সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে ইভ

আবুল বাশার মিরাজ:দেশে আমাল ফাউন্ডেশন গড়েছেন। তাদের স্কুল আছে, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়েছেন, নারীদের বিনা পয়সায় মেশিন দেন। করেছেন কমিউনিটি ক্লিনিক। বলছি ইশরাত করিম ইভের কথা। ছোটবেলায় খুব লাজুক ছিলেন, মফস্বলের অন্য মেয়েরা যেমন হয়।

ইশরাত করিম ইভ বড় হয়েছেন বগুড়া শহরে। বাবা ইসকান্দার করিম আর মা হাবিবা জেসমিন তাদের আদরের মেয়েটিকে চোখে চোখে রেখে বড় করেছেন। তবে ছোটবেলা থেকে মানুষকে সাহায্য করার অন্যরকম একটি বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে জন্ম নিলো। যে কারো পাশে দাঁড়াতেন তিনি। বগুড়া ক্যান্টমমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী থাকার সময় একদিনের কথা এখনো স্মৃতিতে ভাসে। এক লোক তাদের বাসায় ভিক্ষা নিতে এসেছেন। তাকে ভিক্ষে দেওয়ার পর কথা বলে এত খারাপ লাগলো যে, ডাইনিং রুমে এসে খেতে বসালেন। মা মেয়ের এই কান্ড দেখে হতবাক।

এরপর এইএসসি পাশ করে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্সে। দারুণ মেধাবী এই মেয়েটি এসেছেন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে, ‘ডি’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় তিনি ৪০তম হয়েছেন। আবাসিক ছাত্রী হিসেবে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে সিট পেলেন। সেই থেকে তার একা, নিজে নিজে সব কাজ করার জীবন শুরু হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল পরিবেশে এসে নিজেকে আরো ছড়িয়ে দিলেন তিনি। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে স্বেছাসেবী সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা শুরু করলেন।

জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের প্রকল্পে কাজ করলেন। তখন মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করতে দেশের প্রত্যন্ত জেলাতেও গিয়েছেন তিনি। দেখেছেন, এদেশের মানুষ হতদরিদ্র, তারা জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোই পূরণ করতে হিমশিম খান। সেই থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটি জেগে উঠলো তার ভেতরে। এর মাঝে এমবিএ পাশ করলেন তিনি। অসাধারণ মেধাবী ছাত্রীটি ২০১৪ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে তিনি সোশ্যাল বিজনেস বা ‘সামাজিক ব্যবসা’ নিয়ে মাস্টার্স করেছেন।

লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি অবসরে পার্ট টাইম চাকরি করেছেন বিশ্বখ্যাত দাতব্য সংস্থা ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’-এ। এরপর থেকে এমন কোনো সংগঠন প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে তার ভেতরে জেগে উঠলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জর্জ ও প্রিয় ছাত্রীটিকে উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার মতো মেধাবী নিজের সমাজের জন্য কাজ করলে ভালো হয়।’ ফলে আরো অনেক বয়সে নয়, ২০১৫ সালে এক বছরের মাস্টার্স করে বাংলাদেশে চলে এলেন ইভ। তবে উন্নত জীবন ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছেড়ে দেশে ফেরত আসাটি ভালো লাগেনি মা-বাবার। তারপরও দেশের প্রতি ভালোবাসা অস্বীকার করতে পারেননি তিনি। কেন ফিরে এলে? কেন ব্যাংক বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে সমাজ বদলের জন্য নামলে? এই প্রশ্নটি আজো তাকে অনেকে খোঁচান।

তখন ইভ তার জীবনের একটি মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা বলেন, ‘২০১০ সালের কথা, আমি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী; বন্ধুদের সঙ্গে অলস বিকেলে বসে আছি টিএসসিতে। একটি ছোট্ট শিশু ফুল কেনার জন্য জোরাজুরি করছে দেখে এক লোক তাকে লাথি মারলেন। তারা যে মানুষই নয়, সমাজ সেই সত্যটি তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। এই মানুষগুলোর ভাগ্য বদলাতে দেশে এসেছি, কাজ করছি।’ দেশে ফিরলেন তিনি ‘আমাল’ নামের একটি স্বপ্ন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে। ‘আমাল’ আরবি শব্দ, মানে হলো ‘আশা’। ২০১৫ সালের ১৭ জুন জন্ম নিলো আমাল ফাউন্ডেশন’। শুরু থেকে আজো প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ ও শহরের গরীব, অসহায় মানুষের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাগত উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্যোগে-দুভোগে থাকেন। ২০১৫ সালের ঢাকার বস্তির শিশুদের তারা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিলেন। বস্তির কিশোরী-তরুণীদের শেখালেন মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব, তাদের যৌন নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সামাজিক-মানসিক কাউন্সিলিং করানো হলো।

২০১৭ সালের বন্যায় বগুড়ার যমুনার তীরে সারিয়াকান্দি উপজেলার প্রত্যন্ত শনপচা চরে তারা ত্র্যাণ বিতরণ করতে গেলেন। তখন ১২ কি ১৩ বছরের একটি মেয়েকে পেলেন তারা। এই বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছে, যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় বাপের বাড়িতে ফিরেছে সে। চরে বাল্যবিবাহের হার খুব বেশি। আবার স্বামীর ঘর করতে না পারা মেয়েরা বাড়িতে কটু কথা, গালমন্দ শোনে। সেই মেয়ের মা করুণ জীবন বলতে বলতে আঁচলে চোখ মুছলেন। কিন্তু এও জানলেন তার মেয়ের পড়ালেখার খুব স্বপ্ন ছিল। পরের বছরের শনপচা চরে শুরু করলো ‘আমাল ফাউন্ডেশন রওশন আরা স্কিল সেন্টার।’ এই উদ্যোগে কলোরাডো প্রবাসী বাঙালি নোমান খুব সাহায্য করেছেন। তার মায়ের নামেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি আছে। প্রথম দফায় ২০জন গরীব নারীকে বিনা খরচে দুই মাসের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ১৫ জন সেলাই মেশিন পেলেন। আগে যারা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে জীবন চালাতেন, তারা এখন মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা রোজগার করছেন। সেই টাকায় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানও বাড়ছে। এই আলো না আসা চরের মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধ ও যৌতুকের অভিশাপকে চিরতওে মুছে দিতে চায় আমাল ফাউন্ডেশন। আস্তে আস্তে সারা দেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে ছড়িয়ে দেবেন ইভ। ফাউন্ডেডশন জাতীয় সংকটে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়।  

২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিগুলোতে তারা ত্রাণ বিলিয়েছেন। তাদের আরেকটি উদ্যোগ হলো আদর্শ গ্রাম নির্মাণ মানুষকে দিয়েছেন শস্যবীজ, সোলার বাতি। তাদের এই কাজের সময়গুলোতে ফ্রি স্বাস্থ্য সেবা ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এই বছর থেকে যশোর সদরের পুলেরহাট ইউনিয়নের আভা লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে তারা ‘ডাক্তারবাড়ি’ নামের স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প চালু করেছেন। তাতে স্বল্প খরচে মানুষের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

শনপচা চরে তাদের একটি স্কুল আছে। এটির জন্ম ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ। নাম ‘উচ্ছ্বাস স্কুল’। এটিই শনপচার একমাত্র স্কুল। আইপিডিসি ফিনান্স লিমিটেড ও আমাল ফাউন্ডেশন স্কুলটি বালিয়েছে, চালাচ্ছে। স্কুলে ছাত্রছাত্রীরা বিনা পয়সায় বই, খাতা, কলম পায়। তারা বাল্যবিবাহ রোধ কেন করতে হবে, যৌতুক কেন খারাপ, কিভাবে স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে শেখে। এখন নার্সারি ক্লাস আছে। ওরাই এই স্কুলকে ফাইভ পর্যন্ত টেনে নেবে। ‘থ্রাইভ গ্লোবাল’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিদিন তাদের পুষ্টিকর খাবার দেয়, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। এতে ছাত্রছাত্রী এখন ৫০। যে শিশুরা জমিতে কাজ করলে বা মাছ ধরলে রোজগার করতে পারতো, তারা এখন বন্ধুদের লোভে, নতুন কিছু শেখার প্রতিদিন সকাল সাতটায় আসছে। অথচ তাদের ক্লাস নয়টায়। এই স্কুলের শিক্ষক দুইজন। এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তারা মাটির শহীদ মিনার বানিয়েছে, নিজেরাই ফুল কুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মা-বাবারা তাদের মানুষ করতে চাইছেন।

স্কুলের মতো ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তারা চরের একমাত্র কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র চালু করেছেন। সপ্তাহে দুবার বাইরে থেকে ডাক্তার এসে বসেন। রোগীদের ফ্রি ওষুধ দেন। নারীদের নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য বিষয়ে জানাতে একজন নারী প্রশিক্ষকও আছেন।

বগুড়া, চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সিলেট, টেকনাফের প্রত্যন্ত গ্রাম ও চরে আমাল ফাউন্ডেশন ২০১৮ সাল থেকে বিশুদ্ধ পানীয়ের জন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে দিচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ৪০টি গভীর নলকূপ এসব জায়গায় বসানো হয়েছে। তবে এত এত কাজ করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতাও ইভের হচ্ছে। অনেকে এনজিও মনে করে ঋণ নিতে চান। আবার সমাজের খারাপ লোকেরা কাজ করতে গেলে টাকা চেয়ে বসেন। নারী হিসেবে তাকে বাঁকা চোখে দেখেন, কথা শোনাতে ভুল করেন না। সরকারী কোনো সাহায্য চাইলে সেটি পাশ হয়ে আসতে অনেক সময় লাগে। তারপরও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য লড়ে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৮ সালে ফাউন্ডেশন থেকে তারা ‘অ্যাজোয়া’ নামের একটি নারী ব্র্যান্ড চালু করেছেন। তাতে শনপচার নারীদের তৈরি গায়ে মাখার সাবান, গ্রামের শাড়ি, গহনা সারা বিশ্বে অনলাইনে বিক্রি করা হয়। নিজের ও প্রতিষ্ঠানের এই কাজগুলোর সুবাদে ইভ ইয়ুথ আইকন ২০১৮, ওয়াইএসএসই সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড, জিটিএ গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, জেকোনো ক্যাটালিষ্ট ফেলোশিপ পেয়েছেন।

আমালের ঢাকা অফিসে আছেন ৭ জন। সারাদেশে মোট ২০ জন। আর সারাদেশে তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক আছেন মোট ৪শ। সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা, ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টও, সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের শুভাকাংখী ও সহযোগী। এত কাজ কিভাবে করেন? এই প্রশ্নের জবাবে ইভ আরেকটি গল্প করলেন, ‘আমাদের উচ্ছাস স্কুলে রেহানা নামের একটি পাঁচ কী ছয় বছরের ছাত্রী আছে। ভর্তি হবার পর কিছুদিন সে অনুপস্থিত ছিল। আর মা মানুষের বাড়িতে তখন কাজ করেন। পরে তাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। তিনি সেলাই মেশিনও পেলেন। আর রেহানা এখন পড়ছে। এসব মানুষই আমার প্রেরণা।’   

escort izmir