খাটো জাতের ভিয়েতনামি নারিকেল-তিন বছরেই ফল

এস এম মুকুল:ভিয়েতনাম থেকে সরকারিভাবে আমদানিকৃত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোপন করা খাটো জাতের নারিকেল গাছে তিন বছরেই ফল ধরেছে। এ নিয়ে নারকেল চাষিদের মাঝে নতুন আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি সাভারের রাজালাখ হর্টিকালচার সেন্টারে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় ৩ বছর পাঁচ মাস বয়সি একটা নারিকেল গাছে শতাধিক নারিকেল ধরেছে।

এ বিষয়ে সাভার হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ কৃষিবিদ শেখ ইফফাত আরা ইসলাম বলেন-২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে পরীক্ষামূলক এখানে একটি খাটো জাতের নারিকেল গাছের চারা রোপন করা হয় এবং রোপনের ২৮ মাসের মাথায় নারিকেল গাছে ফুল আসা শুরু হয়। এখন এই গাছে প্রায় শতাধিক ডাব ধরেছে এবং নতুন নতুন অসংখ্য ফুল বের হচ্ছে। নারিকেল দেশের অন্যতম অর্থকরি ফসল। নারিকেল গাছের পাতা, ফুল, ফল, শিকড় সব কিছুই বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বর্তমান সরকার সারাদেশে বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের উপকুলীয় জেলাগুলোর পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করছে। এইসব এলাকায় নারিকেল চাষের জন্য অতি অনুকুল অবস্থা বিরাজ করছে। এই বিবেচনায় ভিয়েতনাম থেকে খাটো ও উন্নতজাতের ওপেন পলিনেটেড নারিকেলের চারা আমদানি করে ব্যাপক আকারে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হতে পারেন অধিক লাভবান
অনুসন্ধানে জানাগেছে, খাটো জাতের হাইব্রিড নারিকেল গাছের চাষে গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এই নারিকেল গাছ সনাতনী গাছের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ফল দিবে। চারা  রোপণের দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যেই ফল পাওয়া যাবে। নতুন উদ্ভাবিত এ নারিকেল গাছ বছরে ১৫০ থেকে ২৫০টি ফল দিয়ে থাকে। যা দেশি নারিকেল গাছের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি। গাছের উচ্চতা ২ থেকে ৪ ফুট হলেই ফল ধরা শুরু করে।  বাংলাদেশে দুটি খাটো জাতের নারিকেল গাছের চাষ হয়। একটি হলো ডিজে সম্পূর্ণ হাইব্রিড ডোয়াফ নারিকেল এবং অন্যটি হলো ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা ‘উন্নত ও খাটো‘ ওপেন পলিনেটেড (ওপি) জাত। ভিয়েতনাম থেকে সংগ্রহ করা এ জাতটি আবার দু-ধরনের, সিয়াম গ্রীণ কোকোনাট এবং সিয়াম ব্লু কোকোনাট। দুটি জাতই বছরে প্রায় ১৫০টি নারিকেল দেয়। এই জাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নারিকেল থেকেই এর চারা হবে। দুই থেকে আড়াই বছরে গাছে ফুল আসবে। প্রতিটি ডাব  থেকে ৩০০ এমএল পানি পাওয়া যাবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার নারিকেল ও ডাবের চাহিদা পুরণে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা খাটো জাতের নারিকেলগাছ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় লাগানোর উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের পরিচালক ড.মেহেদী মাসুদ বলেন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নির্দেশনায় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ভিয়েতনাম থেকে সরাসরি এই খাটো জাতের নারিকেলের চারা আমদানী করা শুরু হয় এবং ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় সোয়া সাত লাখ চারা বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি জানান এই নারিকেল গাছে অনেক নারিকেল ধরে অল্প সময়ে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোপন করা অনেক গাছেই ফুল আসা শুরু হয়েছে এবং এই নারিকেল গাছ দিন দিন বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বছরব্যাপি ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে এই নারিকেল গাছের অসংখ্য বাগান সৃজন করা হয়েছে এছাড়া সরকারী হর্টিকালচার সেন্টার ও উপজেলা কৃষি অফিসের থেকে প্রতিটি চারা পাঁচ’শ টাকা দরে ক্রয় করে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই এই নারিকেল গাছের বাগান করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং এর পরিচালক কৃষিবিদ মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে অতিমাত্রায় ডাব বিক্রি হওয়ায় নারিকেলগাছের ফল বা (বীজ) প্রাপ্তির সংখ্যা দিন-দিন কমে আসছে। এ পরিস্থিতিতে ভিয়েতনাম থেকে খাটো জাতের ওপেন পলিনেটেড নারিকেলের চারা আমদানি করা হয়েছে। এ জাতের ডাব খুবই সুস্বাদু। এ ছাড়া ফলনও লম্বা জাতের গাছের চেয়ে অনেক বেশি। এ গাছে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি ফল ধরে। গাছ রোপণের দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে ফুল ফোটা শুরু হয়। সব ধরনের মাটিতেই এ গাছ লাগানো সম্ভব। তাছাড়া এ জাতের গাছ লবণাক্ততা অনেক বেশি সহ্য করতে পারে। গাছ খাটো হওয়ায় পরিচর্যাও সহজ।

খাটো জাতের নারিকেল চাষে করণীয়
আমাদের দেশে বর্তমানে যে প্রচলিত নারিকেলগুলো রয়েছে তা থেকে ফলন পেতে স্বাভাবিকভাবে ৭ থেকে ৮ বছর সময় লাগে। নিকাশযুক্ত দো-আঁশ থেকে বেলে দো-আঁশ মাটিতে ডিজে সম্পূর্ণ ডোয়ার্ফ হাইব্রিড নারিকেল রোপণের সময়  জুন-সেপ্টেম্বর।

রোপণের দূরত্ব: ৬ বাই ৬ মিটার হিসেবে হেক্টরপ্রতি ২৭৮টি চারা প্রয়োজন। আদর্শ পিটের মাপ হবে ৩ ফুট বাই ৩ ফুট বাই ৩ ফুট। গর্ত তৈরির পর প্রতি গর্তে ১৫ থেকে ২০ কেজি পচা গোবর অথবা আবর্জনা পচা সার দিতে হবে। মাটিতে অবস্থানরত পোকার আক্রমণ থেকে চারা রক্ষার জন্য প্রতি গর্তে ৫০ গ্রাম বাসুডিন প্রয়োগ করতে হবে। সব কিছু মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে। ভরাটের পর পানি দিয়ে গর্তটাকে ভিজিয়ে দিতে হবে যাতে সব সার ও অন্যান্য উপাদান মাটির সঙ্গে মিশে যায় যা চারা গাছের শিকড়ের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। নারিকেল গাছের মাঝখানে বারি মাল্টা-১ বা লেবু, ডালিম, আমড়া, সফেদা জাতীয় গাছ লাগিয়ে নারিকেল চাষকে আরো অর্থবহ করে তোলা যায়। সূত্র জানায়, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় খাটো জাতের নারিকেল গাছ লাগানো শুরু হয়েছে। এছাড়া বান্দরবান, রাঙ্গামাটি জেলার পাহাড়ি এলাকায়ও এ জাতের গাছ লাগানো হয়েছে। সারা দেশে হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে এ চারা কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হয়। রাজধানীতে আসাদগেট হর্টিকালচার সেন্টার থেকেও এ জাতের গাছ সংগ্রহ করছেন রাজধানীবাসী।

জানাগেছে, ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে যারা খাটো জাতের এই নারিকেলের চারা রোপন করে নিয়মিত সঠিকভাবে পরিচর্যা করেছেন তাদের প্রায় সকলের গাছেই নারিকেলের ফুল আসা শুরু হয়েছে। মাওনা গাজিপুর এর কর্নেল গোলাম মওলা, চন্দ্রার মোঃ আতিকুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার মোঃ আকবর আলী, হারিছ উদ্দিন, হর্টিকালচার সেন্টার রহমতপুর, বরিশাল, হর্টিকালচার সেন্টার রামু কক্সবাজার, কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টার, মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টার ও বারাদি, মেহেরপুর সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আড়াই বছরের গাছেই ফুল আসা শুরু হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা তালহা জুবাইর মাসররুর এর কাছে খাটো জাতের এই নারিকেল চাষ বিষয়ে কৃষকদেরকে মাঠ পর্যায়ে কি ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন-খাটো জাতের নারিকেল গাছ থেকে ৩ বছরেই ফল পেতে হলে গাছ লাগানো থেকে শুরু করে সারা বছর নিয়ম মেনে পরিচর্যা করতে হয়। রোদ্দজ্জল ছায়া পড়েনা এবং সেচের ভাল ব্যবস্থা আছে এমন জায়গা নির্বাচন করে মাত্রানুযায়ী জৈব ও রাসায়নিক সার দিয়ে মাদা তৈরি করে গাছ লাগাতে হবে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এই নারিকেল গাছের চারা রোপনকারীদের সবধরণের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

লেখক- কৃষি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক, This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.