তুলার দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি

কৃষিবিদ কামরুল হাসান কামু:মানুষের ৫ টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্যের পরই বস্ত্রের স্থান। এ গুরুত্ববহ শিল্পে, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় অবস্থানে। রপ্তানিমুখী এই শিল্পকে নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থায় আসতে হয়েছে। মূলত ষাটের দশকে যাত্রা শুরু হলেও সত্তরের দশকের শেষ দিকে রপ্তানীমুখী শিল্পের মর্যাদা লাভ করে। এ শিল্পের উন্নয়নের ঊর্ধ্বমুখী স্রোতের ফলে বর্তমানে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্পখাত।

সুলভ শ্রমের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী স্থানে (Hot Sourcing Spot) পরিণত হয়েছে। ফলে বস্ত্রশিল্প এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। অথচ এই শিল্পের কাঁচামালের সিংহভাগ আমদানি নির্ভর। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে যে কোন সময় এই শিল্পে নানান বাধা বিপত্তি আসতে পারে। তাছাড়া চলমান বৈশ্বিক রাজনীতিও পণ্যের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে দেখা যাচ্ছে। অনেকে যুক্তি দেখাতে পারেন, সুতা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় এমন অনেক দেশ আছে যারা বস্ত্রশিল্পে উন্নত অবস্থানে আছে। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে ঐসব দেশে রপ্তানিমুখী শিল্প অনেক, এক শিল্পে বাধা আসলে অন্য শিল্প ঠিকই অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম। সেদিক থেকে আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি।

বস্ত্রশিল্প, এদেশের মানুষদের বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে, আজ প্রায় ৮০% গার্মেন্টস কর্মী নারী। জাতির এই বৃহদাংশের কথা মাথায় রেখে, এই শিল্পের স্থায়ী উন্নতির কথা ভাবতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)-এর তথ্য অনুসারে বর্তমান বস্ত্রখাতের ৩৮৩ টি সুতাকলের জন্যে বিদেশ থেকে সুতা আমদানি করতে হয়; এতে প্রায় ১২০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে, সুতার বর্তমান উৎপাদন দেশীয় চাহিদার প্রায় ৩.৬%। স্বাধীনতার পর শুধুমাত্র তুলা উৎপাদনে অপ্রতুলতার কারণে দেশীয় বস্ত্রশিল্পে সংকটময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই সংকটকে মোকাবেলা করার জন্যে এবং ভবিষ্যতে বস্ত্রশিল্পে পৃথিবীর বুকে অবস্থান সৃষ্টির জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত ইচ্ছায় ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর তুলা উন্নয়ন বোর্ড স্থাপিত হয়। আজ স্বাধীনতার দীর্ঘসময় পরও তুলার উৎপাদন সেই অর্থে কাঙ্খিত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। এজন্যে কিছু কারণ থাকতে পারে তার মধ্যে অন্যতম কারণ গুলো হলো: চাষীদের তুলা উৎপাদনে অনীহা, উৎপাদন পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, কৃষি সম্প্রসারণের অপ্রতুলতা, দুর্বল অভ্যন্তরীণ বাজার-ব্যবস্থা, খাদ্যশস্য উৎপাদনে অধিক মনোযোগিতা ইত্যাদি।

সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কিছু কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে কৃষকশ্রেণীর মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব। বিশেষ করে তামাক উৎপাদনের মতো Contract Farming (উৎপাদনের পূর্বে যাবতীয় উপাদান সরবরাহের নিশ্চয়তা) ব্যবস্থায় গেলে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

কৃষিবিদ ও গবেষকবৃন্দের তথ্য অনুসারে তুলাগাছ খরা ও লবণ সহিষ্ণু। সুতরাং দেশের খরাপ্রবণ ও লবণজল বিধৌত অঞ্চলে তুলাচাষ করা সম্ভব, যেখানে অন্য ফসল ফলাতে কৃষক গোষ্ঠীকে নানান বেগ পেতে হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু তুলাচাষের জন্যে উপযোগী। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর এবং বরেন্দ্র এলাকায় প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমি তুলাচাষের আওতায় আনা সম্ভব। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ চরাঞ্চলে অতি সহজে তুলার চাষ সম্ভব। তুলার সাথে অন্যান্য ফসল করা যায় যেমন: তুলা-পাট, তুলা-গম, তুলা-আলু, তুলা-তিল, তুলা-মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদি। ফলে কৃষক সহজেই অন্যান্য ফসলের সাথে চাষ করতে পারে।

বর্তমান দেশের ৩৪ টি জেলায় তুলা চাষ হচ্ছে। শুধুমাত্র, চাষী পর্যায়ে হাইব্রীড সিড প্রদানে, তুলাচাষে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ৬-৭ লাখ বেল তুলা উৎপাদন সম্ভব। দেশে বর্তমান ৩৯২ টি স্পিনিং মিলের বার্ষিক আঁশতুলার চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ বেল (১ বেল=১৮২ কেজি)। তুলাচাষের সম্প্রসারণ, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং জিনিং এর মাধ্যমে এদেশের আবহাওয়ায় দেশীয় চাহিদার ৬০-৬৫% উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া পরীক্ষা করে দেখা গেছে আমদানিকৃত তুলার চেয়ে দেশীয় তুলার গুনগত মান ভালো।

বলাবাহুল্য, এক সময় মসলিন কাপড় সমগ্র বিশ্বে নজর কেড়েছিলো, সেই মসলিনের সুতাও উৎপাদিত হতো দেশীয় তুলা থেকে। ২০২১ সালের মধ্যে গার্মেন্টস রপ্তানিতে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করা হয়েছে সেটিকে অর্জন করতে তুলার দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখতে হবে তুলাভিত্তিক শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান; তৈরি পোশাক শিল্প অগণন নর-নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির এক বড় জায়গায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া দেশের GDP(Gross Domestic product)-তে বস্ত্রশিল্পের অবদান অনেক বেশি। সুতরাং এই শিল্পকে আরো বেশি স্থায়ী ও শক্তিশালী করার নিমিত্তে কাঁচামাল উৎপাদনে নজর দিতে হবে। এতে তুলা আমদানি করার জন্যে যে অর্থ বিদেশে চলে যায় তার সিংহভাগ দেশেই থেকে যাবে। তুলাভিত্তিক শিল্পকে টেকসই করার জন্যে এবং অন্য দেশের দিকে মুখাপেক্ষী না হয়ে একটি স্বাধীনশিল্প স্বত্বা হিসেবে বিকশিত করে, আগামীর পোশাক শিল্পে বাংলাদেশকে এক নম্বরে স্থায়ী করার জন্যে কাঁচামালের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। কৃষক, কৃষিবিদ ও গবেষকবৃন্দের সহায়তায় তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি।

-লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort