পোল্ট্রি শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে

মেধা ও শারীরিক গঠনের জন্য প্রতিটি মানুষের দৈনিক প্রায় ১২০ গ্রাম প্রাণিজ আমিষ খাওয়া প্রয়োজন। দেশে ব্রয়লার তথা পোল্ট্রি শিল্পের অভাবনীয় উন্নতির কারণে এটি অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে। তবে বিভিন্ন জটিলতা আর শঙ্কার মধ্যে আছে কৃষি প্রধান এ দেশের বৃহৎ এ শিল্প। এ শিল্পকে টিকে রাখা এবং ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলেছেন দেশের নামকরা পোল্ট্রি প্র্যাকটিশনার ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) প্যাথলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. প্রিয় মোহন দাস। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবুল বাশার মিরাজ

পোল্ট্রি শিল্প নিয়ে কি ভাবছেন?

ড. প্রিয় মোহন দাস: দেশের উদীয়মান একটি শিল্প হচ্ছে পোল্ট্রি। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছেই প্রোল্ট্রি মাংস গ্রহণযোগ্য। ব্রয়লার সহজলভ্য ও সর্বত্রই পাওয়া যায়, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণও সহজ। আগামীতে পোল্ট্রি মাংসই প্রোটিনের চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তবে মাংস উৎপাদনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা জুনোটিক রোগসমূহ যেমন-এভিয়ান ফ্লু প্রভৃতি নিয়ে ভাবতে হবে।

পোল্ট্রির সাথে প্রযুক্তি কতটুকু জরুরী ?

ড. প্রিয় মোহন দাস: কম সময়ে প্রযুক্তি এ শিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পূর্বে অনেকগুলো বিষয় মাথায় রেখে প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করা উচিত। প্রযুক্তির সমস্যা হচ্ছে এতে গ্রামীণ ক্ষুদ্র খামারীরা অত্যাধিক দামের কারণে ব্যবহার না করতে পারায় তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে বড় খামারীরা এটি গ্রহণ করায় তাদের উৎপাদন ব্যয় কমেছে ও লাভবান হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার না করায় গ্রামীণ পর্যায়ের ক্ষুদ্র খামারীদের টিকে থাকা টা একটু কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে।

ক্ষুদ্র খামারীদের টিকিয়ে রাখতে আপনার পরামর্শ কি?

ড. প্রিয় মোহন দাস: ক্ষুদ্র খামারীরা একত্র হয়ে সমবায় পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করতে পারে। চর এক্সপোর্ট জোন তৈরি করে খামার পরিচালনা, ভ্যালু এডেড পণ্য উৎপাদনে মনোযোগি হওয়ার মাধ্যমে এটি টিকে রাখা সম্ভব।

পোল্ট্রির রোগ বালাই নিয়ে খামারীরা কিভাবে সচেতন হতে পারে?

ড. প্রিয় মোহন দাস: যে কোন একটি রোগ হওয়ার মাধ্যমে পুরো একটি খামারের সবগুলো মুরগী/ হাঁস মরে যেতে পারে। আর এটি ২-৩ দিনেই হতে পারে। যেহেতু বাইরের ল্যাব রির্পোটের জন্য কমপক্ষে তিন-চারদিন লেগে যায়। সেকারণে খামারীদের উচিত নিজস্ব ল্যাব তৈরি করা এবং ল্যাব যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা। এতে প্রায় ৯০ ভাগ রোগ বালাই নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। এছাড়াও নিয়মিত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকতার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পোল্ট্রির ঝুঁকি নিয়ে কিছু বলবেন কি?

ড. প্রিয় মোহন দাস: বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখের মতো ছোট বড় হাঁস ও মুরগির খামার রয়েছে। এসব খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান কেমন তা মূল্যায়ন করার সময় এসে গেছে। পরিকল্পনা ছাড়া যেখানে সেখানে গড়ে উঠেছে পোল্ট্রি খামার। প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। মানসম্মত বাচ্চার অভাব, বাসস্থান স্বাস্থ্যসম্মত নয়, ত্রুটিপূর্ণ রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সঠিক জীব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই ফলে ব্রয়লার মুরগির ওজন বৃদ্ধি হয় না এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। এতে করে খামারীরা বাধ্য হয়ে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রদানের ফলে রোগ জীবাণু ও এন্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মুরগির শরীরে থেকে যায়, যা খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে আসে।

নিরাপদ ব্রয়লারের বিষয়ে আপনার পরার্মশ কি?

