মো: দেলোয়ার হোসেন, টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট,কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী:টমেটো বিশ্বের অন্যতম শীতকালিন সবজি। আকর্ষনীয়তা, স্বাদ, অধিক পুষ্টিমান, বহুবিধ উপায়ে ব্যবহার উপযোগীতার কারনে সর্বত্রই এটি জনপ্রিয়। প্রক্রিয়াজাত উপযোগী সবজির মধ্যে টমেটোর স্থান সর্বোচ্চ। টমেটো সবজি হলেও এতে ফলের সমুদয় গুনাগুন বিদ্যমান এবং ফলের ন্যায় রান্না ছাড়াও খাওয়া যায়। অধিক পরিমানে টমেটো খাওয়ার মধ্য দিয়ে মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পুরুন করা সম্ভব। টমেটোতে প্রচুর পরিমানে আমিষ, শর্করা, ক্যালসিয়ামসহ ভিটামিন “এ” ও “সি” বিদ্যমান। এছাড়া টমেটোতে হৃদরোগ ও ক্যান্সার নিরাময়ক পটাসিয়াম ও লাইকোপেন পাওয়া যায়।
উৎপাদন মৌসুম :
টমেটো দীর্ঘ মেয়াদী ফসল। বীজ বপন হতে ফল পাকা পর্যন্ত প্রায় ১০০ দিন সময় লাগে। রবি মৌসুমে টমেটো চাষের জন্য সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ হতে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তারের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে এবং নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মুল জমিতে চারা রোপন করতে হবে। তাহলে ভাল ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে জুলাই-আগষ্ট মাসে বীজ বপন করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মূল জমিতে চারা রোপন করা হলে বেশ ঝুকির সম্ভাবনা থেকে যায়।
জাত :
বাংলাদেশে টমেটোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে চাষের মৌসুমও স¤প্রসারিত হয়েছে আবার টমেটোর জাতের বৈচিত্র এসেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইন্সষ্টিটিউট কতৃক উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো: মানিক, রতন, বারি টমেটো-৩, বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৫, চৈতী, অপুর্ব, শিলা, লালিমা, অনুপমা, ঝুমকা, বারি টমেটো-১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯ এবং বারি হাইব্রিড টমেটো-৪(গ্রীষ্মকালিন), ৫, ৮, ৯, ১০ এসব। আবার বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষনা ইন্সষ্টিটিউট কতৃক উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো : বাহার, বিনা টমেটো ২ ও ৩ এসব।
বীজতলা তৈরী ও চারা উৎপাদন :
টমেটোর বীজতলা তৈরীর জন্য ছায়ামুক্ত সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটি উত্তম। মাটি ভালভাবে চাষ-মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে আর্বজনা পঁচা বা গোবর সার এবং পরিমানমত রাসায়নিক সার মাটির সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। বীজ বপনের পুর্বে ৩ মিটার দৈঘ্য ও ১ মিটার প্রস্থ আকারের বেড তৈরী করতে হবে এবং ২ বেডের মাঝে ২৫-৩০ সে:মি: নালা রাখতে হবে। বীজতলায় বীজ বপনের পর মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। প্রতি বিঘা জমির জন্য ৩৫-৪০ গ্রাম বীজ বপন করতে হবে। বীজতলায় চারা গজালে রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে চারা রক্ষার জন্য চালার ব্যবস্থা করতে হবে। রোদ-বৃষ্টি সহিষ্ণু হওয়া পর্যন্ত চালার ব্যবস্থা রাখতে হতে। বীজতলায় চারার বয়স ৪-৫ সপ্তাহ হলে মূল জমিতে রোপন করতে হবে। চারা ছোট ও অল্প বয়সের হলে ভাল ফলন পাওযা যায়।
জমি তৈরী ও চারা রোপন :
টমেটো চাষের জন্য জমি ভালভাবে চাষ-মই দিয়ে ঝুরঝুরে করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিমান জৈব সার ও রাসায়নিক সার চারা রোপনের পুর্বে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। টমেটোর চারা রোপনের সময় সারি থেকে সারির দুরত্ব ৮০-৯০ সে:মি: এবং চারা থেকে চারার দুরত্ব হবে ৫০-৬০ সে:মি:। চারা রোপনের পর ৫-৭ দিন ঝাঝরি দিয়ে চারার গোড়ায় হালকা সেচ দিতে হবে।
সার প্রয়োগ :
জমি তৈরীর সময় জৈব সার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। টমেটো চাষে পর্যাপ্ত পরিমানে জৈবসার হিসাবে সবুজ সার, আর্বজনা পঁচা সার বা গোবর সার ব্যবহার করতে হবে কারণ জৈব সার হলো মাটির প্রাণ। প্রতি বিঘা জমির জন্য আবর্জনা পঁচা বা গোবর সার ১-১.৫ টন, টিএসপি ৪০-৪৫ কেজি, এমওপি ২৫-৩০ কেজি, জীপসাম ২০-২৫ কেজি, ইউরিয়া ১৫-২০ কেজি, বোরণ সার ১ কেজি হারে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরীর সময় প্রথম চাষে অর্ধেক পরিমান জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকী অর্ধেক জৈব সার ও রাসায়নিক সার মাটির শেষ চাষের সময় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। মাটি ভালভাবে সমতল করে চারা রোপন করতে হবে। চারা রোপনের পর প্রথম কিস্তি ১৫-২০ দিন, দ্বিতীয় কিস্তি ৩৫-৪০ দিন এবং তৃতীয় কিস্তি ৫০-৬০ দিন পর পর প্রতি বিঘা জমির জন্য ইউরিয়া ৯-১০ কেজি এবং এমওপি ৫-৬ কেজি হারে মিশিয়ে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। রাসায়নিক সার গাছের গোড়া থেকে ১০-১৫ সে:মি: দুরত্বে প্রয়োগ করতে হবে এবং মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের পর অবশ্যই পানি সেচ দিতে হবে।
যত্ন-পরিচর্যা :
টমেটো গাছের কান্ড দুর্বল তাই খাড়া থাকতে পারে না, ফলে সহজেই ভেঙ্গে যায়। মাটির সংম্পর্শে থাকলে সহজেই রোগাক্রান্ত হয় সেজন্য ভাল ও নিখুত ফল পেতে টমেটো গাছের নিচে খড় কিংবা শুকনো কচুরী পানা দিয়ে বিছানা তৈরী করে দিতে হবে। আবার কিছু কিছু জাত রয়েছে যেগুলো লম্বা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে “A” আকৃতির বাশেঁর ফ্রেম তৈরী করে খুটি দিতে হবে এবং টমেটোর গাছ ছাটাই করে দিতে হবে। কারণ টমেটো গাছের কান্ডে অনেক ডাল-পালা বের হয় ফলে গাছ ঝোপালো হয় এবং গাছের আশ-পাশে স্যাঁত স্যাঁতে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ফলে রোগবালাইয়ের আক্রমন বেশী হয় এবং গাছে অতিরিক্ত ফল ধরে ও আকারে ছোট হয়। ফলে ফলন কম পাওয়া। তাই টমেটো গাছের অতিরিক্ত ডাল-পালা কেটে ছাঁটাই করে দিতে হবে।
আগাছা দমন:
আগাছা ফসলের প্রধান শত্রু। আগাছা ফসলের খাদ্যে ভাগ বসায় এবং গাছকে দুর্বল করে ফেলে। তাই নিড়ানী দিয়ে আগাছা পরিস্কার করে দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে নিড়ানীর আঘাতে গাছের শিকড় কেটে না যায়। আবার মাঝে মাঝে নিড়ানী দিয়ে ক্ষেতের মাটি আলগা করে দিতে হবে, এতে আলো বাতাস চলাচল বৃদ্ধি পাবে। টমেটো গাছে আগাছা দমন ও মালচিং এর কাজগুলো একসংগে করা সম্ভব। এতে গাছের শিকড় বৃদ্ধি পাবে, শিকড় মজবুদ হবে এবং ফলনও বেশী পাওয়া যাবে।
পানি সেচ ও নিকাশ :
টমেটো ক্ষেতে সেচ ও নিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারা লাগানোর পর কয়েক দিন ধরে হালকা সেচ দিতে হবে। প্রয়োজনে ঝাঝরি ব্যবহার করতে পারেন। কারন ক্ষেতে রসের অভাব হলে চারা দুর্বল হয়ে যায় এবং আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ে, ফলে গাছ মারা যায়। টমেটো দাঁড়ানো পানি সহ্য করতে পারে না তাই বৃষ্টির পানি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দাড়াতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পুরাতন নালা সংস্কার করতে হবে প্রয়োজনে নতুন নালা তৈরী করে দিতে হবে। নিড়ানি দিয়ে বা মালচিং করেও টমেটো ক্ষেতের রস সংরক্ষন করা যেতে পারে।
রোগবালাই দমন :
টমেটো ক্ষেতে রোগবালাইয়ের কারণে ৩০-৭০ ভাগ ফলন কমে যায়। তাই টমেটো ক্ষেতের রোগবালাই দমন অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। টমেটো ক্ষেতে সাধারণত: ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস জনিত কারনে রোগ হয়ে থাকে। ছত্রাক জনিত রোগের মধ্যে-নাবী ধ্বসা ও আগাম ধ্বসা রোগই প্রধান।
নাবী ধ্বসা : নাবী ধ্বসা রোগের লক্ষন হলো পাতার নিচে সাদা পাউডারের মত রোগ জীবানু দেখা যায়। দিনের তাপমাত্রা কমে গেলে, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে, মেঘলা আকাশ ও ঘন কুয়াশায় এ রোগের আক্রমন বেশী হয়ে থাকে। এতে কচি ডগাগুলো মরে যায় এবং আক্রান্ত গাছ পঁচে যায়। আক্রমনের মাত্রা বেশী হলে সম্পূর্ণ পাতা ঝলসে যায় এবং গাছ মারা যায়। এই রোগের প্রতিকার হিসাবে আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ধ্বংশ করতে হবে এবং রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। আক্রমনের মাত্রা বেশী হলে ব্যাভিষ্টিন বা ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।
আগাম ধ্বসা : আগাম ধ্বসা রোগের আক্রমনের লক্ষন প্রথমে গাছের বয়স্ক পাতায় দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে গোল গোল দাগ দেখা যায় এবং পড়ে কচি পাতাগুলো আক্রান্ত হয়। এই রোগের প্রতিকার হিসাবে রোগমুক্ত ও সহনশীল জাতের টমেটো বীজ ব্যবহার করতে হবে। আক্রমনের মাত্রা বেশী হলে ব্যাভিষ্টিন বা রোভরাল গ্রুপের ছত্রাকনাশক পানির সাথে মিশিয়ে এক সপ্তাহ পর পর অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।
ব্যাকটেরিয়া : ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের মধ্যে ঢলে পড়া খুবই মারাত্বক রোগ। এই রোগে গাছের কচি ও নরম পাতাসহ শাখা-প্রশাখা প্রখর রোদে ঢলে পড়ে এবং রাতে সবুজ অবস্থায় মারা যায়। এই রোগে আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ধবংস করতে হবে।
ভাইরাস: ভাইরাস জনিত রোগের মধ্যে মোজাইক ভাইরাস খুবই মারাত্বক রোগ। এরোগে পাতার কিনারাসহ সমস্ত পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং আক্রমনের মাত্রা বেশী হলে সমস্ত গাছই মরে নষ্ট হয়ে যায়। এই রোগের লক্ষন দেখা মাত্র গাছ তুলে ধবংস করে ফেলতে হবে।
পোকামাকড় :
টমেটো ক্ষেতে বিভিন্ন পোকামাকড় ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। এর মধ্যে জাব পোকা, ফল ছিদ্রকারি পোকা ও সাদামাছি উল্লেখযোগ্য। এসকল পোকা দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী।
জাব পোকা : টমেটো ক্ষেতে জাব পোকা মারাত্বক ক্ষতি করে থাকে। জাবপোকার বাচ্চা ও পূর্ণাঙ্গ পোকা গাছের কচি ও নরম অংশ থেকে রস চুষে খায় ফলে টমেটো গাছ শুকিয়ে অবশেষে মারা যায়। এই পোকা দমনে ম্যালাথিয়ন বা সাইপারম্রেথিন গ্রুপের কীটনাশক অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করে দমন করা যায়। এছাড়া সাবান গোলা পানি স্প্রে করেও দমন করা যায়।
ফল ছিদ্রকারি পোকা : টমেটোর ফল ছিদ্রকারি পোকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোকা। এ পোকার কীড়া প্রথমে পাতা ও ফুল খায় এবং পরে ফল ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে শাঁস খাওয়া শুরু করে। এতে ফলের শাঁস নষ্ট হয় এবং ফলে পঁচন ধরে। এই পোকা দমনে ডেসিস বা সাইপারমেথ্রিন গ্রæপের কীটনাশক অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করে ভাল ফল পাওয়া সম্ভব।
সাদা মাছি পোকা : টমেটোর আর একটি মারাত্বক ক্ষতিকর পোকা সাদা মাছি। এ পোকা খুব ছোট এবং পাতার নিচের দিকে থাকে বলে খালি চোখে দেখা যায় না। এই পোকা টমেটোর পাতা মোড়ানো ভাইরাস রোগের বাহক হিসাবে কাজ করে। এই পোকা দমনে রগর বা রক্সিয়ন গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করে ভাল ফল পাওয়া সম্ভব।
ফসল সংগ্রহ :
টমেটো পরিপক্ক হলে সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহ করে বাতাস চলাচল করতে পারে এমন স্থানে সংরক্ষন করতে হবে এবং পাকা শুরু হলে বাজারজাত করতে হবে। টমেটো জাতভেদে বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত ফলন হয়ে থাকে।