সাহস আর মনোবলে মুগ্ধ হাজারো দর্শক-ঘোড়দৌড়ের রানী নওগাঁর তাসমিনা

কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ:ঘোড়ায় পিঠে বসে ১৩ বছরের বালিকা তাসমিনা। সবাইকে পেছনে ফেলে সামনে ছুটে আসছে তাসমিনার দূরন্ত ঘোড়া। হাজারো দর্শকের হর্ষধ্বনিতে মুখরিত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার ময়দান। শেষ অবধি জয় হয় তাসমিনার। তার সাহস আর মনোবলে মুগ্ধ হাজারো দর্শক।

ঘোড়-সওয়ারী তাসমিনার জীবনে এমন ঘটনা হর-হামেশা ঘটে। নওগাঁর মেয়ে তাসমিনা এ পর্যন্ত অর্ধশত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অন্তত ৩০টি খেলায় ছিনিয়ে এনেছেন প্রথম পুরস্কার। পেয়েছেন নানা ধরনের পুরস্কার। এখন উত্তরাঞ্চলের যে কোনো প্রতিযোগিতায় তাসমিনার অংশগ্রহণ মানেই ঢল নামে দর্শকের।

নওগাঁ জেলার ধামেরহাট উপজেলার পূর্ব চকসুবল গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর ওবায়দুল হোসেনের মেয়ে তাসমিনা। পড়েন সংঘেরপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে। বাবার একটি ঘোড়া ছিল বাড়িতে। ৭ বছর বয়স থেকেই ঘোড়াটিকে ঘাস খাওয়ানোসহ লালন-পালনে সহায়তা করতে গিয়ে সখ্যতা তৈরী হয় ঘোড়ার সাথে। তারপর ধীরে ধীরে নেমে যান প্রতিযোগিতার মাঠে। প্রথমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার মধ্যদিয়ে শুরু হয় ঘোড় সওয়ারী তাসমিনার অভিযাত্রা। এরপর নওগাঁর পাশাপাশি রংপুর, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় মেলাসহ নানা আয়োজনে ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতায় তাসমিনার ছুটে যাচ্ছেন।

ঘোড়সওয়ারি তাসমিনাকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং পিপলস’ এ স্থান পাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে দরিদ্র পরিবারের মেয়ে তাসমিনা। ইতিমধ্যে প্রামাণ্যচিত্র ‘অশ্বারোহী তাসমিনা’ বেশকয়েকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।

তাসমিনাকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং পিপলস’ এ স্থান পাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তাসমিনা। ইতিমধ্যে প্রামাণ্যচিত্র ‘অশ্বারোহী তাসমিনা’ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র-‘ওমেন্স ইন্টারন্যাশনাল এন্টারটেইনমেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ৫১তম প্রিজন্সে ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ফেস্টিভ্যাল থিম পুরস্কার এবং জেন্ডার ইক্যুইটি পুরস্কার। অফিশিয়াল সিলেকশন ও অনারেবল মেনশন-এলএ সিনেফেস্ট, লস-অ্যাঞ্জেলস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ট্রান্সসিলভানিয়া শর্টস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, টার্গুমরেস, রোমানিয়া, কন্ট্রাভিশন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, বার্লিন, জার্মানি, ডকুটিআইএফএফ, তিরানা, আলবেনিয়া, ফানচিলি চলচ্চিত্র উৎসব, আর্জেন্টিনা, ফেস্টিভ্যাল ফিল্ম রাকায়েত, ইন্দোনেশিয়া এবং অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং পিপল, পিরগোস, গ্রিস। তাসমিনা বর্তমানে উপজেলার শংকরপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে।

বাড়িতে ঘোড়া ছিল, তাই খেলার ছলে খেলা শেখা। এমন অবস্থা থেকে বেড়ে ওঠা কিশোরী তাসমিনা এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশজুড়ে। সারা দেশে ঘোড়দৌড় খেলায় এখন উজ্জ্বল মুখ ১৩ বছর বয়সী তাসমিনা। হাজারো পুরুষ খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে নিয়েছে সে। খেলার মাঠে হাজারো দর্শক মাতিয়ে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে খুব অল্পদিনেই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। তাই খেলার মাঠে দর্শকের চোখ এখন কেবল তার দিকেই। দরিদ্র পরিবারে জন্ম তাই, সওয়ারিই হয়ে উঠেছে সংসারের সম্বল।

তাসমিনার মা তহুরা বেগম বলেন, এখানেই শেষ নয়, সাহসী তাসমিনা এ পথ ধরে যেতে চায় আরও বহু দূর। তাসমিনাকে আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশী তার বাবা-মা। মেয়েকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা গ্রিসে ‘অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং পিপলস’এ স্থান পাওয়ায় খুশি তারা। এখন তাদের কাছে মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু তাসমিনার স্বপ্ন পূরণে দরিদ্র বাবার সামর্থ্য যৎসামান্য।

তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার ছিল ঘোড়ার শখ। ছোট একটা ঘোড়াও ছিল তার। দেখতে দেখতে মেয়ে একদিন ওই ঘোড়ায় চড়ে বসে। দিনে দিনে ওর ভয় ভেঙে যায়। কিন্তু অভাবের কারণে সেই ঘোড়া তাসমিনার বাবা বিক্রি করে দেন। কিন্তু এরই মধ্যে তাসমিনার নাম ছড়িয়ে গেছে গোটা দেশে। তার ঘোড়া চালানোর প্রতিভা দেখে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঘোড়া কিনে দেয়। কিন্তু বিধি বাম, কিছুদিন পর শখের ঘোড়ার একটি চোখ অন্ধ হয়ে গেলে তাকে নিয়ে আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা চলে না। কিন্তু মেয়েকে তো ঘরে আটকে রাখা সম্ভব না। যেখানেই প্রতিযোগিতা হয় সেখানেই মেয়েকে নিয়ে যায় তার বাবা। অন্যের ঘোড়ার সাওয়ারি হয়ে প্রথম হয়েছে। ঘোড়া জিতিয়ে টেলিভিশন, কম্পিউটারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছে মেয়ে। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।

তাসমিনার বাবা ওবায়দুল হক বলেন, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একমুঠো ভাত খেয়ে ঘোড়ার পিঠে ওঠে। দুপুরে এসে দুটো খেয়ে আবার ঘোড়া নিয়ে বের হয়। সারা দিন ঘোড়ার পিঠেই থাকে। তার একটা বড় ঘোড়া চাই। আমরা গরিব মানুষ। ঘরভিটে ছাড়া কিছু নেই। কৃষি কাজ করি। বড় ঘোড়ার দাম অনেক। কোথায় পাব। মেয়ে বোঝে না। এ জন্য প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাই। মেয়ে অন্য মানুষের বড় ঘোড়া চালায়। তিনি জানান, তিন বছর আগে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মেয়েকে নিয়ে প্রতিযোগিতায় যান। একটি ঘোড়া জিতিয়ে দিয়ে মেয়ে একটি টেলিভিশন পুরস্কার পেল। কিন্তু ঘোড়ার মালিক সেই পুরস্কার নিয়ে নিলেন। মেয়ের মন খারাপ হয়ে গেল। এরপর যেখানেই প্রতিযোগিতা হয় মেয়েকে ওবায়দুল ধরে রাখতে পারেন না।

তাসমিনা জানায়, তার স্বপ্ন বহু দূর এগিয়ে যাওয়ার। এ জন্য বড় হয়ে সে পুলিশের চাকরি করতে চায়। কারণ সেখানে ঘোড়সওয়ারির পদ রয়েছে। সেখানে সে ঘোড়া চালিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। বর্তমানে তার একটি বড় ঘোড়া চাই। এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে দিন পার করছে সে। তার কথা- কেউ কি তাকে একটি বড় ঘোড়া কিনে দেবে না?

নওগাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট ডিএম আবদুল বারী বলেন, বিশেষ করে তাসমিনাকে দেখতে মানুষের বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে সব প্রতিযোগিতায়। মেয়েটি যেভাবে ঘোড়া চালিয়ে প্রথম হয় এটি সত্যিই বিস্ময়কর। শুধু দেশে নয়; বিদেশেও তার নাম রয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুরুষ শাসিত সমাজে তাসমিনার মতো ছোট্ট মেয়েটি সাহসী প্রতিবাদের প্রতীক।