর এসব সিউইড। তবে অনেকে জানেন না এগুলো একধরনের খাবার। লোকজনের মধ্যে শৈবালের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। রাখাইন গৃহবধূরাও আগ্রহভরে এই সিউইড কেনেন। সিউইড ভালো করে ধুয়ে কাঁচামরিচ দিয়ে চাটনি করলে মজাদার খাবার হয়। সিউইড কোনো মূল ও ফুল নেই। সাগরের পানি থেকে শরীরের সব অংশ দিয়ে পুষ্টি গ্রহণ করে এরা বৃদ্ধি পায়। সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও ইনানীসহ কক্সবাজার সৈকতে প্রচুর সিউইড পাওয়া যায়। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ গাছেও কিছু শৈবাল জন্মায়। তিনি বলেন, সিউইড পর্যাপ্ত ভিটামিন আছে। এসব ভিটামিনের মধ্যে বিটা ক্যারোটিন, বি-গ্রুপের ভিটামিন, ভিটামিন সি, ডি, ই ও কে রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে ঔষধি গুণও।

‘জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিউইড চাষের মূল্যমান ৬০৮ হাজার কোটি টাকার অধিক। প্রত্যাশা থাকবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকার, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ গুরুত্বসহ দেশের সমুদ্র উপকূল, উপকূলের চরাঞ্চাল, হাওর, জলাশয়, বড় বড় পুকুর-দীঘিতে সিউইড চাষের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষককে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখা। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন সিউইড চাষি। তাহলেই সিউইড চাষ সম্প্রসারিত ও টেকসই হবে।

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort