বাংলাদেশ ও সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্প

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি:পোল্ট্রি বলতে মাংস, ডিম, পালক, সার, পশুখাদ্য ও ঔষধ তৈরির উপকরণের মত অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান দ্রব্য উৎপাদনকারী গৃহপালিত পাখি। মুরগি, হাঁস, রাজহাঁস, গিনি মুরগি, কোয়েল, কবুতর, ফেজেন্ট এবং টার্কি সাধারণত পোল্ট্রি পাখি হিসেবে বিবেচিত হয়। পোল্ট্রি শিল্প বতর্মান বিশ্বে দ্রুত বধর্নশীল একটি শিল্প। দেশে তৈরী পোশাক শিল্পের পরই পোল্ট্রিই দ্বিতীয় বৃহত্তম কমর্সংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্প। মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে পোল্ট্রি শিল্প। এ খাত সংশ্লিষ্টদের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার ফলে দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অজর্ন করেছে।

বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই যোগান দিচ্ছে এই শিল্পটি। এই শিল্প খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যার সঙ্গে কমবেশি ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নিভর্রশীল। আশার খবরটি হচ্ছে বতর্মান বাজারে যে পরিমাণ ডিম, মুরগি, বাচ্চা এবং ফিডের প্রয়োজন তার শতভাগ এখন দেশীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি দেশের ডিম ও মাংসের শতভাগ চাহিদাপূরণ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদনও করছে এ শিল্পটি। বাংলাদেশে দ্রুত অগ্রসরমান পোল্ট্রিশিল্পের সম্ভাবনাকে সারাবিশ্বে জানান দিতে এবং বিশ্বের পোল্ট্রি সায়েন্স জ্ঞান বিনিময়ের লক্ষ্যে বৃহৎ কলেবরে ১১তম আন্তজার্তিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনার আয়োজন সফলভাবে আয়োজন করলো ওয়াল্ডর্স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (ডাব্লিউপিএসএ) বাংলাদেশ শাখা এবং ‘বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল’ (বিপিআইসিসি)। আয়োজকদের প্রত্যাশা এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের এই শিল্পের সম্ভাবনা সারাবিশ্বের কাছে ছড়িয়ে পড়বে। পাশাপাশি সেমিনারের মাধ্যমে আমরাও পোল্ট্রি সায়েন্সেরা জ্ঞান-গবেষণা সম্পর্কে আরও সমৃদ্ধ হতে পারবে।

তবে মুনাফা কম, খাদ্যপণ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি, আড়তদারদের হাতে ডিমের বাজার জিম্মি হওয়া ও ব্যাংক ঋণের অপ্রতুলতাসহ নানা কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় এ শিল্প। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারিদের এখন অস্তিত্ব নিয়ে টানাপোড়েন দশা। নতুন করে এ ব্যবসায় কেউ বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। এ পেশায় জড়িত খামারিদের অনেকেই বর্তমানে বিকল্প ব্যবসার সন্ধান করছেন। যারা কোনমতে টিকে আছেন, তারাও কয়েক বছর ধরে লাভের মুখ দেখছেন না। আবার অনেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ার ভয়ে হঠাৎ করে খামার বন্ধ করতেও পারছেন না। কোন নিয়মনীতি না থাকায় এ খাতের বড় কোম্পানি গুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র খামারিরা। মুনাফাতো দূরের কথা মুরগি বিক্রি করে লোকসান গুনছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। খামার পরিচালনার খরচ বেড়েছে। কমেছে মুনাফা। বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে গড়ে ওঠা পোল্ট্রি শিল্প এক সময় ছিল আকর্ষণীয় লাভজনক ব্যবসা। ফলে স্বল্পপুঁজির এই শিল্পে উৎসাহী হয়ে ওঠে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবকেরা। কিন্তু সরকারি নজরদারির অভাবে গত কয়েক বছরে এ শিল্পের বাজার হয়ে পড়েছে পুরোপুরি অস্থিতিশীল। পোল্ট্রি খাদ্য, বাচ্চা ও ওষুধের মূল্য বেড়েছে দফায় দফায়। আর বাজার মনিটরিং না থাকায় ভেজাল ওষুধ আর নিম্নমানের খাদ্যে বাজার সয়লাব হয়েছে। এতে করে মড়ক আর অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে মুরগি। অন্যদিকে উৎপাদিত ডিম ও মুরগির দাম না বাড়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। অনেকে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব ও বেকার হয়ে পড়েছেন।

দীর্ঘদিন যাবত পোল্ট্রি শিল্পের আয় করমুক্ত ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ শিল্পের কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। চলতি অর্থবছরেও তা অব্যাহত আছে। খামারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছেন কিছু দেশী এবং বিদেশী বড় কোম্পানির মনোপলি ব্যবসার কারণে। এসব কোম্পানির কারণেই তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মনোপলির সঙ্গে জড়িত এসব বড় কোম্পানির অধিকাংশই প্রথমে ওষুধ নিয়ে মাঠে নামলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই বাচ্চা উৎপাদন, লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামার, পোল্ট্রি ফিড উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এবং পোল্ট্র্রি ফিডের কাঁচামাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বতর্মানে সারা দেশে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার রয়েছে। এ ছাড়া আছে ব্রিডার ফার্ম হ্যাচারি, মুরগির খাবার তৈরির কারখানা। পোল্ট্রিশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্প, কাঁচামাল ও ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ডিমের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। মাথাপিছু পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১টি। ২০১৬ সালে ডিমের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ। মাথাপিছু পরিমাণ প্রায় ৫১টি। এই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম। আর তখন মাথাপিছু পরিমাণ প্রায় ৮৬টিতে। পরিসংখ্যানে মুরগির মাংসের উৎপাদন ও দেখানো হয়েছে, ২০১৪ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ৫শত ১০ মেট্রিক টন। তখন মাথাপিছু বাষির্ক পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৫ কেজি। ২০১৬ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৮শত ৫১ মেট্রিক টন। তখন মাথাপিছু বার্ষিক পরিমাণ ছিল প্রায় ৪দশমিক ২ কেজি। আর এ ধারাবাহিকতা থাকলে ২০২১ সালে হবে উৎপাদন হবে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। মাথাপিছু বাষির্ক পরিমাণ হবে প্রায় ৭ কেজি। এটি চলতে থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে পোল্ট্রি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি করা যাবে। আর এ লক্ষ্য অজর্ন করা সম্ভব হলে প্রাথমিক পযার্য়ে বছরে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।  

এদিকে, জাতীয় অথর্নীতিতে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ ছাড়াচ্ছে। পোল্ট্রি ফিডের উৎপাদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে পোল্ট্রি ফিডের বাষির্ক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৬ সালে পোল্ট্রি ফিডের বাষির্ক উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৩ লাখ মেট্রিক টন। ২০২১ সালে পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন হবে প্রায় ৫৫-৬০ লাখ মেট্রিক টন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি এ  শিল্পের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা সত্যিই অনেক।এখন সরকার ও পোল্ট্রি সংশ্লিস্ট সকলেরই এ শিল্পটির আরো গভীরে গিয়ে সমস্যাগুলিকে দ্রুত সমাধান ও কার্যকর ভূমিকা রাখার সময় হয়ে এসেছে।

লেখক : শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

escort izmir