চালে বিষ! জনমনে ভাবনা; আমার উপলব্ধি ও ব্রির ব্যাখ্যা

মাহমুদুর রহমান সোহেব: গত ৩ মার্চ ২০১৯ তারিখ দৈনিক কালেরকন্ঠ পত্রিকায় “মাটি পানি হয়ে চালেও বিষ” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যা দেশ ব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কপালে চিন্তার ভাজ পড়ে যায়। তাই উৎসুক মনে এ ব্যপারের সত্যতা খোঁজার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি। এক্ষেত্রে জানা যায় যে, আর্সেনিকসহ ক্যাডমিয়াম, সিসা, নিকেল এবং ক্রোমিয়াম ইত্যাদি মৌলিক পদার্থ।

উল্লেখিত ভারী ধাতুগুলো প্রকৃতিতে জৈব এবং অজৈব অবস্থায় থাকে। অজৈব ভারী ধাতুগুলো জৈব ভারী ধাতুগুলোর চেয়ে বেশি ক্ষতিকারক। ভারী ধাতুগুলো চালে জৈব অবস্থায় থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। মানুষের শরীরের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ভারী ধাতুর প্রয়াজনীয়তা রয়েছে। তবে বিষক্রিয়ার মূলনীতি অনুযায়ী “মাত্রাতিরিক্ত সকল কিছুরই বিষক্রিয়া থাকবে”। আর প্রতিবেদনে জৈব না অজৈব ধাতু অথবা উভয় অবস্থাকে গণনা করা হয়েছে কিনা এর কোন উল্লেখ নাই। একইসাথে নমুনা সংগ্রহের কথাও উল্লেখ নেই।

প্রতিবেদনে ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরিচালিত গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়ছে যে, চালে মারাত্মক ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি সনাক্ত করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রতিবেদনে চালের ২৩২টি নমুনার মধ্যে ১৩১টিতে বিভিন্ন মাত্রায় মানুষের জন্য বিপজ্জনক ক্রোমিয়াম, ১৩০টিতে ক্যাডমিয়াম, সমসংখ্যক নমুনায় সিসা, ৮৩টিতে আর্সেনিকের অস্তিত্ব মিলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে অন্যান্য ধাতুর পরিমান উল্লেখ করা হলেও আর্সেনিক এর পরিমান উল্লেখ করা হয় নি। আর গত বছরের গবেষণার বরাত দিয়ে ভারী ধাতুর যে মাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে ব্রির গবেষণালব্ধ মাত্রার রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। যেমন ব্রি বলছে ক্যাডমিয়াম এর পরিমান ০.০৪ পিপিএম সেক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এর পরিমান ৩.২৩৯৫ পিপিএম। একইভাবে অন্যান্য ধাতুর ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। আর প্রতিবেদনে ব্রির কোন সংশ্লিষ্ট গবেষকের মন্তব্য নেয়া হয়নি।  

আর যখন বিগত নব্বই এর দশকে এদেশে আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর ক্ষতিকর দিক নিয়ে তোলপাড় হয়। তখন বাংলাদশ ধান গবষণা ইনস্টিটিউট, যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণল বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক ভূট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিমিট), বাংলাদশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয় ব্যাপক ভিত্তিক যৌথ গবেষণা শুরু করে। দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে যৌথ গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, এ দেশের চালে আর্সেনিক এর প্রাপ্য মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক কম। একইভাবে ব্রির গবেষণায় ক্যাডমিয়াম, সিসা, নিকেল এবং ক্রোমিয়ামের মাত্রাও সহনীয় মাত্রার চেয়ে কম পাওয়া গেছে।

আর ব্রির গবেষণায় দেখা যায়, চালে আর্সেনিকের প্রাপ্ত পরিমাণ গড় ০.৩১ পিপিএম, ক্যাডমিয়াম ০.০৪ পিপিএম, সিসা ০.০৫ পিপিএম,  নিকেল ৪.০০ পিপিএম এবং ক্রোমিয়াম ০.৯০ পিপিএম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) এর গবেষণা এবং ইউরোপীয় কমিশনের নীতিমালা অনুসারে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন-আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ১.০০ পিপিএম, সিসা ০.২০ পিপিএম, ক্যাডমিয়াম ০.২০ পিপিএম, নিকেল ১০.০ পিপিএম এবং ক্রোমিয়াম ১.০০ পিপিএম। আর ব্রিতে উপর্যুক্ত গবেষণার ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকবিদ বলেন, চালে যে পরিমাণ ভারী ধাতু রয়েছে তা মানবদহর জন্য ক্ষতিকর নয়।

চাল যেহেতু বাংলাদেশের একটি প্রধান ও সংবেদনশীল পণ্য এবং পথিবীর প্রায় অর্ধেকরও বেশি জনগোষ্ঠির মূল খাদ্য, তাই আশা করি  উল্লেখিত বিষয় একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রকাশিত হবে৷ যার ফলে জনমনের বিভ্রান্তি দূর হবে।

-লেখক:শিক্ষার্থী শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ৪র্থ বর্ষ, কৃষি অনুষদ

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort