“বিষাক্ত খাদ্য, ঝুঁকিতে জীবন”

সমীরণ বিশ্বাস:বিষাক্ত খাদ্য, ঝুঁকিতে জীবন। ভেজাল ও রাসায়নিক দূষণে জনস্বাস্থ্য আজ হুমকির মুখে। খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। এই খাবারই যখন পরিণত হয় বিষে, তখন শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, একটি জাতির ভবিষ্যতই চরম সংকটে পড়ে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল, সাম্প্রতিক গবেষণা, টেস্ট রিপোর্ট ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য সেটিকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রতিদিনের চাল, ডাল, সবজি, ফল, দুধ, মাংস, যে খাদ্য আমরা প্রতিনিয়ত খাই, তার উল্লেখযোগ্য অংশেই রয়েছে ক্ষতিকর টক্সিন, ভারী ধাতু এবং নিষিদ্ধ রাসায়নিক উপাদান। বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদানটি তাই এখন হয়ে উঠেছে নীরব ঘাতক।

ভেজাল খাদ্যের ভয়াবহতা: পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্র: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুসারে দেশের বাজারে পাওয়া ৮২টি খাদ্যপণ্যের গড়ে ৪০ শতাংশে ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় মানের চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি DDT, টক্সিন এবং কীটনাশক শনাক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাজারের ৩৫% ফলে, ৫০% শাকসবজিতে, ১৩টি চালের নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক, ৫টিতে ক্রোমিয়াম, হলুদের ৩০টি নমুনায় সীসা ও ভারী ধাতু, লবণে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ২০–৫০ গুণ বেশি সীসা, মাছ ও মুরগিতে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। এই তথ্যগুলো শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং এটিই এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকেত। CAB ও BSTI–এর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাজারের ৮৫% ফল পাকানো হয় কার্বাইড, ইথোফেন ও ফরমালিন দিয়ে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট বলছে, মানহীন খাদ্যের সংখ্যা এক বছরে ৮১ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৯—যা ভেজালের দ্রুত বিস্তারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

রাসায়নিক দূষণ ও বিপজ্জনকতা: খাদ্যে ব্যবহৃত অধিকাংশ রাসায়নিক, যেমন ফরমালিন, কার্বাইড, ইথোফেন, টেক্সটাইল ডাই, গ্রোথ হরমোন বা নিষিদ্ধ কীটনাশক, মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালিন: মূলত মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত রাসায়নিক। মাছ, ফল, মাংস টাটকা রাখতে এটি ব্যবহার করা হলে তা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শরীরে ক্যান্সারের কোষ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।

কার্বাইড ও ইথোফেন: ফল পাকাতে ব্যবহৃত হলেও এগুলোর সক্রিয় উপাদান শরীরে প্রবেশ করে স্নায়ুতন্ত্রের উপর আঘাত করে, পাকস্থলী ও লিভারের কোষ নষ্ট করে। গ্রোথ হরমোন: মুরগি বা গবাদিপশু দ্রুত বড় করার জন্য অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোন দিলে তা মানবদেহে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, শিশুদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ত্বকের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। ভারী ধাতু (সীসা, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম): এসব ধাতু একবার শরীরে গেলে সহজে বের হয় না। ধীরে ধীরে জমে কিডনি, লিভার, হৃদপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র ও হাড়ের গঠন নষ্ট করে দেয়। শিশুদের মানসিক বিকাশেও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিনতি ও ফলাফল: ক্যান্সার, কিডনি ফেলিওর, লিভার সিরোসিস, হার্ট অ্যাটাক, স্নায়ুরোগ, বন্ধ্যাত্ব, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া। পুষ্টিবিদদের মতে, এসব ভেজাল খাবার গ্রহণে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা দেয় বমি, ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কার্যক্ষমতা হারায়। শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে: শিশুদের জন্য তৈরি খাবার, পাউডার দুধ, স্ন্যাকস, জুস, চকলেট, নুডলস, এখন সমানভাবে দূষণের শিকার। শিশুরা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় খুব দ্রুত এসব বিষক্রিয়ার প্রভাব অনুভব করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এক প্রকার "নীরব শিশু হত্যা", যেখানে শিশুরা অজান্তেই ভবিষ্যতের ক্যান্সার বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই: বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল প্রতিরোধে একাধিক আইন রয়েছে: ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো; আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই, যার ফলে ভেজালকারীরা ধরা পড়লেও সাজা হয় না, অথবা কয়েক দিনের মধ্যেই বের হয়ে পুনরায় কাজ শুরু করে। বিভিন্ন সংস্থা যেমন বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, স্থানীয় প্রশাসন, সবাই দায়িত্বে থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, জনবল সংকট এবং মাঠ পর্যায়ে দুর্বলতা ভেজালের বিস্তারকে আরও সহজ করেছে। বাজারগুলোতে নজরদারির অভাব, অস্বচ্ছ সাপ্লাই চেইন এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকায় এ সমস্যা বছর বছর বাড়ছে।

বাজার নজরদারি সীমাবদ্ধতা: মাছ, মাংস, সবজি, এসবের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিএসটিআই-এর নয়, ফলে সেখানে ভেজালের ব্যবহার শনাক্ত হলেও আইনি পদক্ষেপ স্পষ্ট নয়। তবুও বিএসটিআই অনেক সময় ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় ফরমালিন ও কার্বাইড পরীক্ষা করে থাকে। কিন্তু বাজারের বিস্তৃত পরিসর, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের গোপন কৌশল এই নজরদারিকে অকার্যকর করে দেয়।

সমাজ, রাষ্ট্র ও নাগরিক দায়িত্ব: খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার যেমন মূল নেতৃত্ব দেবে, তেমনি ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। নিচে সমস্যা সমাধানের কয়েকটি যৌক্তিক দিক তুলে ধরা হলো;  শক্তিশালী আইন প্রয়োগ: ভেজালকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, পুনরায় অপরাধ করলে কঠোর শাস্তি, মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার। সাপ্লাই চেইন ট্রেসিং: উন্নত দেশগুলোর মতো “খাদ্য ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম” চালু হলে কোন পণ্যে কোথায় দূষণ হয়েছে তা সহজে শনাক্ত করা যাবে। একক খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ: একাধিক সংস্থার বদলে সমন্বিত একক কর্তৃপক্ষ থাকলে কাজ হবে দ্রুত, সঠিক ও কার্যকরভাবে। কৃষিতে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার: প্রশিক্ষণ, মনিটরিং, ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি বন্ধ, অর্গানিক চাষাবাদে উৎসাহ প্রদান। জনসচেতনতা বৃদ্ধি: ভোক্তাদের জানাতে হবে, রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফল চিনবেন কিভাবে, অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো মুরগি শনাক্ত করার উপায়, ভেজাল পণ্যের ঝুঁকি, অভিযোগ জানানো ও আইনগত সহায়তা পাওয়ার পথ। গবেষণা ও ল্যাব উন্নয়ন: দেশের সব বিভাগীয় শহরে আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ল্যাব স্থাপন জরুরি।

ভেজাল স্বাস্থ্যহানি ও অর্থনীতির হুমকি: ভেজাল খাদ্যের কারণে মানুষ বারবার অসুস্থ হয়, যার ফলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, কর্মক্ষমতা কমে, এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। ক্যান্সারসহ দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা ব্যয় একটি পরিবারকে দ্রুত দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে ভেজাল শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলে।

এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ আরও ভয়াবহ। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে, খাদ্য ভেজাল এখন আর বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সব কাঠামোকে আক্রান্ত করা একটি মহামারী। যে খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার মূল উপাদান, সেটিই যখন ক্যান্সার, কিডনি ফেলিওর এবং অঙ্গ বিকল হওয়ার কারণ হয়, তখন একটি দেশের জনগোষ্ঠী চরম ঝুঁকিতে পড়ে। খাদ্যে ভেজাল রোধে আইন আছে, গবেষণা আছে, তথ্যও আছে, নেই শুধু কঠোর প্রয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ। তাই এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কঠোরতা, ব্যবসায়িক নৈতিকতা ও জনসচেতনতার সমন্বয়ে ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। নাহলে আগামী প্রজন্মকে নিরাপদ খাদ্য নয়, বরং বিষাক্ত ভবিষ্যতই উপহার দিতে হবে। খাদ্য হতে হবে নিরাপদ, পুষ্টিকর ও ভেজালমুক্ত, এটাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।