টবে ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি

কৃষিবিদ মো: মুকুল মিয়া:ড্রাগন বা পিতায়া ফল হচ্ছে এক ধরনের ফণীমনসা বা পাতাবিহীন ক্যাক্‌টাস প্রজাতির গাছের ফল। এই ফলটি একাধিক রঙের হয়ে থাকে। এই ফলের নাম শুনতে ভয়ংকর লাগলেও নরম শাঁস ও মিষ্ট গন্ধ যুক্ত ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল গোলাপি বর্ণের এই ফল খেতে অনেক সুস্বাদু আর তার সাথে এই ফল ভিটামিন সি, মিনারেল পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এবং ফাইবারের উৎকৃষ্ট উৎস।

ফলের ভিতরের অংশ লাল ও সাদা হয়। শাঁসের মধ্যে ছোট ছোট নরম কালচে রঙের বীজ থাকে। এই ফলের খোসার উপরে লাল রঙের ছোট ছোট যে পাতাগুলো রয়েছে সেগুলো দেখতে অনেকটা ড্রাগনের মত বলেই একে ড্রাগন ফল বলা হয়ে থাকে। ফলটি এখনও আমাদের দেশে বেশি পরিচিতি লাভ করেনি এবং দামও অনেক বেশি। আপনি চাইলে বাড়ির ছাদ বাগানে বড় টবে বা ড্রামে ড্রাগন ফল চাষ করে শখ পুরণ ও পুষ্টি আহরণ দুটোই করতে পারেন। নিম্নে ছাদ বাগানে ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হলো।

ফলটির উৎপত্তি ও বিস্তার:
এই ফলটি প্রথমে আসত নেটিভ মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। বর্তমানে এটি পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দেশগুলোতে যেমন ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং আরও সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে চাষ হয়। আমাদের দেশে সর্বপ্রথম ২০০৭ সালে থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে এই ফলের বিভিন্ন জাত আনা হয়। ফলটির বাইরে  গণচীন-এর লোকেরা এটিকে ফায়ার ড্রাগন ফ্রুট এবং ড্রাগন পার্ল ফ্রুট বলে, ভিয়েতনামে সুইট ড্রাগন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে ড্রাগন ফ্রুট, থাইল্যান্ডে ড্রাগন ক্রিস্টাল নামে পরিচিত। অন্যান্য স্বদেশীয় নাম হলো স্ট্রবেরি নাশপাতি বা নানেট্টিকা ফ্রুট। ড্রাগন ফল একটি বিদেশি ফল হলেও বর্তমানে আমাদের দেশে শহরাঞ্চলে বেশ পরিচিত লাভ করেছে।

চাষ পদ্ধতিঃ
প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থসমৃদ্ধ বেলে-দোঁআশ মাটিই ড্রাগন ফল চাষের জন্য উত্তম। টবে ড্রাগন ফলের কাটিং লাগানোর জন্য ২০ ইঞ্চি ড্রাম বা টব সংগ্রহ করতে হবে। কারণ এই আকারের ড্রামে চারা ভালোভাবে শিকড় ছড়াতে পারবে আর তাতে ফলনও অনেক ভালো হবে। টবে বা ড্রামে যাতে পানি না জমে সে জন্য ড্রামের তলায় ৪-৫ টি ছোট ছিদ্র করে নিতে হবে এবং ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এবার ২ ভাগ বেলে দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ৪০-৫০ গ্রাম টি.এস.পি সার এবং ৪০-৫০ গ্রাম পটাশ সার একত্রে মিশিয়ে টব বা ড্রাম এমনভাবে ভর্তি করতে হবে যেন উপরে পানি দেওয়ার জন্য একটু (৩-৫ সে.মি) খালি থাকে। এরপর মাটির সাথে অন্যান্য উপাদান ভালোভাবে মেশানোর জন্য পানি দিয়ে ১০-১২ দিন রেখে দিতে হবে। অতঃপর মাটি কিছুটা আলগা করে দিয়ে পুনরায় ৪-৫ দিন একইভাবে রেখে দিতে হবে।

টবের মাটি ঝুরঝুরে হয়ে গেলে ড্রাগনের কাটিং এর চারা উক্ত টবে ৮-১০ সে.মি. গভীর করে রোপন করতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উচু করে হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে। যাতে গাছের গোড়া দিয়ে বেশী পানি না ঢুকতে পারে। একটি সোজা কাঠি দিয়ে গাছটিকে বেধে দিতে হবে। ড্রাগন ক্যাক্টাস জাতীয় গাছ তাই পানি খুব কম দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি কখনই জমে না থাকে। কাটিং লাগানোর পরে টব বা ড্রামটিকে মাটিতে বা ছাদে রৌদ্রজ্বল জায়গায় রাখতে হবে।

কাটিং স্থাপনের সময়:
ড্রাগন ফল সাধারণত সারা বছরেই চাষ করা যায়। এটি মোটামুটি শক্ত প্রজাতির গাছ হওয়ায় প্রায় সব ঋতুতেই চারা রোপন করতে পারেন। তবে ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করে ভালো ফলন পেতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে চারা রোপন করলে আপনি অবশ্যই সুফল পাওয়া যায়।

ড্রাগন ফলের কাটিং বা চারা প্রাপ্তির স্থান:
ড্রাগন ফলের সুস্থ ও রোগমূক্ত কাটিং বা চারা বিভিন্ন যায়গায় যেমন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে অবস্থিত সুবৃহৎ জার্মপ্লাজম সেন্টারে, সারাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টারে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন গবেষণা কার্যালয়ে, এছাড়াও অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন নার্সারিতে পাওয়া যাবে।

ড্রাগন ফল চাষে গাছের পরিচর্যাঃ
ড্রাগন ফল গাছের সঠিক পরিচর্যা না করলে ফলন ভালো হবে না। ড্রাগনের গাছের কান্ড লতানো প্রকৃতির। তাই চারা লাগানোর পর গাছ কিছুটা বড় হয়ে গেলে গাছকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য খুঁটি বা পিলার পুঁতে দিয়ে পিলারের মাথায় গোলাকার কোনোকিছু যেমন টায়ার বেঁধে দিতে হবে, এতে করে গাছ সহজেই ঢলে পড়বে না। গাছে অতিরিক্ত বা রোগাক্রান্ত শাখা বের হলে কেটে ফেলতে হবে। গাছের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। যদিও ড্রাগন ফল গাছে তেমন একটা রোগ-বালাইয়ের আক্রমন হয় না তবে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য যত্ন নিয়মিত নিতে হবে। এটি ক্যাকটাস জাতীয় গাছ বলে চাষে খুব বেশি পানি দিতে হয় না। কোনোভাবেই গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেয়া যাবে না।

ফল সংগ্রহ:
ড্রাগন ফলের কাটিং বা চারা রোপনের ১ বছর থেকে ১৮ মাস বয়সে ফল সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল ফোঁটার মাত্র ৩৫-৪০ দিনের মধ্যেই ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়। প্রতি কেজি ফলের মূল্য প্রায় ৫০০-৭০০ টাকা।

ড্রাগন ফলের ব্যবহারঃ
ড্রাগন ফল ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে খেলে ভালো লাগে। ফলকে ২/৪ টুকরা করে চামচ দিয়ে কুরে এর শাঁস খাওয়া যায়। এছাড়াও খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে কাঁটাচামচ দিয়ে খাওয়া যায়।

ড্রাগন ফলের পুষ্টিগুণ:

১) ড্রাগন ফলে ভিটামিন সি ও বি থাকায় তা আমাদের হাড়, দাঁত, ত্বক ও চুলের পুষ্টি যোগায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও স্ক্যার্ভি, জ্বর, মুখের ঘা ইত্যাদি সমস্যায় এই ফলটি বেশ উপকারী।
২) এই ফলে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম আছে যা আমাদের শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৩) ফলটিতে ক্যালরি এবং ফ্যাট কম থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এবং যাদের অতিরিক্ত স্বাস্থ্য তাদের জন্য বেশ উপকারী।
৪) ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে বায়োফ্লাভোনয়েড পাওয়া যায় যা ক্যান্সার বিশেষ করে ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে বেশ উপকারী।
৫) ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে যা যকৃত, পাকস্থলী, দাঁত ও দাঁতের মাড়ি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়াও অল্প বয়সে ত্বক বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
৬)ড্রাগন ফল আমাদের শরীরের বিভিন্ন খারাপ কোলেস্ট্রল নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগ থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে ইত্যাদি।
==============
লেখক:সায়েন্টিফিক অফিসার
প্রজনন বিভাগ
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭
This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort