“দিনাজপুর-রংপুর কৃষি অঞ্চলে আমন ধানের চাষ ও ফলন বৃদ্ধিতে করণীয়” শীর্ষক কর্মশালা

এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম:বোরো ও আউশ আবাদের ন্যায় নির্বিঘ্নে আমন আবাদের জন্য মাঠ পর্যায়ে সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং খরা, জলমগ্নতা, স্বল্প মেয়াদী, সুগন্ধি, নাবী ইত্যাদি বিবেচনা করে এলাকা ভিত্তিক জাত নির্বাচন করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত সর্বশেষ প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। আমনের বীজতলা থেকে শুরু করে ঘরে ফসল তোলা পর্যন্ত সার্বক্ষণিক কৃষকদের সহায়তা করতে হবে।

০৭ জুলাই দিনাজপুর ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আঞ্চলিক কার্যালয়, রংপুর’র উদ্যোগে “দিনাজপুর-রংপুর কৃষি অঞ্চলে আমন ধানের চাষ ও ফলন বৃদ্ধিতে করণীয়” শীর্ষক কর্মশালায় বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদগণ এসব কথা বলেন।

ব্রি’র মহাপরিচালক ড. মো: শাহজাহান কবীর এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর’র মহাপরিচালক, কৃষিবিদ মোহাম্মদ মহসীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর’র পরিচালক (সরেজমিন উইং), ড. মো: আব্দুল মুঈদ এবং ব্রি’র পরিচালক (প্রশাসন), ড. মো: আনছার আলী। এছাড়াও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের দুই অতিরিক্ত পরিচালক, ৮ টি জেলার সকল উপ-পরিচালকবৃন্দ, ৫৯ জন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের বিজ্ঞানী, এনজিও প্রতিনিধি, কৃষক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন মিডিয়ার কর্মীগণ এ কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, রংপুর’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান ড. মোঃ আবু বকর সিদ্দিক সরকার। এছাড়াও ডিএই, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকদ্বয় তাদের স্ব স্ব অঞ্চলের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

মূল প্রবন্ধে ব্রি-রংপুরের প্রধান বলেন, ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, রংপুর প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে এ অঞ্চলের প্রধান প্রতিবন্ধকতা জলমগ্নতা, খরা, ঠান্ডাসহ কৃষি পরিবেশ অঞ্চল (এইজেড) ২, ৩, ৫, ২৫ ও ২৭ উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এরই ফলশ্রুতিতে ব্রি জলমগ্নতা, খরা সহিষ্ণু জাত, কাটারীভোগের ন্যায় প্রিমিয়াম কোয়ালিটির জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।

ড. সরকার তার প্রবন্ধে আমন ধানের চাষ ও ফলন বৃদ্ধির জন্য জলমগ্ন প্রবণ জমিতে ব্রি ধান৫২ এবং ব্রি ধান৭৯ চাষের উপযোগিতা বর্ণনা করেন। এছাড়া খরা প্রবন জমিতে ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬ ও ব্রি ধান৭১ চাষের কথা উল্লেখ করেন। তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন যে, বন্যা পরবর্তিতে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬, ব্রি ধান৩৪ সহ অন্যান্য আলোক সংবেদনশীল জাত চাষাবাদের উপর গুরুত্বারোপ করেন। দিনাজপুর অঞ্চলের মাটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ধান চাষের উপযোগী বিধায় ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৭০ ও ব্রি ধান৮০ চাষাবাদের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। মানুষের শরীরের জন্য অতৗব প্রয়োজনীয় উপাদান জিংক সমৃদ্ধ ধান ব্রি ধান৬২ ও ব্রি ধান৭২ চাষাবাদ পদ্ধতি তুলে ধরেন। তিনি অত্র অঞ্চলের ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথাযথ কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক আলোকপাত করেন।

ড. সরকার আমন ধানের আগাছা, রোগ ও পোকা দমনের সঠিক পদ্ধতি বর্ণনা করেন। তিনি আমন ধানের চারা রোপনের ৩০ দিন পর্যন্ত আমন ধানের জমিতে কোন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি আশা করেন বর্নিত আমন ধান চাষ ও তার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করলে বাংলাদেশের খাদ্য ভান্ডার বলে বিবেচিত দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে আমন ধান নির্বিঘেœ চাষাবাদ করা যাবে এবং কৃষকগণ অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হবেন।

প্রধান অতিথি কৃষিবিদ মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে যথাসম্ভব বোরো আবাদ কমিয়ে আউশের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে। আমন মৌসুমে বন্যার ঝুকি রয়েছে। তাই আমাদেরকে নাবী জাতের বীজ বপন করে রাখতে হবে যাতে বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়। মাঠ পর্যায়ে শস্য বিন্যাসের মাধ্যমে আমন মৌসুমে ব্রি উদ্ভাবিত স্বল্প মেয়াদী জাত অন্তর্ভূক্ত করণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী জাত স্বর্ণার অনেকটাই হ্রাস করা যায়। তিনি বলেন, প্রদর্শণী স্থাপন করে ব্যাপক কৃষক সমাবেশের মধ্য দিয়ে ব্রি উদ্ভাবিত নতুন জাত সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। তিনি অঞ্চল কমিটি বিভিন্ন সভা করে করে অত্র অঞ্চলের জন্য কি জাত ও পরিমাণ দরকার তার তালিকা তৈরী করে মৌসুম শুরুর পূর্বে জাতীয় পর্যায়ে প্রেরণ করার নির্দেশনা প্রদান করেন।

ব্রি’র মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর সমাপনি বক্তব্যে বলেন, দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে আমন আবাদ নির্বিঘœ করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্রি’র অনেক ভালো জাত আছে এবং কৃষকরা সেগুলো চাষাবাদও করছে কিন্তু বাজারে স্বর্ণা থাকায় অন্যান্য ধানের বাজার মূল্য পাচ্ছে না, এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা করার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি আরো বলেন, খরা প্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৭১ খুব ভালো জাত এবং এ জাতে বিপিএইচ বা কারেন্ট পোকা আক্রমনের সম্ভাবনা খুবই কম। এছাড়া ব্রি ধান৭৯ বন্যা প্রবণ এলাকার জন্য ভালো জাত। এ জাতটি বন্যা না হলেও ব্রি ধান৪৯ এর চেয়েও ফলন বেশি দেয়। ব্রি ধান৭০ কাটারিভোগ টাইপ এবং ব্রি ধান৮০ জেসমিন টাইপের সুগন্ধি জাত যা বিদেশে রপ্তানীযোগ্য। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ফসল বিন্যাসে ডাল জাতীয় শস্য আবাদ করতে হবে। চাহিদা মাফিক আগামীতে স্বল্প মেয়াদী নাবী জাত উদ্ভাবনের গবেষনা করা হবে। তিনি এই কর্মশালার অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে আগামী আমন ধানের আবাদ নির্বিঘ্নে করা যাবে এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষ অতিথি ড. মো: আব্দুল মুঈদ বলেন, এ ধরণের কর্মশালা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও আয়োজন করা উচিৎ। তিনি আমন আবাদ নির্বিঘ্ন করতে এলএলপি (লোগো-লাইন-পার্চিং) পদ্ধতি অবলম্বন, সুষম সারের ব্যবহার ছাড়াও নাবী জাতের প্রস্তুতি থাকা দরকার বলে মতামত ব্যক্ত করেন।

বিশেষ অতিথি ড. মো: আনছার আলী আমন আবাদ নির্বিঘ্ন করতে ব্লাস্ট রোগ দমন, জমিতে পটাশ সার, কৃষকদের বোলান রোপন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মত ব্যক্ত করেন। বন্যা প্রবণ এলাকায় বন্যা সহনশীল জাতের পাশাপাশি আলোক সংবেদনশীল জাতের বীজের বাফার স্টোক তৈরী রাখার জন্য পরামর্শ দেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, দিনাজপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক, এম এ ওয়াজেদ বিলেন, দিনাজপুর অঞ্চলের ৮০ ভাগ কৃষকই বোলান করে থাকে। অথচ বোলান করে যেমন জীবনকাল বেড়ে সে অনুযায়ি কৃষকরা ফলনও পায় না। তাই কৃষকদের বোলান রোপনে নিরুৎসাহিত করতে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষিবিদ মো: শাহ আলম বলেন, বীজের প্রাপ্তি আরো সহজলভ্য করে আলোচনার জন্য বিএডিসি’র নীতি নির্ধারক পর্যায়ের লোকদের এ ধরনের কর্মশালায় থাকার বলেন। এছাড়াও তিনি নাবী জাতের স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত উদ্ভাবনের কথা ব্রি’কে বলেন।  

ব্রি-রংপুরের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালার মধ্য দিয়ে আশা করা হচ্ছে রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে আমন মৌসুমের বিদ্যমান সীমাবদ্ধ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ধানের চাষ ও ফলন বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।