ড. প্রিয় মোহন দাস: বর্তমান সময়ে নিরাপদ ব্রয়লারের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে খামারে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত পোশাক, জুতা, গ্লোভস এবং মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। খামারের প্রবেশ মুখে ফুটবাথ থাকতে হবে এবং ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নির্ভরযোগ্য উৎস এবং লাইসেন্স প্রাপ্ত ডিলার থেকে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ ও ভিটামিন সংগ্রহ করতে হবে। বাচ্চা গ্রহণের সময় গড় ওজন দেখতে হবে। সব বাচ্চা একই গ্রেডের, আকৃতির আছে কিনা? খাদ্য ক্রয়ের সময় বস্তার গায়ে পুষ্টিমানের বিবরণ দেখে নিতে হবে। উত্তম খামার ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম অনুসরণ করা। রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকা দিতে হবে। অল-ইন-অলআউট পদ্ধতি অনুসরণ করা। ধারণক্ষমতার বেশি মুরগির বাচ্চা উঠানো যাবে না। অসুস্থ মুরগি আলাদা রাখতে হবে। মৃত মুরগি যেখানে সেখানে না ফেলে মাটির নিচে পুঁতে রাখতে হবে।
 
কোন উপায়ে আমরা নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদন করতে পারি ?

ড. প্রিয় মোহন দাস:
১.ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত মানসম্পন্ন খাদ্য ক্রয় করা। নির্ভরযোগ্য উৎস এবং লাইসেন্স প্রাপ্ত ডিলার থেকে মুরগির খাদ্য সংগ্রহ করতে হবে। ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যে আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য গবেষণাগারে খাদ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রাসায়নিক দ্রব্য মুরগির মাংস ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জমা থাকে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

২. ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত মানসম্পন্ন ভিটামিন ও মিনারেল ক্রয় করা। নির্ভরযাগ্য উৎস ও লাইসেন্স প্রাপ্ত ডিলার থেকে ভিটামিন, মিনারেলও ওষুধ সংগ্রহ করতে হবে। ওষুধের মেয়াদ দেখে নিতে হবে। প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা উচিত। নিম্নমানের ভিটামিন-মিনারেল ব্যবহার করলে মুরগির ওজন হ্রাসসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। রাসায়নিক দ্রব্য মুরগির মাংস ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জমা থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
 
৩. ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত নিরাপদ ও পরিষ্কার পানি ব্যবহার করা। পানিতে রাসায়নিক দ্রব্য যেমন-আর্সেনিক, আয়রন ধাতুর উপস্থিতি ক্ষতিকর। তাই বছরে একবার পানি পরীক্ষা করা দরকার। প্রতি মাসে দুইবার ব্লিচিং পাউডার দ্বারা পানির ট্যাংক পরিষ্কার করতে হবে। পানি কীটনাশক দ্বারাও দূষিত হতে পারে।

৪. প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার এড়াতে প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা দরকার। সঠিক মাত্রা ও প্রত্যাহার সময়সীমা মেনে চললে মুরগির মাংসে এন্টিবায়োটিক এবং রেসিডিও সহনশীল মাত্রায় কমে আসে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিমুক্ত। উত্তম ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি এর বিকল্প হিসেবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না।

৫. খাদ্য, ওষুধ ও পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারা দূষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। খামারের বাইরে আলাদা জায়গায় খাদ্য ও ওষুধ মজুদের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে বিরূপ আবহাওয়া, রাসায়নিক (যেমন- লুব্রিকেন্ট বা কীটনাশক) এবং পরিবেশগত দূষণ থেকে সুরক্ষা করা যায়। ফিডার ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

পোল্ট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিতে আরো কি করা যেতে পারে?

ড. প্রিয় মোহন দাস: সরকার খামারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। বিভিন্ন জায়গায় ডায়াগোনোসিস ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। খামারগুলোকে পরিচালনা করার জন্য সুদের হার কমানো ও বিমার আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort