ইলিশ উৎপাদনের রোল মডেল বাংলাদেশ

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি:বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। বাঙালির সবচেয়ে পছন্দের মাছও ইলিশ। ইলিশের সবচেয়ে বড় আধার বাংলাদেশ। মাছটি সমান জনপ্রিয় ভারত মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই। বৈশ্বিক ইলিশ আহরণের ৭০ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জাতীয় এ মাছ নিয়ে সম্ভাবনার কথা বলেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যাললয়ের( বাকৃবি) প্রতিনিধি আবুল বাশার মিরাজ

ইলিশ নিয়ে সম্ভাবনা কতটুকু?  
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: ইলিশ খুবই সুস্বাদু একটি মাছ। সববয়সী মানুষের কাছে মাছটি সমান জনপ্রিয়। ইলিশ মাছে বাংলাদেশে বিপ্লব হয়েছে। ইলিশ মাছ নিয়ে আমাদের গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। এ মাছটি নিয়ে আমরা অনেক বেশিই সম্ভাবনা দেখছি।

দেশের মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদানকতটুকু ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। এর বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। বিগত ৮ বছরে বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ যা বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম সাফল্য। জিডিপিতেও ইলিশের অবদান প্রায় ১%।

কর্মসংস্থানে ইলিশ মাছের ভূমিকা কেমন ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: কর্মসংস্থানে ইলিশের ভূমিকা রয়েছে ব্যাপক। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও এ বছর ইলিশ পাওয়া গেছে। ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে দেশের ১২৫ উপজেলার জেলেরা মাছটি আহরণ করে।  এরমধ্যে গড়ে ৩২% সার্বক্ষণিক ও বাকি ৬৮% খন্ডকালীন জড়িত। এছাড়া বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও জাল- নৌকা তৈরিতে সার্বিকভাবে ৩০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে জড়িত।

দেশে ইলিশ উৎপাদনের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। বর্তমানে   প্রতিবছরই বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশই প্রথম ।

ইলিশ মাছের সাফল্য নিয়ে বলবেন কি ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: ইলিশ মাছে সাফল্য বাংলাদেশের অর্জন। আমরা এ মাছের সমস্যা-সম্ভাবনা চিহ্নিত করেছি। এ ছাড়া মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ধারা টিকিয়ে রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।

ইলিশ আহরণের বিষয়ে বলবেন কি ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: ইলিশের মোট আয়ুস্কাল ৫-৭ বছর। আহরিত ইলিশের শতকরা  ৯০ ভাগ ৩০-৫০ সেন্টিমিটার আকারের হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মোট ৩ প্রজাতির ইলিশ পাওয়া যায়; এর মধ্যে ২টি (চন্দনা ও গোর্তা ইলিশ) সারাজীবন উপকূল ও সাগরে কাটায় এবং অপর ১টি মিঠাপানি ও লোনাপানিতে জীবন অতিবাহিত করে। ইলিশ ¯্রােতের বিপরীতে দৈনিক ৭০ কিলোমিটার অভিপ্রয়ান করতে পারে। পৃথিবীর মোট ১১টি দেশে বর্তমানে ইলিশ পাওয়া যায়। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৭০% বাংলাদেশ আহরণ করে; দ্বিতীয়  অবস্থানে আছে মিয়ানমার (২০-২৫%) এবং ৩য় অবস্থানে ভারত (১০-১৫%)।

বর্তমান সরকারের কোন গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বলবেন কি?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: বর্তমান সরকার ২০১৯ সালের মধ্যে দেশকে মাছ চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বর্তমান ৩৮ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৪২ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য অধিদফতর যৌথভাবে কাজ করছে। এক্ষেত্রে ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়ার লক্ষ্যে কাজ কওে যাচ্ছি।

পুকুরে ইলিশ চাষের বিষয়ে কিছু বলবেন ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: সাগরের ইলিশ মাছ পুকুরে চাষের জল্পনা কল্পনা অনেক দিন থেকেই। সেই কল্পনা এখন বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশী মৎস্য বিজ্ঞানীরা। পটুয়াখালীর কলাপাড়া এলাকার খেপুপাড়ায় নদী উপকেন্দ্রের বদ্ধ পানিতে ইলিশ চাষের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। গবেষণার জন্য সাগরের মোহনা থেকে জাটকা ইলিশ পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়া হয়। গবেষণায় সফলতা পাওয়া গেলে জাতীয় মাছ ইলিশ সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আসবে। এখন আমরা চাষে বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাইয়ের সমস্যা চিহ্নিত ও তার সমাধান এবং পরিবেশের উপর খাপ খাওয়ানোর কাজ চলছে। এটা একটি দীর্ঘ মেয়াদী কার্যক্রম হলেও আমরা সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

জাটকা ও মা ইলিশ নিয়ে কিছু বলবেন কি ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: চলতি বছরে ইলিশ উৎপাদনের এই সফলতা জেলে সম্প্রদায়ের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। জেলেরা অনেকেই এখন বুঝতে পেরেছে যে, মা ইলিশ ও জাটকা সঠিকভাবে সুরক্ষা করতে পারলে বর্ধিত হারে ইলিশ উৎপাদনের সুফল তারা নিজেরাই ভোগ করতে পারবে। এজন্য জেলেরাও অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হয়ে মা ইলিশ রক্ষা করছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক।

ইলিশ রপ্তানি নিয়ে সম্ভাবনা দেখছেন কতটুকু ?
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: ইলিশ রপ্তানী নিয়ে আমরা যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখছি।  এ বিষয়টি নিয়ে আমরা নীতি নির্ধারকদের সাথে কথাও বলেছি। সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে বলে আশা করছি।