শিল্পকলা একাডেমীতে ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে গত ৩ নভেম্বর, শনিবার বিকাল ৪ টায় ঢাকাস্থ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে (৩-৬ নভেম্বর, ২০১৮) চারদিন ব্যাপী ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চলচ্চিত্র ও সিনেমা শিল্প বিভাগের পরিচালক বদরুল আনাম ভূইয়ার সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বিশিষ্ট সাংবাদিক ইংরেজী দৈনিক অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যফেয়ার্স ইবরাহিম শাফেয়ী রেজাভানী নেযাদ ও বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী লাকী ইনাম। সভায় স্বাগত ভাষণ দেন ঢাকাস্থ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কালচারাল কাউন্সিলর ড. সাইয়েদ মাহ্দী  হোসাইনী ফায়েক।

প্রধান অতিথির ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গণমাধ্যম উপদেষ্টা জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘চলচ্চিত্র কেবল মাত্র বিনোদনই নয়, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী মাধ্যম। ইরানি সিনেমা সেটা প্রমাণ করেছে। ইরানী সিনেমা বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে এবং অস্কার, কান, বার্লিণ ও মস্কো পুরস্কারসহ নানা আন্তর্জাতিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছে।’

বাংলাদেশের সাথে ইরানের সুসম্পর্কের বিষয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ইংরেজী দৈনিক অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের সাথে ইরানের সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো। সে সম্পর্ক কেবলমাত্র আমরা দুু’টি মুসলিম দেশ হিসেবেই নয়, ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় নৈতিকতার দিক দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে রয়েছে দুই দেশের অনেক মিল। বাংলা ভাষায় হাজার হাজার ফারসী শব্দ রয়েছে যা সরাসরি অথবা পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে প্রবেশ করেছে। ইরান একটি সভ্য ও সংস্কৃতিমনা দেশ।

তিনি বলেন ইরানের রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা। ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইরানি সরকার ও জনগণ মিলেমিশে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছে ও নবধারা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হুমকি-ধামকি, অবরোধ ও ষড়যন্ত্র  সেই উন্নয়ন ধারায় বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা করছে, কিন্তু থামিয়ে রাখতে পারছে না। আমরা কামনা করি শেষ পর্যন্ত ইরান জয়ী হবে এবং হচ্ছে। আমরা কামনা করি ইরানের সরকার ও জনগণ তাদের সুসম্পর্ক আর সমন্বিত শক্তি দিয়ে সেই সব প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করবে। ইরানি জাতি একটি সংগ্রামী জাতি। আমরা তাদেরকে সম্মান জানাই কারণ আমরাও একটি সংগ্রামী জাতি। আমরা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের  দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। মাতৃভাষার জন্য আমরা প্রাণ দিয়েছি।’

সুদীর্ঘ বক্তৃতায় ইকবাল সোবহান চৌধুরী আরো বলেন, ‘ইরান তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাদের মূল্যবোধকে তুলে ধরছে। তুলে ধরছে তাদের জাতীয় চেতনা ও ইতিহাস ঐতিহ্যকে। আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একসময় একটি ঐতিহ্য তৈরী করেছিলো। আমরাও আমাদের জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, মূল্যবোধ তুলে ধরেছিলাম। আমাদের চলচ্চিত্রেও সামাজিক নীতি-নৈতিকতা, মানবিক চেতনা তুলে ধরেছে। কিন্তু সে ঐতিহ্য যেনো অনেক দিন থেকেই ভাটা পড়েছে। ইরানের চলচ্চিত্র থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার আছে। কারণ ইরানি চলচ্চিত্র একটি ভিন্নধারা তৈরী করেছে। ধর্মীয় চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য, প্রাচীন সভ্যতা, জীবন বাস্তবতা সব কিছু নিয়েই ইরানি চলচ্চিত্র এগিয়ে চলেছে।’ প্রধান অতিথি ইকবাল সোবহান চৌধুরী তাঁর বক্তব্য শেষে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে চারদিন ব্যাপী ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

বিশেষ অতিথির ভাষণে ঢাকাস্থ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স ইবরাহিম শাফেয়ী রেজাভানী নেযাদ বিখ্যাত কিছু ইরানি সিনেমা ও এসব চলচ্চিত্রের নির্মাতা-নির্মাণকালসহ একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘চলচ্চিত্রের প্রতি বিশ্বের মানুষের আকাঙ্খা উচ্চ পর্যায়ে  পৌছেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সেই আকাংখা পূরণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই ইরানি চলচ্চিত্র অস্কারসহ নানা আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পেয়ে যাচ্ছে। আব্বাস কিয়ারোস্তমী, আজগর ফরহাদী, মাজিদ মজিদী ইরানের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সেরা নির্মাতা। এমনকি ইরানি নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাও রয়েছে। তাদের নির্মিত সিনেমাগুলোতে রয়েছে নান্দনিকতা, শিল্প-নৈপূণ্য ও মানবিক আবেদন।’

বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী লাকী ইনাম বলেন, ‘একটি ভালো সিনেমা মানুষের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কোনো  দেশের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সে দেশের মানব সমাজ, ইতিহাস ঐতিহ্য, জীবনাচরণ, চালচলন কথাবার্তা, রীতিনীতি সবকিছু অবগত হওয়া যায়। কাজেই চলচ্চিত্র একটি অন্যতম শক্তিশালী গণমাধ্যম এবং তা জাতির বিরাট সম্পদ। এমনকি বিশ্ববাসীর সম্পদ।’ তিনি নিজে ইরানি চলচ্চিত্রের একজন দর্শক একথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইরানি সিনেমাকে আমরা স্বাগত জানাই। ইরানি চলচ্চিত্রে থাকে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে আলোকিত করার চেষ্টা, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ, মাদক বিরোধী চেতনা আর ছোট-বড় মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো।’

চার দিনব্যাপী ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকা বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কালচারাল কাউন্সিলর ড. সাইয়েদ মাহদী হোসাইনী ফায়েক বলেন, ‘ইরানি চলচ্চিত্রের ইতিহাস একশত দশ বছরের। ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের চলচ্চিত্র সবসময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে উপস্থিত হয়ে সাংস্কৃতিক ও মানবিক বার্তা পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং একই সাথে বিশ্বের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার পদক সংগ্রহ করছে। বিশ্বের সবগুলো আন্তর্জাতিক উৎসব থেকে পুরষ্কার লাভের নজির একমাত্র ইরানেরই রয়েছে যা দেশটির চলচ্চিত্র শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও কলাকুশীলবদের সফলতারই দৃষ্টান্ত। চলচ্চিত্র নির্মাণে সংখ্যার দিক থেকে দেশটির অবস্থান ষষ্ঠ এবং চলচ্চিত্রের ধরণ বা স্টাইলের দিক থেকে এর অবস্থান দশম। ইরানের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গণে উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে এবং অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।’

সভাপতির ভাষণে সম্মানিত উপস্থিতিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান অনুষ্ঠানের সভাপতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চলচ্চিত্র ও সিনেমা শিল্প বিভাগের পরিচালক বদরুল আনাম ভূইয়া। তিনি জানান শুধু ঢাকাতেই নয়, তিনটি জেলার শিল্পকলা একাডেমি ভবনে ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। তিনি দর্শকদেরকে সবগুলো সিনেমা সপরিবারে দেখে নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানান।

গ্রন্থনা ও সম্পাদনা: অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, উপদেষ্টা সম্পাদক, পায়রা.নিউজ, এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, কলাম লেখক, বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের সংবাদ পাঠক, টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও আলোচক।
ইসেইল:This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.