
সমীরণ বিশ্বাস: বাংলাদেশে আম শুধু একটি ফল নয়, এটি অর্থনীতি, কৃষি এবং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চলতি মৌসুমে অনেক জেলায় রেকর্ড পরিমাণ মুকুল এসেছে, যা একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন বছরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, নওগাঁ, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে গাছভর্তি মুকুল কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত চারা, সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক বাগান পরিচর্যার ফলে ফলন বৃদ্ধির সম্ভাবনা জোরদার হয়েছে। তবে রেকর্ড মুকুল মানেই রেকর্ড রপ্তানি নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, মান নিয়ন্ত্রণ, এমআরএল (Maximum Residue Limit) মানদণ্ড পূরণ, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সুবিধার ঘাটতি এবং শীতল সরবরাহ চেইনের সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের জন্য মানসম্মত প্যাকেজিং, ট্রেসেবিলিটি এবং দ্রুত পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে কাজ করলে, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং রপ্তানি প্রণোদনার মাধ্যমে, বাংলাদেশি আম বৈদেশিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। তাই রেকর্ড মুকুল সম্ভাবনার দ্বার খুললেও, টেকসই রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা ও মানভিত্তিক উৎপাদনই এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আম একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলনশীল ও সম্ভাবনাময় খাত। চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমগাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে মুকুল, আর সেই মুকুল থেকে ইতোমধ্যে গুটি আসা শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক অবস্থা অনুকূলে থাকলে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকরা। তারা স্বপ্ন দেখছেন ভালো ফলন, ন্যায্যমূল্য এবং লাভবান হওয়ার। এই আশাবাদের পেছনে রয়েছে কৃষি বিভাগের নিবিড় পরামর্শ, প্রযুক্তিনির্ভর পরিচর্যা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা।
আম উৎপাদনের প্রধান অঞ্চলসমূহ:
বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে আম উৎপাদন হয় সাতক্ষীরা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সান্তাহার, সাপাহার এবং নিয়ামতপুর অঞ্চলে। বিশেষ করে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দেশের আমের রাজধানী বলা হয়। এখানকার মাটি, আবহাওয়া ও তাপমাত্রা আম উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। উল্লেখিত এলাকাগুলোতে যে সমস্ত জনপ্রিয় জাতের আম চাষ হয়, তার মধ্যে রয়েছে গোপালভোগ, হিমসাগর, গোবিন্দভোগ, গৌরমতি, আম্রপালি, হাড়িভাঙ্গা, বারি-৪, ফজলি, ল্যাংড়া, বেনানা ও মিয়াজাকি। প্রতিটি জাতের স্বাদ, রঙ, আকৃতি ও বাজারচাহিদা ভিন্ন। যেমন, হিমসাগর ও ল্যাংড়া দেশীয় বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয়, ফজলি আকারে বড় এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহৃত হয়, আর মিয়াজাকি উচ্চমূল্যের বিশেষ জাত হিসেবে ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে সম্ভাবনার কথা:
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২ লক্ষ ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। বছরে মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ২৭,০৭,৪৫৯ মেট্রিক টন। দেশে মোট আম চাষির সংখ্যা প্রায় লক্ষাধিক। এই বিশাল উৎপাদন ও কৃষকসংখ্যা প্রমাণ করে, আম কেবল একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ।
চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ মুকুল ধরায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আবহাওয়া বড় একটি নির্ধারক বিষয়। অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি বা অকাল ঝড় ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কৃষকরা এখন সঠিক পরিচর্যা, রোগবালাই দমন এবং সময়মতো সেচ ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের ভূমিকা ও প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তা:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে। মুকুল আসার সময় ছত্রাকনাশক স্প্রে, ফল ঝরা রোধে হরমোন প্রয়োগ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং পোকামাকড় দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (IPM) ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় কৃষকরা এখন মোবাইলভিত্তিক কৃষি অ্যাপ ও হটলাইনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পরামর্শ পাচ্ছেন।
এছাড়া রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্লোবাল গ্যাপ (Global GAP) মানদণ্ড অনুসরণ, রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ (MRL) নিয়ন্ত্রণ এবং প্যাকহাউস ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য এসব মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদন বনাম রপ্তানি: বৈষম্যের বাস্তবতা:
যদিও বছরে ২৭ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি আম উৎপাদিত হয়, রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১,২৯০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের অতি ক্ষুদ্র অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থ বছরে এখনও চূড়ান্ত রপ্তানি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি। তবে চীনে নতুন বাজার উন্মুক্ত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগের কারণে ১,০০০-২,০০০ মেট্রিক টনের মধ্যে রপ্তানি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও উৎপাদনের তুলনায় এখনো অত্যন্ত সীমিত।
রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা ও করণীয়:
বাংলাদেশি আমের স্বাদ ও গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক। বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদা রয়েছে। তবে রপ্তানিতে প্রধান বাধাগুলো হলো; মানসম্মত বাছাই ও গ্রেডিং ব্যবস্থার অভাব। পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন সুবিধার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। দ্রুত ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার অভাব।
MRL ও ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণে দুর্বলতা:
এই সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। আধুনিক প্যাকহাউস, ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (VHT) প্ল্যান্ট, উন্নত কোল্ড স্টোরেজ এবং বিমানবন্দরভিত্তিক দ্রুত কার্গো ব্যবস্থার উন্নয়ন রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ন্যায্যমূল্য ও কৃষকের লাভজনকতা:
উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তবে তার লাভজনকতা কমে যায়। অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকরা প্রকৃত বাজারমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তাই ডিজিটাল মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম, সরাসরি কৃষক-ক্রেতা সংযোগ এবং ই-কমার্সভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি। চুক্তিভিত্তিক চাষ (Contract Farming) ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করলে কৃষকরা আগাম মূল্য নিশ্চয়তা পেতে পারেন। এতে উৎপাদন পরিকল্পনাও আরও সুসংগঠিত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অকাল ঝড়, অতিবৃষ্টি বা খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আম উৎপাদনে বড় ক্ষতি করতে পারে। তাই আবহাওয়া পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা, ফসল বীমা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খরা-সহনশীল ও রোগপ্রতিরোধী নতুন জাত উদ্ভাবনে আরও জোর দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
ভবিষ্যৎ দিগন্ত:
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনও বিশাল সম্ভাবনা অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। যদি মাননিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন ও বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি সম্ভব। চলতি মৌসুমে রেকর্ড মুকুল ও সম্ভাব্য উচ্চ ফলন কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সঠিক পরিচর্যা বজায় রাখলে এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সেই উৎপাদনকে অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করতে হলে বাজারব্যবস্থা ও রপ্তানি খাতে কাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের আম খাত আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে রেকর্ড উৎপাদনের সম্ভাবনা ও কৃষকের স্বপ্ন, অন্যদিকে রয়েছে রপ্তানির সীমাবদ্ধতা ও বাজার কাঠামোর দুর্বলতা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ, প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে এই খাতকে একটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব। এ বছর যদি আবহাওয়া সহায়ক হয় এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তবে আম উৎপাদন ও রপ্তানি, দুটো ক্ষেত্রেই নতুন ইতিহাস রচিত হতে পারে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে। এখন সময় পরিকল্পিত পদক্ষেপের, যাতে রেকর্ড মুকুল সত্যিকারের রেকর্ড আয়ে রূপ নেয়।
বাংলাদেশের আমের উৎপাদন গত কয়েক বছরে প্রশংসনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশীয় কৃষকরা বিভিন্ন জাতের আম চাষে দক্ষতা বৃদ্ধি করেছেন, ফলে সম্ভাবনার আকাশ আরও প্রসারিত হয়েছে। তবে রপ্তানিতে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যেমন মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা। প্রযুক্তি ও আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহারে এই বাধাগুলো কমানো সম্ভব। সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন কৌশল উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের আমকে বৈশ্বিক বাজারে সুপরিচিত করা যায়। সঠিক পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা থাকলে, রপ্তানি সম্ভাবনা সত্যিই অনন্য।
লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।