সবুজ বিপ্লবের আদ্যপান্ত...

মোঃ রেজাউল করিম:ম্যালথাসের তত্ব অনুযায়ী, খাদ্য বাড়ে গাণিতিক হারে, জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে। তিনি বলেছিলেন, জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে এক সময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে এবং খাদ্যের অভাবে মানুষ মারা যাবে। সমাধান হিসেবে তিনি বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন। যাই হোক, ম্যালথাসকে নিয়ে লেখা আমার উদ্দেশ্য না।

ম্যালথাসের এই ফিলোসফি ভেঙ্গেছিলেন আমেরিকাল এগ্রোনমিস্ট ড.নরম্যান বরলোগ। যাকে আমরা সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে চিনি। ১৯০০ সালের পর পৃথিবীর জনসংখ্যা মিরাকেলিভাবে বেড়ে যায়। ১৯০০ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা ছিল ১ বিলিয়ন, ১৯৬০ এ এসে তা ৩ বিলিয়ন হয়। অর্থাৎ এই ৬০ বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন জনসংখ্যা বেড়ে যায়। এজন্য পৃথিবীর সকল বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ চিন্তা করতে করতে নিজের চুল ছেড়া শুরু করে দিয়েছিল।

কীভাবে পূরণ করবে এই বিশাল জনসংখ্যার খাবার? দূর্ভিক্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে গিয়েছিল। আর তখন গমের ফলন সংঘাতিকভাবে কম হতো Stem rust of wheat এই রোগটির কারণে। তখনকার গমের জাতগুলো অনেক লম্বা ছিল তাই সার প্রয়োগ করার পর আরও লম্বা হত ফলে যখন দানা আসত তখন দানার ভারে গাছটা মাটিতে পড়ে যেত ফলশ্রুতিতে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেত।

যখন একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে ফলন কম থেকেও আরও কমছে ঠিক তখনই আর্বিভাব ঘটল ড.নরম্যান বরলোগের। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটল থেকে প্লান্ট প্যাথলজি ও জেনেটিকস এ পিএইচডি করেছেন সবেমাত্র। ঠিক তখনই রকফেলার ফাউন্ডেশনে গবেষণার জন্য ডাক পেলেন নরম্যান। গমের ফলন কীভাবে বাড়ানো যায় এ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন ম্যাক্সিকোতে।

গমের বিভিন্ন জাতের মধ্যে ক্রস করা শুরু করলেন। এভাবে ক্রস করতে করতে গমের ডাবল সিজন আবিষ্কার করে ফেললেন। আশ্চর্যভাবে তিনি ফটোপিরওডিজম প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারলেন। এরপর stem rust রেজিসটেন্স জাতও আবিষ্কার করে ফেললেন। ইতোমধ্যে চারিদিকে বেশ নামডাক করে ফেলেছেন তিনি। এরপরে যে সমস্যাটা হল গম গাছের উচ্চতা। প্রথম দুটি সমস্যা কাটিয়ে উঠলেও উচ্চতার কারণে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেত। সফলতা তখনো অনেক দূরে। কিন্তুু তিনি দমবার পাত্র নন। অনার্স পড়ার সময় তিনি খুব ভাল রেসলিং খেলতেন। রেসলিং থেকে  তিনি ধৈর্য, অধ্যাবসায় খুব ভাল করে শিখেছিলেন। এবার তিনি সেই সঞ্চিত অভিজ্ঞতা গবেষণার ক্ষেত্রে কাজে লাগালেন।

শুরু হল খাটো জাত খোঁজা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলো বিজ্ঞানীরা ভুলে গিয়েছিল জাপানের এক বিজ্ঞানীর আবিষ্কার করা "নোরি দশ" নামের খাঁটো জাতটির কথা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নরম্যানের হাতে পৌঁছল সেই জাতটি। যেই পাওয়া সেই কাজ শুরু। ব্রিডিং প্রোগ্রামে যুক্ত করলেন সেই জাতটি। অবশেষে তারা semi-dwraf জাত আবিষ্কার করতে সক্ষম হল। পরে ১৯৬২ সালে মেক্সিকোর কৃষকরা semi-dwarf জাতটি চাষ করা শুরু করে দিল এবং ব্যাপক ফলন পেল।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মেক্সিকোতে ১৯৫০ সালে গমের ফলন হতো প্রতি হেক্টরে ৬০০ কেজি। ১৯৬০ এর দিকে ১৭০০ কেজি এবং ১৯৬৫ সালে প্রতি হেক্টরে ২৮০০ কেজি। সামনে আরও ফলন বেড়েছে। পুরাই মিরাকেল ঘটিয়ে দিয়েছিল নরাম্যান ও তার সহযোগিরা।

তারপর তারা গমের semi dwarf জাতগুলো পুরো পৃথিবীতে ছড়ায় দিয়েছিল। তৎকালীন আমাদের সাব-কন্টিনেন্টে, আফ্রিকা মহাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে মানুষ মুক্ত হয়েছিল ক্ষুধার চিন্তা থেকে।

১৯৭০ সালে কৃষিক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য তাকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম এগ্রিকালচারিস্ট যিনি নোবেল পেয়েছেন।

-লেখক:শিক্ষার্থী শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি অনুষদ, ৪র্থ বর্ষ

escort beylikduzu izmir escort corum surucu kursu malatya reklam