নিরাপদ ডিম ও ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনের জন্য সজনাপাতা ও স্পিরুলিনা

গবেষণায় ড. মোছা: ফারহানা শারমিন এবং সার্বিক তত্তাবধানে ড. নাথু রাম সরকারঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষির ভূমিকা অনস্বীকার্য। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি অধিক জনসংখ্যার এ দেশে কৃষির সাথে সরাসরি জড়িত। এছাড়াও দারিদ্র বিমোচন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কৃষি খাতটি আধিক সম্পর্কযুক্ত। বিগত ২০-২৫ বছরে হাঁস-মুরগি পালনের এই পেশাটি ক্রমাগতভাবে পরিবর্তন হয়ে বাণিজ্যিক বা শিল্পের আকার ধারণ করেছে। এদেশে ১ জন মানুষ সারা বছরে খেতে পারে মাত্র ৯৫ টি ডিম যেখানে বছরে ১ জন মানুষের কমপক্ষে প্রতি সপ্তাহে ২টি করে মোট ১০৪ টি খাওয়া উচিত (প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর’২০১৮)।

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে একজন মানুষ বছরে ২৪০ টি ডিম খেয়ে থাকে। পুষ্টিবিদগণের মতে একজন সুস্থ মানুষকে বছরে কমপক্ষে ১৮০ টি ডিম খেতে হবে (WPSA-BB, 2019)। অপরদিকে একজন মানুষের দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংস গ্রহণ প্রয়োজন সেখানে প্রাপ্যতা ১২২.৬০ গ্রাম (২০১৭-১৮) যার প্রায় ৫৫% পোল্ট্রি খাতের অবদান (সপ্তম-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা)। পৃথিবীতে মুরগির মাংস ও ডিম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর অবদান যথাক্রমে ৩৩ ও ৫০ শতাংশ। এশিয়ার মধ্যে কেবল চীন দেশই ৪৭ মাংস ও ৬৩ শতাংশ ডিমের চাহিদা পূরণ করছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সমস্ত এশিয়ার চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ মাংস এবং ৮৩ শতাংশ ডিমের যোগান দিয়ে আসছে (Anonymous, 1998)। পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়নের কারণে বিগত ১৫ বছরে মুরগির মাংসের খাওয়ার পরিমাণ বছরে জন প্রতি ১.৫ কেজি থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৬ কেজিতে উন্নিত হয়েছে, যা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ৮.৪২ কেজিতে উন্নিত করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএলআরআই) ঢাকার সাভারস্থ প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি উন্নয়নে গত ১৯৮৬ সন থেকে গবেষণা করে আসছে। বিগত কয়েক বছর থেকে নিরাপদ মুরগির মাংস ও ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যে এন্টিবায়োটিকের বিকণ্প হিসেবে বিভিন্ন খাদ্য অনুসঙ্গ (Feed additives)-এর উপর গবেষণা করে আসছে। এই গবেষণার ফলাফলের ধারাবাহিকতায় আরো নিবিড় ভাবে সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গবেষণা (মাংস ও ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডস বৃদ্ধি করা, ডিমের কুসুম ও মাংসে কোলেষ্টেরলের মাত্রা এবং প্রাকৃতিক এন্টিঅক্সিডেন্টের ফলে প্রোডাক্টসের অক্সিডেশন কমানো) করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আবশ্যক। কৃষি পণ্যের ভ্যালু এডিশন ও প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে নিরাপদ পন্য উদ্ভাবনের উপর স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ফলে, উন্নত বিশ্বের দেশের মানুষের ন্যায় আমাদের দেশের মানুষের মাঝেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে বর্তমানে ভ্যালু এডেড প্রোডাক্টসের চাহিদা ক্রমাগতভাবে দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আমাদের দেশে অনেক গুলো ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে যেমন. নিম, সজনা, পুদিনা, তুলসী এবং সামুদ্রিক শৈবালসমূহ (যেমন: স্পিরুলিনা) ইত্যাদি। এই উদ্ভিদ গুলোর পাতা এবং শিকড় প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন রকম অসুখে ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কারণ তাদের ভিতরে বিশেষ ধরনের কার্যকরী উপাদান (Active components) রয়েছে। এই ভেজষ উদ্ভিদ গুলোর মধ্যে থেকে গবেষণার জন্য প্রাথমিক ভাবে সজনা এবং স্পিরুলিনাকে নির্বাচন করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কিছু কার্যকরী উপাদান  যেমন-ফেনল (Phenol), ফ্ল্যাভানয়েড (Flavonoid), টেনিন (Tannin), স্যাপোনিন (Saponin), টারপিনয়েড (Terpenoid) এবং আ্যলকলয়েড (Alkaloid) রয়েছে।

ফাইকোসায়ানিন স্পিরুনিনার একটি সক্রিয় যৌগ যার শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহ জনক (Anti-inflamatory) বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মজার বিষয় হলো স্পিরুলিনার এন্টিঅক্সিডেন্ট গুলো মানুষ এবং প্রাণী উভয় ক্ষেত্রে লিপিড পারঅক্সিডেশনকে হ্রাস করে। আর একটি বিষয় হল সজনা পাতা এবং স্পিরুলিনার হাইপারকোলেষ্ট্রেমিক ইফেষ্ট আছে, যা ভাল কোলেষ্টরোল যেমন HDL এর পরিমানকে বাড়িয়ে দেয় এবং অপরদিকে ক্ষতিকর কোলেস্টেরোল যেমন LDL এর পরিমানকে কমিয়ে দেয়। শুধু তাই নয় সজনা এবং স্পিরুলিনার মধ্যে well balanced ফ্যাটি এসিড আছে, যা অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বিশেষকরে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বিদ্যমান থাকে যাকে ব্রেন ফুড বলা হয়।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হলো পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যা হৃদরোগ প্রতিরোধসহ দেহের বিপাক ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান । মূলত আলফা লিনোলিক এসিড, EPA (ইকোসা পেন্টা ইনোয়িক এসিড) এবং DHA (ডো কোসা হেক্সা ইনোয়িক এসিড) এই তিনটিকে ওমেগা–৩ ফ্যাটি এসিড বলা হয়। মূল বিষয়টি হলো এ পুষ্টি উপাদানগুলো আমাদের দেহ তৈরী করতে পারে না ফলে খাদ্য উপাদানের মাধ্যমে যোগান দিতে হয়।

বর্তমান গবেষণার অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে মাংস ও ডিমের গুনাগুন বৃদ্ধিতে সজনা পাতা ও স্পিরুলিনার (সামুদ্রিক শৈবাল) ছবি) গুড়া মুরগির খাদ্যে ব্যবহার করে কেবলমাত্র ২ টি গবেষণা সম্পন্ন করা হয়েছে। একটি মাংস উrপাদনকারী ব্রয়লার মুরগিতে এবং অন্যটি জাতের দেশী ডিমপাড়া মুরগিতে। প্রাথমিক ফলাফলে অনেকটা আশা আশাবাঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের কুসুমের কোলেস্টেরলের পরিমান তাৎপর্যপূর্নভাবে হ্রাস পেয়েছে, পাশাপাশি মাংস সংরক্ষণের সময়সীমা ও ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। সজনা পাতা ও স্পিরুলিনার গুড়া যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ১.৫ শতাংশ হারে ব্রয়লার মুরগির খাবারে ব্যবহারের ফলে খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে, মাংস সংরক্ষণের গুনাগুন বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থ্যাৎ সংরক্ষিত মুরগির মাংসের লিপিড অক্সিডেশন কমেছে। বর্ণিত উপাদান সমূহ ফিড এডিটিভস হিসাবে ব্যবহারের ফলে মাংসের কোলেস্টরলের পরিমাণ শতকরা যথাক্রমে ৬৫% ও ৭১% কমেছে। এছাড়াও, মুরগির মাংসে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সজনা পাতা ও স্পিরুলিনার গুড়া যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ১.৫ শতাংশ হারে দেশী জাতের ডিম পাড়া মুরগির খাবারে ব্যবহারের ফলে ডিমে পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ডিমের ওজন প্রায় ১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ বাণিজ্যিকভাবে প্রাপ্ত ডিমের ন্যায় গবেষণায় প্রাপ্ত ডিমে আশাব্যাঞ্জক হারে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বৃদ্ধি পেয়েছে।   

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ন হলেও উন্নত দেশ রূপান্তরের লক্ষ্যে আমাদের মাংস উৎপাদন এবং গুনগতমান আবশ্যিকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। সেক্ষেত্রে পোল্ট্রি গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, অন্যান্য প্রাকৃতিক দেশীয় খাদ্য অনুসঙ্গ ব্যবহার করে গবেষণা কার্যক্রমটি আগামীতে টার্কি, মাংস উৎপাদনকারী মুরগি ও বাণিজ্যিক লেয়ার মুরগিতে পরিচালনা করা হবে। পরিপূর্ণ ফলাফলের ভিত্ত্বিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ মুরগির মাংস ও ডিমের গুনাগুন তথা উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশ প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার নিকটবর্তী হলেও ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ এবং ভ্যালু এডেড প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করা অত্যন্ত জরুরী। এক্ষেত্রে এধরনের গবেষনা কর্ম নিরাপদ পোর্ল্ট্রির মাংস ও ডিম উৎপাদনে অগ্রনী ভূমিকা রাখতে পারে।



গবেষক পরিচিতি:
ড. মোছা: ফারহানা শারমিন, পিএইচ ডি (টোকিও, জাপান)
পোষ্ট-ডক্টরাল গবেষণা ফেলো, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট
পোল্ট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগ, বিএলআরআই, সাভার, ঢাকা।
মোবাইলঃ ০১৭৭৫-৩৬৯৩৮৫,ইমেইল: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.    

সার্বিক তত্তাবধানে:
ড. নাথু রাম সরকার
মহাপরিচালক (অঃদাঃ)
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট
সাভার, ঢাকা।
মোবাইলঃ ০১৭১১৭৩৩১১৯, ইমেইল: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

escort izmir