শীতঋতু-জীবন সংগ্রামে মজার স্পন্দন উপলব্ধি গাছিদের

নজরুল ইসলাম তোফা:দিনদিন খেজুরগাছ হারিয়ে যাচ্ছে ফলে এর সাথে জড়িত গাছিদের বেঁচে থাকতে অনেক সংগ্রাম করতে হচ্ছে।আর এই শীত ঋতুতে জীবন সংগ্রামে অনেক কষ্টের মাঝেও অনেক প্রাপ্তিই যুক্ত হয় গাছিদের। জীবন সংগ্রামে মজার স্পন্দন উপলব্ধি পান গাছিরা এই শীত ঋতুতে।

কার্তিক মাসের শুরু হতে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত তারা খেজুর গাছ কাটায় ব্যস্ত সময় পার করে গাছিরা। ভালোভাবে রস পেতে হলে খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটার জন্য কয়েকটি উপকরণ ব্যভহার করেন তারা। যেমন-'দা', দা রাখার জন্য একটি 'ঝাঁপি', 'দড়ি' এবং এক টুকরো 'চামড়া' বা পুরনো 'বস্তা'।

গাছিরা যেই ঝাঁপি ব্যবহার করে তা বাঁশ দিয়ে তৈরি। গাছে উঠার সময় গাছি এই ঝাঁপিতেই 'দা' রাখে। কোমরে বেঁধেও নেয় চামড়া বা বস্তা। গাছ কাটার সময়ে তাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্যে গাছি কোমর বরাবর গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে নেয়। দড়িটা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। এমন দড়ির দুই মাথাতেই বিশেষ কায়দায় গিট দেওয়া থাকে। গাছে উঠার সময় গাছি অতি সহজে মুহূর্তের মধ্যেই গিঁট দুটি জুড়ে দিয়েই নিজের জন্যে গাছে উঠার নিরাপদ ব্যবস্থা করে নেয়।

গাছ কাটার জন্য গাছের মাথার এক দিকের শাখা কেটে, চেঁছে পরিষ্কার করা হয়। কাটা অংশের নিচের দিকেই দুটি খাঁজ কাটা হয়। খাঁজ থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে এক সরু পথ বের করা হয়। এই সরু পথের নিচে বাঁশের তৈরি নলী বসানো হয়। এমন নলী বেয়ে হাড়িতে রস পড়ে। নলীর পাশে বাঁশের তৈরি খিলও বসানো হয়। এমন খিলেই মাটির হাড়ি টাঙিয়ে রাখা হয়। হাড়িতে রস জমা হয়। গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্যে মাটির হাড়ি ব্যবহার করা হয়। এমন এ হাড়িকে বলে ভাঁড়। আবার কোথাও বলে 'ঠিলা'। ভাঁড় দেখতে ছোট হয়, আকৃতিটাও ঠিক কলসের মতো।

রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর পাঁচ ছয় দিন পর আবার কাটা হয়। গাছের এ কাটা অংশ শুকানোর জন্য এমন সময় দেওয়া হয়। কাটা অংশ শুকানোর সুবিধার জন্যই সাধারণত পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে গাছ কাটা হয়। কারণ হলো যে, সূর্যের আলো সরাসরি কাটা অংশটুকুতে পড়ে।

বিকেল থেকে হাড়িতে রস জমা হতে হতেই সারা রাত্রিতে হাড়ে পূর্ণ হয়। গাছ কাটার পর দুই তিন দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান কাট। জিরান কাট রস খুবই সুস্বাদু। প্রথম দিনের রস থেকে ভালো পাটালি গুড় তৈরি হয়। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলে দোকাট। তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভর মৌসুম।এ সময়টাতে উপভোগ করেন গাছিরা উপভোগ করেন জীবন সংগ্রামে মজার স্পন্দন।

সত্যিই এমন দৃশ্য দেখা যায় খেজুর বনের পাশে উঁচু ভিটায়। এমন নিবিড় স্তব্ধতার মধ্যেও যেন জীবন সংগ্রামে তাদের মজার স্পন্দন উপলব্ধি হয়। উনুনের পাশেই থাকে গাছি বা শ্রমিক মজুর, তাদের থাকবার জন্যেই বানায় 'কুঁড়ে ঘর', খেজুরের পাতা এবং বিচালি দিয়ে ছাওয়া হয়। কান পাতলে শোনা যায়, গাছিয়া নিঃসঙ্গতা কাটাতে গ্রামাঞ্চলের বহু প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক গান শুনতে পাওয়া যায়। তাদের সুরে আছে অদ্ভুত প্রাণময়তা ও আবেগ, সহজেই হূদয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। তাদের এই শীতে উপাদেয় খাবার খেজুরের রস। তারা সংগ্রহে ব্যস্ত এ গাছ থেকে ও গাছে এবং খেজুর রস সংগ্রহ করতে শীত কাঁপানি কন্ঠে মজার মজার গান ধরে।

লেখক-টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort