নবান্ন উৎসব ও কৃষি দিবস-কৃষকের উন্নয়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে

*ড. মো: তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন:আজ (বৃহস্পতিবার) ১লা অগ্রহায়ন, কৃষকের নতুন ধানের উৎসব বা নবান্ন উৎসব। কৃষক তাঁর প্রধান ফসল গোলায় তুলে এই উৎসবে মেতে ওঠেন। জাতীয়ভাবে এ দিনটিকে এখন কৃষি দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বিভিন্ন সমাজে, গোত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই উৎসব উদ্যাপনের প্রচলন রয়েছে। আমাদের আবহমান গ্রামবাংলায় কৃষক অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান গোলায় তুলে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে আসছে। এ নবান্ন উদ্যাপনে হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে একসময় আনুষ্ঠানিকতা ছিল খুব বেশি। চলত বাড়ি বাড়ি পিঠাপুলির বিনিময়। দল বেঁধে বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে মুখোশ পরে গাঁয়ের বিভিন্ন বাড়ি ঘুরে নেচে-গেয়ে সারা দিন নতুন ফসল সংগ্রহ করত গ্রামের কৃষক-কৃষানীরা। কীর্তন, পালাগান ও জারিগানের আসর সন্ধায় শুরু হয়ে চলত গভীর রাত অবধি। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন মসজিদ ও পীরের দরগায় শিরনি দিয়ে নবান্নের আয়োজন হতো। হাটে নতুন ধান বিক্রি করে নতুন পোশাক কিনে তা পরে কৃষক এই উৎসবে মেতে উঠতেন। মেয়ের জামাই বা আত্মীয় স্বজনকে দাওয়াত করে খাওয়ানো বা ‘নয়াখাওন’ ছিল মুসলমানদের এই উৎসবরেই অংশবিশেষ।

গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল কৃষকের নিজস্ব সম্বল। তখনকার কৃষক সমাজের মূল উৎপাদিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, অর্থনীতির চাকা সে নিজে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কালের বিবর্তনে জমিদারদের চক্রান্তে কৃষক তার জমি হারিয়েছে, গোলা হারিয়েছে, শক্তি হারিয়েছে, পেশিও হারিয়েছে। কৃষককে আজ বলা হয় ভূমিহীন ক্ষেতমজুর। তাঁরা আজ জমি হারিয়ে, গোলা হারিয়ে মহাজন আর জোতদারের গোলায় ফসল তুলে চলেছেন। গোলা আজ সব মহাজন আর জোতদারের আড়তে জড়ো হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ কৃষক আজ নিঃস্ব, সহায় সম্বলহীণ ও দিন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা। নবান্নের ঢেউ তাদেরকে আর আনন্দে মাতোয়ার করে না। তাই চটকদার কোন আয়োজনে এখন আর কৃষকের হৃদয়কে নাড়া দেয় না।

আজ উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন মিলনায়তনে, বটতলা, লিচুতলা অথবা বিভিন্ন মাঠে-ঘাটে নবান্নের নানান আয়োজনে হয়ত মুখরিত। কর্পোরেট এই কালচারে আমরা ঘটা করে গান-বাজনা বাজিয়ে, রং বেরংয়ের র‌্যালী করে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করি। কৃষিকে শহুরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা সাধুবাদযোগ্য। সরকারও জেলা-উপজেলা লেভেলে এখন জাতীয়ভাবে এ উৎসব পালন করছে, কৃষককে উৎসাহ যোগানোর চেষ্টা হচ্ছে নানানভাবে। তবে শহুড়ের এই আনুষ্ঠানিকতায় সত্যিকারের নবান্নকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। বারান্দায় বা ছাদ কৃষি করে গৃহের শোভাবর্ধন কিংবা সাময়িক তৃপ্তি লাভ করলেও তাতে দেশে খাদ্য শস্যের চাহিদা যেমন মেটানো যায় না। সেই চাহিদা মেটাতে জমিতে ফসল ফলানো ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প নেই। যাঁর নবান্ন তাঁকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। কৃষকের উৎসবটি কৃষককে ফিরিয়ে দিলেই তা বাঁচবে। আর তা করতে হলে সবার আগে কৃষককে তাঁর জমি ফিরিয়ে দিতে হবে, গোলা ফিরিয়ে দিতে হবে, আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষন দিতে হবে, তাদের যথাযথ সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই কৃষক তাঁর ধান ও ফসল ফিরে পাবেন, তাঁর নবান্ন ফিরে পাবেন। আর তা না হলে কিছুদিন পর নবান্ন কেবল আমাদের জাতীয় দিবস কিংবা শিল্প-সাহিত্যেই টিকে থাকবে, বাস্তবে একে পাওয়া হবে দুষ্কর।

কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য অপরিসীম এ কথাটি অস্বীকারের কোন উপায় নেই। আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। খাদ্য রফতানি করার সক্ষমতা অর্জন করছে, বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে বৈশ্বিক গড়কে পেছনে ফেলে পৃথিবীতে চতুর্থ স্থান করে নিয়েছে। চাল রফতানি করছে সার্কভুক্ত কয়েকটি দেশে। প্রবাসীরা দেশের বাইরে থেকেও স্বাদ পাচ্ছে দেশের চালের। ফল ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ শুধু সাফল্যই নয় বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। আমাদের সু-স্বাদু আম এখন ইউরোপে যাচ্ছে। তাছাড়া বেশ ক’বছর থেকেই বাংলাদেশ সফলতার সাথে সবজি রফতানি করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রাণীজ আমিষ উৎপাদন অনেক বেড়েছে, ডিম-দুধের যোগান বেড়েছে এই খবরগুলি আমাদের খুবই আশাজাগানিয়া।

এতোসব ভাল খবরের পরেও আমরা স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও কৃষকের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়েছি। অন্য যে কোনো পেশা থেকে কৃষকের আয় অনেক কম বাংলাদেশে। কৃষককে আমরা তার দুর্যোগকালীন বা আপদকালীন সময়ে নিরাপত্তা দিতে পারিনা। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায়না। প্রতিদিন জীবন যুদ্ধের সাথে সংগ্রাম করেই বেচেঁ থাকে আমাদের প্রান্তিক কৃষকরা। আর্থিক দৈন্যতার কারণে তাদের জীবন যাপন হয় অত্যন্ত সাদাসিধে, দৈন্যতায় ভুগে তারা কোন আচার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চায়না। কৃষককে অন্য হাজারো শিল্পের মত তার প্রাপ্য জায়গায় সম্মান দিতে না পারলে কখনই তাদের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব হবেনা।

এ কথা সত্যি যে, সরকার নানানভাবে কৃষককে প্রনোদনা দিচ্ছে। সরকারের নানান উদ্যোগ প্রশংসার দাবী রাখে। কিন্তু কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও এখনো তা কাংক্ষিত উৎপাদনের থেকে অনেক কম। আর এই উৎপাদন ফারাক এর (Yield gap) কারণে কৃষক তাদের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ থেকে যে আয় আর মুনাফা পাবার কথা তা পান না। আমাদের দেশে এক হেক্টরে ধানের উৎপাদন হয় তিন থেকে চার টন। সময় লাগে ১৪০ থেকে ১৫০ দিন। ভিয়েতনামে ৯৫ দিনে ধান উৎপাদিত হয় ছয় টন। পরীক্ষামূলক মাঠে যে ফসলটির উৎপাদন সাত টন তা কৃষকের মাঠে তিন-চার টনে নেমে আসে। গরীব কৃষকরা তাদের কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনের জন্য যথাযথ বিনিয়োগ করতে পারেন না। এ বিনিয়োগগুলো হলো ভালো বীজ, যথাযথ ভূমি কর্ষণ, সেচ, সার, কীটনাশক, অতিরিক্ত কৃষিশ্রম প্রভৃতি।

উৎপাদন ফারাক কমানোর জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তার সাথে ফড়িয়া, যথাযথ সংরক্ষণের ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাব, বাজারজাত ও পরিবহনের সংকট এবং অব্যবস্থাপনা রয়েই গেছে। কৃষি উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন কৃষি ঋণ, সঠিক বীজ বিতরণ প্রভৃতি। তবে এগুলো আরো যথাযথ বিশ্লেষণের নিরিখে নেয়া প্রয়োজন। সরকারী এবং বেসরকারী উদ্যোক্তাদের কৃষিতে আরো বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী করা প্রয়োজন। সরকার চাইলেই কৃষিতে বিনিয়োগ খুব সহজেই বাড়াতে পারে। কৃষি রফতানি বাজার সৃষ্টি করার জন্য যথাযথ বাব্যস্থা নেয়া দরকার। রফতানির জন্য লবিস্ট ও বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে দূতাবাসগুলোতে কৃষি বাণিজ্য প্রতিনিধির পদও সৃষ্টি করা যেতে পারে। সঠিক পদ্ধতি আর নীতি নির্ধারণ করতে পারলে কৃষি রফতানিও বছরে কয়েক বিলিয়ন করা সম্ভব। আর মুখ্য বিষয় এতে করে কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন হবে।

প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমাদের কৃষকরা এখনও অনেক পিছিয়ে। আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের মাধ্যমে আমরা তাদেরকে শিক্ষিত করতে না পারলে তাদেরকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। এছাড়া ফলের মৌসুমে আমাদের অসংখ্য ফল বিনষ্ট হয় পঁচনে অথবা অপচয়ে। তেমনিভাবে চাহিদার অতিরিক্ত সবজি কোনো কোনো সময় কৃষককে ক্ষেতেই রেখে দিতে হয় কিংবা স্বল্প মূল্যে বিক্রি করতে হয়। ফলে কৃষক কাংক্ষিত আয় থেকে বঞ্চিত হন। এর মূল কারণ-বাংলাদেশে তেমনভাবে বিকশিত হয়নি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র।
পোলট্রি অনেক বড় শিল্প। কৃষিতে যেমন ভর্তুকি দেওয়া হয়, তেমনি প্রাণিসম্পদ শিল্পে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন। গত দু–তিন বছর ধরে গরুতে স্টেরয়েড বা হরমোন ব্যবহার করা হচ্ছে না বললেই চলে। হরমোন ব্যবহার করলে যে কৃষক বড় রকমের ক্ষতির মুখেও পড়তে পারেন, এটা আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। কৃষক বুঝতে পেরেছেন হরমোন ব্যবহার না করেও গরুকে আরও ভালো হৃষ্টপুষ্ট করা যায়। গত বছর যতগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে কোথাও হরমোন পাইনি।

প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। ভূমির ওপরের মাটি ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের জমি রক্ষা করতে হবে। ধনী ব্যক্তিরা শত বিঘা জমি কিনে রেখেছেন। চাষবাস করছেন না। এসব জমি ব্যবহারের একটা কার্যকর নীতিমালা থাকা উচিত। কৃষিকে গণমাধ্যমের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের সাফল্যের কথা যদি বলি, তাহলে কৃষি সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করেছে। ৭ কোটি থেকে আজ ১৬ কোটির বেশি মানুষ তারপরেও আমাদের খাদ্যের কোন সংকট নেই। তাই এসব বিষযগুলি মাথায় রেখে আমাদের দরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কার্যকরী পদক্ষেপ। আর তাহলেই কৃষি বাঁচবে, কৃষক বাচঁবে আর আামরাও বেঁচে যাব। অন্যথায় নবান্ন আসবে যাবে তাতে হয়ত কৃষকের খুব বেশি লাভ হবে না।

* লেখক-শিক্ষক, কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ই-মেইল:This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

antalya bayan escort bursa bayan escort adana bayan escort mersin bayan escort mugla bayan escort samsun bayan escort konya bayan escort