কৃষি, কৃষিবিদ ও জীবন

কৃষিবিদ মো: মোরশেদ আলম জন:মানব সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন পেশা, কৃষি। সৃষ্টির শুরু থেকে জীবিকা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য মানুষ নির্ভর করেছে কৃষির উপর। যুগে যুগে মানব সভ্যতার চালিকা শক্তি হিসেবে কৃষি বাড়িয়ে দিয়েছে তার সহযোগীতার হাত। অন্নের প্রয়োজনে ফলিয়েছে শষ্য, শাক-সব্জী, দুগ্ধ, মাংশ, মাছ, বাসস্থানের জন্য দিয়েছে বৃহৎ গাছ-পালা, ডাল-শাখা-প্রশাখা, বাঁশ-বেত, বস্ত্রের জন্যে দিয়েছে তুলা-কার্পাস-পাট।

কালের আবর্তে কৃষি আজ একটি বিজ্ঞান, আর এই বিজ্ঞানের কান্ডারী কৃষিবিদগন। কৃষিবিদগন কাজ করেন এমন কিছু নিয়ে যাদের প্রান আছে কিন্তু কথা বলতে পারে না। প্রান থাকলেও তারা বলতে পারে না কি তাদের সমস্যা, আর কৃষিবিদগন তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞ্যান দিয়ে সেসব সমস্যা নিয়ে কাজ করে আবিষ্কার করেন সমাধান।

বিশ্বব্যাপী বাড়ছে মানুষ, মানুষের জীবনের চাহিদা, কিন্তু কমছে চাষযোগ্য জমির পরিমান, এই হ্রাসমান জমি থেকে কিভাবে পূরন করা যায় মানুষের ক্রমবৃদ্ধিমান চাহিদা! সমাধানে এগিয়ে আসে কৃষিবিদ তথা কৃষিবিজ্ঞানীগন আবিষ্কার করেন শষ্য, গৃহপালিত পশু-পাখী, মৎসের নতুন নতুন জাত; আবিষ্কার করেন উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি, যাতে উৎপাদিত হয় চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন। দারিদ্র-বিমোচন আর উন্নয়ন উভয় ক্ষেত্রে কৃষিবিদদের নিরলস প্রচেষ্টা।

আধুনিক শংকরায়ন পদ্ধতির সহযোগীতায় আবিষ্কার করছে উচ্চ ফলনশীল ধান, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য শষ্য, গবাদী পশু, হাঁস-মুরগী, মৎস, তূলা, পাটের জাত। স্বল্প জায়গায় অধিক উৎপাদন পদ্ধতি আবিষ্কারের ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে কৃষিবিদগন এগিয়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতা, এগিয়ে যাচ্ছে কৃষি। বিশ্বব্যাপী মানুষ ঝুঁকে পড়ছে প্রাকৃতিক তন্তুর উপর, এজন্য কৃষিবদগন আবিষ্কার করছে উন্নত ও পরিবেশবান্ধব পাট, তূলার জাত। পরিবেশ রক্ষায় আবিষ্কৃত হয়েছে ‘জিওজুট’, যা ব্যাবহার করা হচ্ছে নদীর পাড় সংরক্ষনে, রাস্তা-ঘাট, ইত্যাদী প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষনে। যে কোন দূর্যোগের পর জীবিত মানুষের প্রথম চিন্তা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান আর জীবিকা নির্বাহের উপায় নিয়ে, আর কৃষিবিদগন এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় সমাধান নিয়ে। বন্যা-খরা সহনীয় জাতের শষ্য, কম সময়ে উৎপাদিত গবাদীপশু, হাঁস-মুরগীর জাত এবং তাদের উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে সহযোগীতা করে বিপদগ্রস্থ মানুষের। পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে কৃষিবিজ্ঞানীগন।

আজকের কৃষি আধুনিক জীবন-ব্যবস্থার এক পরীক্ষিত বন্ধু। বাড়ির ছাদে অথবা উঠানে বাগান শুধু খাদ্য সরবরাহ অথবা সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি নয়, বরং অক্সিজেনের আঁধারে পরিনত হয়। শুধু বাগানের মালিক নয়, বরং আশেপাশের পরিবেশকে করে সতেজ। সিংগাপুর, মালেশিয়ার মত দেশের শহর গুলি শুধুমাত্র অট্টালিকার শহর নয়, পাশাপাশি সারি সারি বৃক্ষ আচ্ছাদিত করে রেখেছে শহরগুলিকে। নাগরিকগনের জন্য নিশ্চিত হয়েছে সতেজ পরিবেশে বুকভরে নিঃস্বাস নেয়া। যুক্তরাষ্ট্র, হল্যান্ড, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড সহ উন্নত বিশ্বে সরকারের সহযোগিতায় এবং কৃষিবিজ্ঞানীদের মেধায় গড়ে উঠেছে উন্নত প্রযুক্তির শষ্য, দুগ্ধ-মাংশের খামার আর এসব খামারীদের সেসব দেশে গন্য করা হয় উচ্চবিত্ত হিসেবে।

বাংলাদেশের অনেক উচ্চবিত্ত এখন কৃষির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে, গড়ে উঠছে পোল্ট্রি ও মাছের হ্যাচারী, বৃহৎ ডেইরী খামার, শষ্য ও শাক-সব্জীর খামার। দেশ রপ্তানী হচ্ছে নানা সব্জী, মাছ ইত্যাদী। এসব খামারে ব্যাবস্থাপনায় নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে কৃষিবিদগন, ফলে গড়ে উঠছে বড় বড় কৃষি উদ্যোক্তা। একদিকে যেমন পূরন হচ্ছে মানুষের জীবনব্যবস্থার চাহিদা, তেমনি গতি পাচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীন অর্থনীতি।

দেশের কৃষি উন্নয়নের এবং অর্থনীতির উন্নয়নের নীতি প্রনয়নে কৃষিবিদদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে অনেক। একটি দালান স্থাপন করতে তার নক্সা একজন আর্কিটেক্টের কর্তৃক অনুমোদিত হওয়া বাধ্যতামূলক, একজন রোগী মারা গেলে তার মৃত্যুর কারন হিসেবে একজন ডাক্তারের সনদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু হাজার কোটি বিনিয়োগে স্থাপিত খামার স্থাপন এবং তার তত্ত্বাবধানের জন্য কৃষিবিদদের কোন সনদ অথবা অনুমোদন অথবা সম্পৃক্ততা বাধ্যতামূলক নয়। প্রতিনিয়ত খামারে দেখা দেয় বিপর্যয় যা এড়ানো সম্ভব কৃষিবিদদের সম্পৃক্ততায়। খামার স্থাপনার শুরু থেকে খামার পরিচালনায় কৃষিবিদদের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক হলে উপকৃত হবে খামার ও সরকার উভয়েই।

মনে রাখা প্রয়োজন কৃষি ব্যবস্থা বর্তমানে একটি সংবেদনশীল বিজ্ঞান, আর কৃষিবিদদের নিবিড় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে পারে শক্তভিত্তির উৎপাদন ব্যবস্থা আর চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সরকারী নানা প্রণোদনা সত্ত্বেও দুগ্ধ-মাংশের খামার একটি শিল্পের রূপ নিতে ব্যর্থ। দেশের অভ্যন্তরীন চাহিদা পূরনে আমদানী করতে হচ্ছে গুঁড়ো দুধ, মাংশের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিবেশী দেশের উপর। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মূল্যবান বৈদেশীক মূদ্রা। নীতিমালায় কৃষিবিদদের পরামর্শ এবং উৎপাদন পর্য্যায়ে তাঁদের তত্ত্বাবধন বাধ্যতামূলক করা হলে দেশ এগিয়ে যাবে, মেধাবী জাতি গঠনে আরও মনোযোগী হবে কৃষিবিদগন, তাঁদের মেধায় জীবন হবে গতিময়। কৃষি ও জীবন ওতোপ্রতভাবে জড়িত, আর কৃষিবিদগন এই গতিময় জীবনের কারিগর। কৃষি হউক উন্নত এবং শান্তিময় জীবনের হাতিয়ার, সংশ্লিষ্ট সকলের এই প্রত্যাশা।

লেখক:সভাপতি, বাংলাদেশ এনিম্যাল এগ্রিকালচার সোসাইটী (BAAS) এবং আহবায়ক, প্রাইভেট সেক্টর এগ্রিকালচারিস্টস (PSA)
Email:This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort