যান্ত্রিকীকরণ সঠিকভাবে হলে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানীতে বিশ্বে এক নম্বর হবে বাংলাদেশ

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৭ কোটি। তখন প্রতি বছর দেশে ছিল প্রচন্ড খাদ্যাভাব। ক্ষুধা দুর্ভিক্ষে মারা যেত অসংখ্য মানুষ। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বহুগুণে কমেছে আবাদী কৃষি জমির পরিমাণও। তারপরও বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের কারণেই এসেছে কৃষির এত সাফল্য।

যে লাঙল-জোয়াল আর ‘হালের বলদ’ ছিল কৃষকের চাষাবাদের প্রধান উপকরণ সে জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষাবাদের কারণে একদিকে যেমন সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে তেমনি ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে। ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। কেবল জমি চাষই নয়, জমিতে নিড়ানি, সার দেওয়া, কীটনাশক ছিটানো, ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও ধান থেকে চাল সবই আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে।

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর হিসাব মতে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির ৯০ ভাগ চাষ হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। তবে অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে এখনো অনেক পিছিয়ে দেশের কৃষকরা। কিছু কিছু সমস্যার কারণে যান্ত্রীকীকরণের বাধা তৈরি হয়েছে। কৃষিভিত্তিক জনপ্রিয় অনলাইন এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবুল বাশার মিরাজ।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি কেন ব্যবহার করব আমরা?
ড. আনিসুর রহমান: দিন দিন আমাদের জমি কমে যাচ্ছে, কিন্তু খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় উপুর্যপুরি কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে চাষাবাদের সব পর্যায়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম:বাংলাদেশের কৃষিতে কি কি যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে?
ড. আনিসুর রহমান: সেচ পাম্প, ট্র্যাক্টর, থ্রেসার, কম্বাইন হারভেস্টর, রিপার, ট্রান্সপ্লানটার, উইডার প্রভৃতি। তবে শুধু যন্ত্র আবিষ্কার করণেই হবে না, কৃষক যদি সেটি গ্রহণ না করে তাহলে তো এটা কোনো কাজে আসবে না। কাজেই উদ্ভাবন বা নতুন আবিষ্কার এমন হতে হবে যেন তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক সহজে ব্যবহার করতে পারে সেদিকেও আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষি যন্ত্রের অত্যাধিক দাম, কৃষক তো কিনতেই পারছেন না, তাহলে যান্ত্রিকীকরণ হবে কিভাবে?
ড. আনিসুর রহমান: কিছু কিছু যন্ত্রের দাম সত্যিই অনেক বেশি। কিন্তু সব যন্ত্র যে সবারই কিনতে হবে, তা কিন্তু নয়। ধরুন, মিনি কম্বাইন হারভেস্টর, এটির দাম ৭ থেকে ৮ লাখ। এটি দিয়ে একটি গ্রামের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সমবায় পদ্ধতিতে এটি কিনে কৃষকরা ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও সরকারের কৃষি ভতুর্কিও চালু আছে এ যন্ত্রগুলো কেনার জন্য, সেটিও গ্রহণ করতে পারেন তারা।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষি যন্ত্রের ভতুর্কির বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?
ড. আনিসুর রহমান: বর্তমানে সরকারের ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি জনপ্রিয়করণ প্রকল্প চালু রয়েছে। যন্ত্র আর অঞ্চলভেদে ২৫ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ভতুর্কি দিচ্ছে সরকার। তবে কৃষি ভতুর্কি সঠিক কৃষক পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কিনা সেটাও সরকারের নজদারিতে রাখা দরকার।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: পোস্ট হারভেস্ট ক্ষতি পোষাতে কিভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে?
ড. আনিসুর রহমান: গবেষণায় উঠে এসেছে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চাল, গম, ভুট্টা, পেয়াঁজ, আলু, সব ধরনের ফল ও সবজির উৎপাদন ছিলো প্রায় ৬ কোটি টন। এসব খাদ্যশস্য উৎপাদক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতেই নষ্ট হয়েছে প্রায় ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টন। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩০ হাজার ৪ শত কোটি টাকা। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটি করতে পারলে এ ক্ষতি অর্ধেকে আনা যাবে। তবে আমাদের এখন শুধু খাদ্য শস্য উৎপাদনেই মনোযাগী নয় বরং খাদ্য শস্য সংরক্ষণেও মনোযোগী হতে হবে। দেশের এ অপচয় রোধ করা গেলে খাদ্যশস্য আমদানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলেও মনে করেন এই গবেষক।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: খাদ্যশস্যের এ অপচয় কিভাবে রোধ করা যেতে পারে?
ড. আনিসুর রহমান: খাদ্যশস্যের অপচয় দেশের প্রবৃদ্ধিকে খেয়ে ফেলছে। অপচয়ের মাধ্যমে মানুষের অধিকার ও খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করছে। খাদ্যশস্যের এ ধরনের অপচয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যেমন হুমকি, তেমনি খাদ্য অধিকারকেও বঞ্চিত করছে। সার্বিকভাবে পুষ্টি নিরাপত্তাকে করছে বাধাগ্রস্থ করছে। আর দেশের অর্থ ও সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। খাদ্যের এ অপচয়রোধে রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। শস্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ছোট ছোট প্রযুক্তি দ্রত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। আর কৃষকের ভর্তুকি বাড়াতে হবে।
 
এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষি যন্ত্রের প্রদশর্নী এ ক্ষেত্রে কিভাবে ভুমিকা রাখতে পারবে?
ড. আনিসুর রহমান: অবশ্যই, কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার এক্ষেত্রে ব্যাপক ভুমিকা রাখতে পারবে। আর সেটি হচ্ছে না তাও বলা যাবে না। তবে একটি বিষয় গ্রাম পর্যায়ে সে প্রদশর্নীর ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল তখনি এর সুফল কৃষকরা পাবেন।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: মেকানাইজেশন ভিলেজ কৃষির যান্ত্রিকীকরণে কতখানি ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন?
ড. আনিসুর রহমান: সত্যি কথা পরীক্ষামূলক মেকানাইজেশন ভিলেজ কৃষিতে বিপ্লব ও নব দিগন্ত উম্মোচন করছে। মেকানাইজেশন ভিলেজে ধান উৎপাদনে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কৃষক বীজ, সার ও শ্রমিক খরচ সাশ্রয় করছে। ধানে উৎপাদন খরচ কমেছে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ। কৃষক ধানের অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হচ্ছেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে যে জমিতে ধান রোপনে ১২ জন শ্রমিকের ৫ ঘন্টা লাগতো সেখানে এ পদ্ধতিতে ২ জন শ্রমিক মাত্র দু’ ঘন্টায় সে ধান রোপন করেছেন। এ ছাড়াও উইডার, দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র ও ধান কাটার রিপার ব্যবহার করে ধান উৎপাদনের খরচ কমেছে প্রায় ৪০ ভাগ। বাংলাদেশের সকল ইউনিয়নে এটি করতে পারলে এর সুফল আর বিস্তৃত হবে বলে আমি করি।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষি ক্ষেতে ড্রোনের ব্যবহার সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
ড. আনিসুর রহমান: সাধারণত আপনার চোখ যতদূর যাবে আপনি তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া সময়েরও একটা ব্যাপার আছে। এই দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে আপনি দিনে আপনার বাগানের নির্দিষ্ট কতটুকুর উপর নজর রাখতে পারবেন। কিন্তু ধরুন বাগানের অন্য কোন অংশে আপনার যাওয়া হলো না আর সেখানে কোন সমস্যা হয়ে গেলো, এখন আপনি কি করবেন। এক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করতে পারবেন। এর মাধ্যমে খামারের বেড়া কোথাও ভেঙে গেলো, কোথায় পানি কমে ফসল শুষ্ক হয়ে গেছে, খামারের কোন অংশে ফসল কম হয়েছে অথবা কোথায় মাটির চেহারা দেখতে কেমন সবই উঠে আসবে। এককথায় ড্রোনের ব্যবহার কৃষির চেহারা বদলে দিতে পারে।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: শ্রমিক সংকট নিরসনে যান্ত্রিকীকরণের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?
ড. আনিসুর রহমান: কৃষি শ্রমিকের একটি বড় অংশ শিল্প ও পরিবহন খাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকরা শহরমুখী হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক সংকট ও কৃষি উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে হলে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। যেভাবে একদিকে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমছে, অন্যদিকে কৃষি শ্রমিক শহরমুখী হচ্ছে, সেক্ষেত্রে শুধু উন্নত জাত ও সার ব্যবহার করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সেজন্য ফসল উৎপাদন, ধান কাটা ও কর্তন পরবর্তী কাজগুলোয় সঠিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অপচয় রোধ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষির অন্য সেক্টরে মেকানাইজেশনে এখনও পিছিয়ে আছে, এ বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আনিসুর রহমান: কৃষি বলতে শুধু শস্য উৎপাদন নয়। মৎস্য, লাইভস্টক প্রভৃতি কৃষি সেক্টরের মধ্যেই পড়ে। সকল সেক্টরেই যান্ত্রিকীরণ দরকার। বহিবিশ্ব সকল সেক্টরেই বিষয়টি এগিয়েছে। বাংলাদেশের মত কৃষি প্রধান দেশে আমাদের এ বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্ব দিলে কৃষিতে আমাদের আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আমার মনে হয়।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: বিসিএসে কৃষি প্রকৌশলী (টেকনিক্যাল ক্যাডারে) নিয়োগের দাবি গ্রাজুয়েটদের, এটা কতটা যৌক্তিক বলে মনে করেন আপনি?
ড. আনিসুর রহমান: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরো বহুলাংশে কৃষি যন্ত্রাংশের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। যা বর্তমান সরকারের অগ্রগণ্য বিষয়ও বটে। সেটা করতে হলে অবশ্যই প্রতিটি উপজেলায় দক্ষ কৃষি প্রকৌশলী এবং সেই সঙ্গে দক্ষ মেকানিকের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কিন্তু বিসিএসে টেকনিক্যাল ক্যাডারে এ সুযোগ না থাকায় কৃষি প্রযুক্তি ও যান্ত্রীকরণের সুযোগ পাচ্ছে না কৃষকরা। কৃষি প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের এটি চালুর বিষয়ে বার বার রাস্তায় নামেতে দেখেছি। আমি মনে করি কেবল আশ্বাস নয়, সরকার ও কৃষিমন্ত্রীর বিষয়টি আমলে নিয়ে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নেওয়ার সময় এখনই।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: কৃষিতে শতভাগ যান্ত্রিকীকরণ হলে বাংলাদেশের কৃষিতে কেমন পরিবর্তন হবে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আনিসুর রহমান: দেখেন শতভাগ যান্ত্রিকীকরণ যদিও সম্ভব নয়, তবুও আমাদের সেটির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের সবসময় চিন্তা করতে হবে কম ব্যয়ে যেন অধিক ফসল ফলানো যায়। আর উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব কেবল যান্ত্রিকীরণের মাধ্যমেই। আমাদের সোনার দেশ, আমরা যেখানেই বীজ ফেলি সেখানেই ফসল ফলে। পৃথিবীর কোন দেশে এমনটি হয় না। এ কারণে কৃষি নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি। যান্ত্রিকীরণের মাধ্যমেই কৃষিতে আমাদের সাফল্য আসছে। ভবিষ্যতের কথা বলা দুরুহ তবে ধারণা করতে পারি, যান্ত্রিকীকরণ সঠিকভাবে বিস্তৃত হলে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানীতে বিশ্বে এক নম্বর দেশ হবে বাংলাদেশ।

এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকম: সময় দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আনিসুর রহমান: আপনাকে ও এগ্রিলাইফ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort