সচেতনতা তৈরি করতে সাইকেলে সাব্বিরের ঘোরাঘোরি

আবুল বাশার মিরাজ:ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে ঝিনাইদহ প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি হলে সাইকেলে চড়েই বাসায় যেতেন সাব্বির। সবাই ভাবতো শখের বসে পাগলামি করছেন। কিন্তু বিষয়টি নিছক এমন ছিল না। বরং ক্যাম্পাস থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য ৭০০-৮০০ টাকা ভাড়া বাচাঁতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। এরপর দারিদ্র্য আর পারিবারিক অসচ্ছলতার কাছে হার না মানা এই ছেলে একে একে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের ৬৪ জেলা।

দীর্ঘ পথচলায় সাব্বিরকে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়েছে দারিদ্র্যের সঙ্গে। মুখোমুখি হয়েছেন অনেক সমস্যার, বিশেষ করে অর্থের। প্রতি মুহূর্তের সাথে এরকম যুদ্ধ করতে হয়েছে তাঁকে। বিভিন্ন জেলায় গিয়ে হোটেলে থাকার মতো টাকা না থাকলে চায়ের দোকানে, খাবার হোটেলে রাত কাটিয়েছেন তিনি। কখনো সকালে না খেয়ে, আবার মাঝে মধ্যে রাতে না খেয়েও ঘুমিয়ে পড়তেন। এভাবেই সমাজের অসঙ্গতি দূর করার বাংলাদেশ ঘোরার স্বপ্নযাত্রা শেষ হয় সাব্বিরের।

একদম নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান সাব্বির। ২০১৫ সালে বাকৃবিতে মাৎস্যবিজ্ঞানে স্নাতকে ভর্তি হন। আর এবছরই স্নাতক পাশ করেন। বাবা সাইকেলের মেকানিক। ওখান থেকেই সাইকেলের প্রতি ভালোবাসা সাব্বিরের। আর মা গৃহীনী। প্রতিমাসে গরুর ঘুটা (গোবর দিয়ে তৈরি জ্বালানি) বিক্রি করে তার পড়াশোনার খরচ জোগাতেন। বাকৃবিতে ভর্তির পরই সাইকেল কেনার শখ জাগে তাঁর। কিন্তু গরীব মা-বাবার পক্ষে ছেলের সে সখ মেটানো খুব সহজ ছিল না। প্রায় বছর দেড়েক পর অনেক কষ্টে বড় ও ছোট বোনের ১০ হাজার টাকা, ছোট ভাইয়ের ৫০০ টাকা এবং মা-বাবার জমানো কিছু টাকায় কিনে ফেলেন নতুন একটা সাইকেল। সেই সাইকেলে চড়ে সাব্বির শুধু পুরো দেশ ঘুরিয়েই বেড়াননি বরং সচেতন করার চেষ্টা করেছেন দেশের মানুষকে।

২০১৭ সালে নেত্রকোণা দিয়ে ভ্রমন শুরু করেন। তিনি জানান, যখন কোথাও যাওয়ার প্লান করতাম সেদিন ফজরের আযানের ঠিক পরপরই বেরিয়ে পড়তাম। আর সবসময় সঙ্গে নিতাম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। টুকটাক আর সাথে থাকতো পানির বোতল, হেলমেট, ব্যাগের ভিতর টি শার্ট, ব্রাশ, ফোনের চার্জার প্রভৃতি। সারাদিন সাইকেল চালাতাম। যখন রাতে থাকার ব্যবস্থা  করতে পারতাম না, তখন রাতেও সাইকেল  চালিয়েছি। যখন সাইকেল চালাতাম আশে পাশের লোকজন দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে। আমি তাদেরকে আমার পরিচয় দিয়েছি। অনেক সময় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ভুল করে পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর ‘বাংলাদেশ’ স্থলে ‘ময়মনসিংহ’ ছাপা হয়। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালরের ভুল নাম মানতে পারি না। কেউ যদি এটি না করে তার জন্য আমি সবাইকে জানিয়েছি।

সাইকেল ভ্রমনের সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে সাব্বির বলেন, বেশিরভাগ সময়ই অপরিচিত মানুষদের বাসায় থাকতাম। আবার ওয়াজ মাহফিল কিংবা রাতে মসজিদেও থেকেছি। আসলে অপরিচিত মানুষদের আতিথেয়তা আমাকে মুগ্ধ করতো। রাস্তায় স্কুল-মাদরাসার বাচ্চাদের সাথে সময় কাটিয়েছি, ছবি তুলেছি। এগুলো আমার কাছে মজার স্মৃতি ছিল। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। কষ্টের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পিরোজপুর জেলায় গিয়ে বেশ বিপদে পড়ছিলাম। বাস-টার্মিনালের পাশে একটি চায়ের দোকানে ছিলাম। ওখানে নেশাখোর কিছু মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার সাইকেল নিয়ে ঘোরা নিয়ে ক্যাম্পাসের বন্ধুবান্ধব আমাকে পাগল বললেও পরে তারাই তাকে বিভিন্নভাবে আমাকে সহযোগিতা করেছে। অনেক জেলায় গিয়ে এই বন্ধুদের বাসায়ও থেকেছি। এছাড়াও ক্যাম্পাসের বড় ভাই যারা বিভিন্ন সরকারি বেসরকারী জায়গায় কর্মরত তারা আমাকে ভীষণভাবে সহযোগিতা করেছেন। আমার আগমনের খবরে তারা অনেক খুশি হতে দেখেছি। আর ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ৬৪তম জেলা হিসেবে কক্সবাজারে এসে শেষ করি বাংলাদেশ ভ্রমণ।



আর এই ছেলে যেখানেই গেছেন সেখানে মানুষের সাথে সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলেছেন। সাইকেল সামনে কিংবা বুকে করে বহন করেছেন অসঙ্গতি দূর করার এসব প্লাকার্ড। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘চলো যাই যুদ্ধে-মাদকের বিরুদ্ধে’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘কোটা সংস্কার করুন’, ‘রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চাই’, ময়মনসিংহ নয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ‘রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নাও’ ‘ধর্ষণকে না বলুন’, ‘পরিবেশ দূষণ রোধ করি’, ‘গাছ লাগান’, ‘বাল্য বিবাহকে না বলুন’ প্রভৃতি।

এই কাজগুলো কেন করলেন এটা জানতে চাইলে সাব্বির বলেন, আমরা যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, আমাদের প্রত্যেকের জন্য সরকারের অনেক টাকা ব্যয় হয়। আর এ টাকাগুলো খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সবার ভ্যাট ট্যাক্সের। তাঁদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা থেকেই করেছি। আমৃত্যু পর্যন্ত এটি করে যেতে চাই। ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাব্বির বলেন, একমাত্র মা-বাবার সহায়তায় এতদূর এসেছি। পুরো বাংলাদেশ তো ঘোরা শেষ হলো। এবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দানকারী প্রথম দেশ ভুটানে যেতে চাই। আর দেখা করতে চাই ময়মনসিংহ মেডিকেলের কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লোতে শিরিং এর সাথে। কিন্তু আমার মা-বাবা পাসপোর্ট ভিসাসহ অনান্য খরচ বহন করতে পারবে না। কোন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি আমাকে একটু সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন তবে এটি আমার জন্য সহজ হতো।

escort izmir