"কৃষকপর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে"

কৃষিবিদ কামরুল হাসান কামু, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়:বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার এটা সকলে কায়মনোবাক্যে স্বীকার করবে কারণ এই সরকারের আমলে আমরা খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করেছি। সেইসাথে বৈশ্বিক কৃষির অগ্রগতির সাথে আমাদের সাফল্য অভূতপূর্ব।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে সাড়ে ১১ শতাংশ হারে ফল উৎপাদন বাড়ছে। সেই সাথে বিভিন্ন ফল ও ফসলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে যেমন চাল উৎপাদনে চতুর্থ, কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়,আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে অষ্টম, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপের জন্যে এই সফলতা সম্ভব হয়েছে। কোন কোন ফসলের ক্ষেত্রে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতিকে আরো সাফল্যমণ্ডিত করতে ও বিশ্বের মানুষের ক্ষুধা মুক্তির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো আমাদেরকে কৃষিপ্রযুক্তি ও গবেষণায় সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছে এবং একযোগে কাজ করার প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হতে চাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, আমাদের মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর কাছে কানাডীয় সরকারের প্রতিনিধির সে বিষয়ে প্রাঞ্জল আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এছাড়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কার্ল রবার্ট মিলার ঝিনাইদহে সফরে গিয়ে তার বক্তব্যে বলেছেন,' বাংলাদেশ ও আমেরিকার সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক। আর এ দুইয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কৃষি।' এছাড়া, খাদ্যশস্যে স্বয়ংস¤পূর্ণ বলেই অন্যদেশের দুর্যোগকালে যেমন নেপালের দুর্যোগকালে, বাংলাদেশ সরকার চাল সহায়তা দিয়েছে যা সমৃদ্ধকৃষির জন্যেই সম্ভব হয়েছে।

আমাদের এই সমৃদ্ধ কৃষির মূল কারিগর হলো কৃষক। অথচ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষকশ্রেণী তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। প্রায়শই গণমাধ্যমে দেখা যায় ন্যায্যমূল্যের অভাবে কৃষকেরা নিজেদের রক্তপানি করা শ্রমে উৎপাদিত ফসল মনের দুঃখে রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বছরের পর বছর এই দৃশ্য দেখে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু এর শেষ কোথায়? একটি ফসল কৃষকের কাছে সন্তানসম। মোরগ ডাকা ভোর হতে রাত অবধি প্রতিটি ফসলকে শিশু সন্তানের মতো যত্ন করে। অথচ এই শ্রমের সম্মানজনক মূল্য পাচ্ছেনা কৃষকশ্রেণী। বিষয়টা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে উৎপাদন মূল্য ও বিক্রয়মূল্য প্রায় সমান এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্য, উৎপাদন মূল্যের চেয়ে কম।

আসুন, যে কোন একটি ফসলের ক্ষেত্রে কৃষকের শ্রমের ডিউরেশন একটু বিশ্লেষণ করে দেখি; আপনারা জেনে থাকবেন, ধানের বীজ বপন থেকে শুরু করে ধানপাকা পর্যন্ত গড়ে ১০০-১১৫ দিন অর্থাৎ ৩-৪ মাস সময় লাগে। এরপর ধানকাটা, মাড়াইকরা, শুকানো ও বিক্রয় উপযোগী করতে প্রায় ১২-১৫ দিন সময় লাগে। অংকের হিসেবে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ মাসের শ্রমে কৃষক ধান বিক্রি করতে সমর্থ হোন। অথচ এই দীর্ঘ সময়ের শ্রমের সম্মানজনক প্রাপ্তি পাচ্ছে না কৃষকশ্রেণী। ধানের ক্ষেত্রে বিগত বছর গুলোর উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গড় উৎপাদন খরচ প্রায় মণ প্রতি ৫৫০-৬৫০ টাকা অথচ প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য গড়ে ৫০০-৭৫০ টাকা। উৎপাদনকাল ও ব্যয়ের ভিন্নতা থাকলেও অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

কৃষকগোষ্ঠীর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার মূল কারণ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাক্ষ্য। প্রান্তিক কৃষকেরা স্থানীয় হাট-বাজারে পণ্য বিক্রি করে থাকে। তাদের পক্ষে গ্রাম থেকে শহুরে বাজার গুলোতে কৃষিপণ্য বিক্রিকরা সম্ভবপর হয়ে উঠেনা। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা স্থানীয় বাজার গুলোতে তথাকথিত সিণ্ডিকেট গঠন করে গোটা বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রায়শই দেখা যায়, স্থানীয় বাজারে কৃষক একটি সবজি ১০-১৫ টাকা বিক্রি করলেও শহরে সেটার মূল্য প্রায় ৪০-৫০ টাকা। বিগতবছর গুলোতে সরকারের পক্ষে এই সিণ্ডিকেট ভাঙতে আশাব্যঞ্জক কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্যে সরকারিভাবে ধান, গম সংগ্রহের নীতিকে সাধুবাদ জানাই। তবে সংগ্রহনীতির সংস্কার প্রয়োজন। সরকারিভাবে চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য অধিদপ্তর চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করছে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সহায়তায় কৃষকেরা চালকল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করছে। ফলে কৃষকশ্রেণী মধ্যস্বত্বভোগী বা মিডলম্যানদের কাছে জিম্মি থেকে যাচ্ছে। সরকারিভাবে চাল সংগ্রহনীতির ক্ষেত্রে কৃষকগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করলে এই সমস্যার সমাধান হবে।

অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্যে এমন কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে যেমনঃ

১. কৃষিমন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত অফিসগুলো থেকে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সম্পৃক্ত করে একটি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য কমিশন গঠন করতে হবে যা কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারনে সহায়তা করবে।

২. বেশিরভাগ সবজি ও ফল পচনশীল। এই সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্যে সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

৩. কৃষিপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। এর ফলে নতুন কর্মক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে।

৪. কৃষিতে ভর্তুকি বৃদ্ধি ও বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কৃষকের মর্মবেদনার কথা গভীরভাবে উপলব্ধি করে পেরেছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, "আমাদের নজর গ্রামের দিকে দিতে হবে। কৃষকদের রক্ষা করতে হবে।" স্বাধীনতার দীর্ঘসময় পরেও কৃষকশ্রেণী তাদের শ্রমের সম্মানজনক মূল্য পাচ্ছেনা। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৬% কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। জাতির বৃহদাংশের কথা মাথায় রেখে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

সবশেষে কবির ভাষায় বলতে চাই,
"সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।"
দেশের এই সাধকের অর্থনৈতিক জীবন নির্বাহকে সাবলীল ও প্রাঞ্জল করতে কৃষিপণ্যের প্রাথমিক মূল্যের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হোক।

escort izmir