‘বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের সংকট ও সম্ভাবনা’-একটি পর্যালোচনা

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান:পোল্ট্রি শিল্প বাংলাদেশের একটি অপার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। পোল্ট্রি ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানমুখী একটি সমৃদ্ধ শিল্প। বিশেষত আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এই পোল্ট্রি শিল্প নতুন বিপ্লবের পথ দেখিয়েছে।

দেশে এখন আন্তর্জাতিকমানের অনেক পোল্ট্রি শিল্প গড়ে উঠেছে যা কয়েক বছর আগে কেউ চিন্তাও করতে পারতো না। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে পোল্ট্রি খামার নেই। শুধুমাত্র সরকারের অপেক্ষায় বসে না থেকে এবং চাকরির প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে বাঙালি সমাজে নারী-পুরুষেরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে পোল্ট্রি শিল্পকে সমৃদ্ধ অর্থকরী শিল্পে পরিণত করেছে।

পোল্ট্রি শিল্পে যেসব মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত এর প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে বাংলাদেশের অন্যতম বিকাশমান এই পোল্ট্রি শিল্পটি। পোল্ট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে পরিচালনা, পরিচর্যা, বাজারজাতকরণ এবং খাদ্য উৎপাদন কার্যক্রমের সুবাদে আরও ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারে ব্যবসা এবং গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত পোল্ট্রি খাতটি দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে, প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে পোল্ট্রি শিল্প। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পোল্ট্রি শিল্পে ছোট ও বড় খামার রয়েছে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, প্রায় ১ লাখ প্রাণী চিকিৎসক, পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ, নিউট্রিশনিস্ট সরাসরি নিয়োজিত রয়েছেন। অনেক কর্মহীন যুবক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে ছোট ও মাঝারি গোছের পোল্ট্রি খামার। এতে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে এবং পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ রয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা।

দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণেও পোল্ট্রি খাত গুরুত্বর্পুণ অবদান রাখছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাংসের চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই এ শিল্প থেকে আসছে। বর্তমান বাজারে যে পরিমাণ ডিম, মুরগি, বাচ্চা এবং ফিডের প্রয়োজন তার শতভাগ এখন দেশীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় দুই থেকে সোয়া দুই কোটি। একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার সাপ্তাহিক উৎপাদন প্রায় এক কোটি।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ফিড মিলে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২৫ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন এবং লোকাল উৎপাদন প্রায় ১ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজারে মুরগির মাংস ও ডিম সবচেয়ে নিরাপদ খাবার। প্রাণিজ আমিষের সবচেয়ে বড় যোগানদার হলো এই সেক্টর। তবে এ আমিষের ভোক্তা পর্যায়ের চাহিদা সৃষ্টি করতে তেমন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। চাহিদা সৃষ্টির জন্য প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ ডিম ও ব্রয়লার কঞ্জাম্পশন হচ্ছে তার পরিমাণ আরো বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এজন্য প্রাইভেট সেক্টরে পোল্ট্রি প্রসেসিংকে প্রমোশন করা দরকার; আর এ কাজটি সরকারি পর্যায় থেকে করলে ভালো হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদন সম্ভব হবে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের তথ্য থেকে জানা যায়, ডিম ও মুরগির মাংস রফতানি করে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্টরা। পোল্ট্রির মাংস না থাকলে গরু/খাশির দাম কোথায় গিয়ে ঠেকতো তা সহজেই অনুমেয়। গ্রামে-গঞ্জে গেলে এখন দেখা যাবে যেসব পরিবার বছরে দুই ঈদ ছাড়া মাংসের স্বাদ পেত না, পোল্ট্রির কল্যাণে তারা সহসাই ডিম ও মাংসের স্বাদ নিতে পারছে। অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করতে পারছে। পূরণ হচ্ছে আমিষ ও পুষ্টি চাহিদা।

গ্রামীণ পর্যায়ে এই শিল্পের কল্যাণে যুব নারী ও যুবকেরা নিজেদের জীবনমানের উন্নয়ন, নিজের স্বকর্মসংস্থান এবং অপরের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও খাদ্য হিসেবে পোল্ট্রির কদর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ মানুষ এখন সাদা মাংস চায়। গরু, ছাগল থেকে আসে লাল মাংস। এতে ক্যালরি ও চর্বির মাত্রা বেশি। দামও বেশি। কিন্তু পোল্ট্রিতে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। এর দামও কম। তাই বাজারে ডিম ও ব্রয়লার মাংস এতো সস্তায় পাওয়া গেলেও ভোক্তা পর্যায়ে সরকারিভাবে গণমাধ্যমে নিয়মিত ব্যাপক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।

পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি ধীরে ধীরে বড় হলেও এর সমস্যা অনেক। গ্রামীন কৃষি অর্থনীতির বিকাশমান খাতটি সম্প্রতি নানা ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়ে এর প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে। বিভিন্ন কারণের মধ্যে একদিকে পোল্ট্রি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি অন্যদিকে মুরগি ও ডিমের মূল্য হ্রাসের ফলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে পোল্ট্রি খামারগুলো। ইতোমধ্যেই ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট ও মাঝারি ধরনের অসংখ্য খামার; যা কর্মসংস্থানে গুরুত্বর্পুণ ভূমিকা রাখতো। এতে খামারের মালিকগণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছে। বাজারে দাম বাড়েনি জীবন্ত মুরগির, অথচ দাম বেড়েছে বাচ্চার। খামার পরিচালনার খরচও অনেক বেড়েছে, কিন্তু হ্রাস পেয়েছে মুনাফা। এজন্য প্রান্তিক খামারীদের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সেসব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও বড় উদ্যোক্তাদের মাঝে একটি উইন উইন সিচুয়েশন তৈরী করা জরুরি।

কোয়ালিটি ও নিরাপদ খাবার চাইলে উৎপাদনের খরচের বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। আর্ন্তজাতিক বাজারে পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল অস্বাভাবিক অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া বিগত বছরের চেয়ে ডলারের দাম বেড়েছে ৬-৭%। ফলে ডলারের দাম বৃদ্ধি কারণে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা উৎপাদন খরচের সাথে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে। যার একটি অংশ গিয়ে পড়ছে খামারীর কাঁধে। বর্তমান সময়ে ফিড পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। পণ্য পরিবহনে পথে পথে চাঁদাবাজি হচ্ছে। ২০ টন ট্রাকে-১২ টন ফিড পরিবহনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাষ্টম ক্লিয়ারিং এর ক্ষেত্রে জটিলতা, কাঁচামাল আমদানীতে ট্যাক্স, এনওসি প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রীতা সহ নানা জটিলতায় ফিড মিলারদের  ব্যবসা পরিচালনা করা কস্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

দেশীয় পুঁজি এবং দেশীয় উদ্যোগে তিলে তিলে গড়ে ওঠা পোল্ট্রি শিল্পটি দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখছে। অথচ বর্তমানে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে দেশীয় পুঁজিতে গড়ে উঠা সীমিত আয়ের পোল্ট্রি খামারগুলো। ইতোমধ্যেই অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিদেশি পুঁজির। ফলে বর্তমান সময়ে পোল্ট্রি শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি অসম প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। বাজারে বড় বড় উৎপাদনকারীদের সাথে সবসময় অসম প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করার ফলে প্রায়শই পোল্ট্রি বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে। এ সেক্টরে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের অপ্রতুলতাও রয়েছে। তাছাড়া নানা ধরনের কর এবং ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্র বৈষম্যের কারণে যারা বৃহৎ আকারে পোল্ট্রি খাদ্যের কারখানা ও বড় খামার করেছেন, তারাও এর বিকাশ ঘটাতে পারছেন না। তাই দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম বৃহত্তম খাত এবং প্রাণিজ আমিষের বৃহৎ যোগানদাতা হিসেবে  পোল্ট্রি শিল্পের ওপর আরোপিত ভ্যাট ট্যাক্স মওকুফ করার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি।

সম্প্রতি  রাজধানীতে ‘পোল্ট্রি শিল্প: সংকট ও সম্ভাবনা’-শীষর্ক এক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল। ডিবিসি নিউজ এর উদ্যোগে গত ১৪ মে, ২০১৮ সোমবার বিকেলে গুলশানের স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে সময়োপোযোগী সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এম.পি। আহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ডিবিসি নিউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল আহসানের সভাপতিত্বে আলোচনা টেবিলে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ও ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী। ডিবিসি নিউজের সম্পাদক প্রণব সাহার সঞ্চালনায় আলোচনা টেবিলে ‘বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের সংকট ও সম্ভাবনা’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন রশিদ কৃষি খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) হারুনুর রশিদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রিয় মোহন দাস, ইয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোমিন উদ দৌলা, নারিশ পোল্ট্রির পরিচালক শামসুল আরেফিন খালেদ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামছুল আলম, আহকাব সভাপতি একেএম আলমগীর, পোলট্রি কনসালটেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস-এর সিইও জনাব রফিকুল হক, ফিআব সাধারণ সম্পাদক মো. আহসানুজ্জামান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (সম্প্রারণ) ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক প্রমুখ।

দেশের পরিণত এ কৃষি শিল্পটি বর্তমান সময়ে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পে এ ধরনের সংকট দেশের অর্থনীতি তথা কর্মসংস্থানের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তাই ডিবিসি নিউজ এর সময়োপযোগী টেবিল আলোচনায় উঠে আসা পোল্ট্রি শিল্পে বিরাজমান সমস্যাগুলো অতি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। কাজেই এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা কেবল টেবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পোল্ট্রি শিল্পে সংকট সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের মাঝে জোরালোভাবে উপস্থাপিত হতে হবে।

দীর্ঘদিন যাবৎ পোল্ট্রি শিল্পের আয় করমুক্ত ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ শিল্পের কর অব্যহতি সুবিধা তুলে নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। চলতি অর্থ বছরেও তা অব্যাহত আছে। বর্তমান সময়ে এ সেক্টরে যে পরিমান ট্যাক্স আরোপিত হয়েছে এতে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে রোগ ও প্রাকৃতিক বৈপরীত্বের কারণে অনেক খামারেই লোকসান হয়। ফলে ছোট ও মাঝারি খামারগুলো উৎপাদনে টিকে থাকতে পারে না। এমতাবস্থায় পোল্ট্রি খামারগুলো কর অব্যাহতির কাল বৃদ্ধি করে এদের উৎপাদনে ও নতুন খামার স্থাপনে উৎসাহিত করা উচিত। এজন্য বানিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলো বিশেষ করে ভ্যাট, ট্যাক্সসহ আলোচিত সমস্যাবলি আন্ত:মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে অতি দ্রুত সমাধান করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময় খামারে যেমন বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধি মোকাবেলা করতে হচ্ছে আবার পোলট্রি ফিড, ডিম ও মাংসের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা। এন্টিবায়োটিক ফ্রি ফিড উৎপাদন করতে কেজি প্রতি ১.০০-১.৫০ টাকা অধিক ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার অন্যদিকে কাঁচামালের ট্যাক্স বৃদ্ধি, পরিবহন খাতে প্রতিকূলতা সব মিলিয়ে খামারীরা একরকম দিশেহারা। তাই সহনীয় মূল্যে খামারী ভাইদের মেডিসিন, ভ্যাক্সিন, এডিটিভস্, প্রিমিক্স সহ নানা পণ্য সরবরাহ করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রান্তিক খামারীদেরকে প্রমোশন করা প্রয়োজন এবং এটি করতে হলে প্রথমেই উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফুড সেফটির কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তবে আমদানী করতে যেয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে কাস্টমস্, বন্দরসহ নানা জায়গায় যে ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হয় তাতে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটে। অবাক করা ব্যাপার হলো উৎপাদিত পণ্যের আবার নেই বাজারমূল্য যেটি চলছে লম্বা সময় ধরে। এ ব্যাপারগুলো আরো বেশিবেশি করে নিয়মিতভাবে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। পোল্ট্রি সেক্টরে সম্ভাবনাও রয়েছে ব্যাপক। ইতোমধ্যেই পোল্ট্রি শিল্পের দুরাবস্থার প্রতিকার চেয়ে রাস্তায় নেমেছে অনেক খামারি। বাচ্চা ও খাদ্যের দাম কমানো, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খামারগুলোর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং বিদেশি পুঁজির আগ্রাসন থেকে দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে রক্ষা করতে আন্দোলনে নেমেছেন খামারিরা। মহাসড়কের রাস্তÍার উপর হাজার হাজার ডিম ঢেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা। বিভিন্ন সময়ে খামারিরা মানববন্ধন করছেন, বিক্ষোভ করছেন ও স্মারকলিপি দিচ্ছেন। এগুলো আমলে নিয়ে ধৈর্য ও সহানুভূতির সংগে পোল্ট্রি শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সংকট সবসময় থাকবে তবে এ শিল্পে সম্ভাবনাও রয়েছে ব্যাপক। তাই পোল্ট্রি উৎপাদনের জন্য একটি বিশেষ সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।

মানুষের আয় বৃদ্ধি ও জীবনমানের উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আগামীতে পোল্ট্রির চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পাবে। সেই চাহিদা মেটানোর জন্য পোল্ট্রি উৎপাদনে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা দরকার। এর জন্য দরকার পোল্ট্রি শিল্পের সমস্যাগুলোর আশু সমাধান। দরকার পোল্ট্রি শিল্পের দ্রুত বিকাশ। সে লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকা দরকার। তবে পোল্ট্রি শিল্পের মালিক ও শ্রমিকদের উচিত হবে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন পরিচালনা করা। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, বাজার সম্প্রসারিত হবে, মুনাফা বৃদ্ধি পাবে। নতুবা দেশের গরিব ভোক্তাদের ও ছোট খামারিদের অদক্ষতার মাশুল গুনতে হবে। বর্তমানে পোল্ট্রি একটি শক্তিশালী অবস্থানে এসে দাড়িয়েছে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এটির অবদান আর স্বীকার না করে উপায় নেই। দেশের গ্রামীন অর্থনীতির চাকাকে বেশী করে সচল রাখতে হলে দেশে এ সেক্টরের বিকল্প নেই।

গ্রন্থনা: ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। উপদেষ্টা সম্পাদক, এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (সা.)। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ, বাংলাদেশ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ।
This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.