Thursday, 14 December 2017

 

শবে মিরাজের তাৎপর্য ও অনুপম শিক্ষা

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান:পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী যুগান্তময়ী ঘটনা ‘মিরাজ’। এর আভিধানিক অর্থ সিঁড়ি, সোপান, ঊর্ধ্বগমন, বাহন, আরোহণ, উত্থান প্রভৃতি। অন্য অর্থে ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ বা মহামিলন। যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিযা এবং আল্লাহর কুদরতের মহানির্দশন। নবীকুলের মধ্যে একমাত্র বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে এই অনন্য মর্যাদা প্রদান করে সম্মানিত করা হয়। যাতে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার ঊর্ধ্বজগতের নিদর্শনাবলি পরিদর্শন ও তাঁর নিয়ামতরাজি স্বচক্ষে অবলোকন করে উম্মতকে তা সবিস্তারে বর্ণনা করতে পারেন।

পবিত্র কোরআনে নবী করিম (সা.)-এর ঊর্ধ্বলোকে সফর সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি বরকতময় করেছিলাম, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’(সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১)

সহীহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ৫০ বছর বয়সে নবুওয়াতের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রজনীতে মিরাজের বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ঐ রাত্রিতে তিনি কা’বা শরিফের চত্বরে (হাতীমে) অথবা কারো মতে, উম্মে হানীর গৃহে শায়িত ও নিদ্রিত ছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ.) সেখানে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, ওজু করালেন, সীনা চাক করলেন এবং ‘বোরাকে’ চড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছলেন। সেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ‘ইমামুল মুরসালিন’ হিসেবে সমস্ত নবী-রাসূলদের ইমামতিতে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। এরপর তিনি আবার ‘বোরাকে’ চড়ে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করলেন এবং এ ভ্রমণে তাঁর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে হজরত আদম (আ.), হজরত ঈসা (আ.), হজরত ইয়াহ্ইয়া (আ.), হজরত ইউসুফ (আ.), হজরত ইদ্রিস (আ.), হজরত হারুন (আ.), হজরত মূসা (আ.) ও হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও সালাম বিনিময় হলো। নবীদের সংবর্ধনা শেষে সেখান থেকে সপ্তম আকাশের ওপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক স্থানে পৌঁছলেন, যেখানে ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ.) থেমে গেলেন এবং নবী করিম (সা.) একাকী ‘রফরফে’ চড়ে ‘বায়তুল মামুরে’ উপনীত হলেন।

এরপর নবী করিম (সা.) ‘রফরফে’ চড়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন। তিনি এখানে শুধু একটি পর্দার অন্তরাল থেকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করলেন। সেখানে তিনি প্রভুর সাথে একান্ত আলাপে মিলিত হন। আশেক ও মাশুকের মধ্যে সংলাপ ও কথোপকথন হলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের বিশেষ রহস্য বুঝিয়ে দিলেন এবং জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করালেন, যাতে এ সম্বন্ধে কথা বলতে তাঁর মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না হয়। সবশেষে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান নিয়ে আবার ঐশীবাহনে আরোহণ করে মুহূর্তের মধ্যে ধরনীর বুকে ফিরে এলেন। সংক্ষেপে এই হলো মিরাজের প্রকৃত ঘটনা।

এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর সে (মুহাম্মদ (সা.)) তার নিকটবর্তী হলো, অতি নিকটবর্তী; ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার বান্দার প্রতি যা কিছু প্রত্যাদেশ করার ছিল, তা প্রত্যাদেশ করলেন। ... নিশ্চয়ই সে তাকে (জিব্রাঈলকে) আরেকবার দেখেছিল সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার সন্নিকটে রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। যখন বৃক্ষটি যদ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার তদ্বারা ছিল আচ্ছাদিত। তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। সে তো তার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী স্বচক্ষে অবলোকন করেছিল।’ (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৮-১৮)

আল্লাহ তাআলা এক বিশেষ উদ্দেশ্যে অর্থাৎ তাঁর মহান কুদরত, অলৌকিক নিদর্শন, নবুওয়াতের স্বপক্ষে এক বিরাট আলামত, জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ, মুমিনদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণ, হেদায়েত, নিয়ামত ও রহমত, ঊর্ধলোক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জন, সৃষ্টিজগতের রহস্য উন্মেচন, স্বচক্ষে বেহেশত-দোজখ অবলোকন, পূর্ববতী নবী-রাসূলদের সাথে পারস্পরিক সাক্ষাত ও পরিচিতি, সুবিশাল নভোমণ্ডল পরিভ্রমণ, মহাকাশ, আরশ, কুরসী, লওহ, কলম প্রভৃতি সামনা-সামনি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর প্রিয় হাবীবকে নিজের একান্ত সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছিলেন, যাতে তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইসলামের মর্মবাণী প্রচার করতে পারেন।

সুতরাং মিরাজ কোনো স্বপ্ন ছিল না, মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বাস্তবেই এটা সংঘটিত হয়েছিল। মানুষ যদি তার জ্ঞান-বুদ্ধিবলে মহাশূন্যের এতো বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হতে পারে, তাহলে সর্বময় ক্ষমতার আঁধার আল্লাহর পক্ষে তাঁর বন্ধুকে মিরাজে নেওয়া নিশ্চয়ই সম্ভব। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকিত যুগে বসবাস করে কেউ পবিত্র কোরআন ও হাদীসের বর্ণনার আলোকে বিশ্বনবী (সা.)-এর বিস্ময়কর ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণকে অস্বীকার করতে পারেন না। এ মিরাজের ঊর্ধ্বগমনের সূত্র ধরেই মানুষ মহাকাশ গবেষণায় বেশ সাফল্য পেয়েছে।

নবী করিম (সা.)-এর মিরাজের প্রকৃতি ও অনুপম শিক্ষা বিভিন্ন দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। শবে মিরাজের মাধ্যমে ঊর্ধ্বলোকের উচ্চতম স্থানে মহান সৃষ্টিকর্তার চরম ও নিবিড় সান্নিধ্যে মহাবিশ্বে পরিভ্রমণের মাধ্যমে সৃষ্টিরহস্য উদ্ঘাটনের পরম সৌভাগ্য রাসূলুল্লাহ (সা.) কে প্রদান করে মানব মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব বিধান করা হয়। বায়তুল মুকাদ্দাসে মহানবী (সা.)-এর ইমামতিতে হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব নবী-রাসূলের সালাত আদায় করার মাধ্যমে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠত্ব ও আদর্শ শিক্ষার অনুসরণীয় বিশ্বজনীন রূপটি প্রমাণিত হয়। তাই ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম নামাজকে রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বজনীন মিরাজ ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘নামাজ মুমিনদের জন্য মিরাজস্বরূপ।’ (ইবনে মাজা)

মিরাজের উপহার সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মিরাজ রজনীতে নবী করিম (সা.) ও তাঁর উম্মতের জন্য কয়েকটি জিনিস প্রদান করা হয়- প্রথমত: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ; যা প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত: তাঁর উম্মতের যেসব ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, আল্লাহ তার পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন। তৃতীয়ত: সূরা আল-বাকারার শেষাংশ। চতুর্থত: সূরা বনি ইসরাঈলের ১৪ দফা নির্দেশনা।

যথা- ১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সাথে কারো শরীক না করা, ২. পিতা-মাতার সাথে সদাচারণ করা, ৩. আত্মীয়স্বজন, এতিম ও মুসাফিরের হক মেনে চলা, ৪. অপচয় না করা, ৫. অভাবগ্রস্থ ও প্রার্থীকে বঞ্চিত না করা, ৬. হাত গুটিয়ে না রেখে সব সময় কিছু দান করা, ৭. অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা না করা, ৮. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা, ৯. ব্যাভিচারের নিকটবর্তী না হওয়া, ১০. এতিমের সম্পদের ধারে কাছে না যাওয়া, ১১. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তা অনুসন্ধান করা, ১২. মেপে দেওয়ার সময় সঠিক ওজন পরিমাপ করা, ১৩. প্রতিশ্রুতি পালন করা, ১৪. পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেলা না করা। সমাজ সংস্কারে এসব ইসলামী দিকনির্দেশনা মেনে চললে ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবনে অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে।

ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর উৎপীড়নের কাল সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে আদর্শ সমাজ ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের বুনিয়াদি মূলনীতি মিরাজের মাধ্যমে মানব জাতির জন্য উপহার হিসেবে পাওয়া যায়, যা পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ঈসরাইলে মিরাজ সংক্রান্ত আলোচনায় বিধৃত হয়েছে, যাকে ইসলামি মূলনীতির ১৪ দফা নামে অভিহিত করা যায়। যদি মুসলমানদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান জীবনাদর্শ ও মিরাজের শিক্ষামূলক অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি আদর্শ ও কল্যাণমুখী জাতি গঠনের রূপরেখা অনুযায়ী নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করা যায় তাহলেই বিশ্বমানবতার সর্বাঙ্গীন সুখ-শান্তি, উন্নয়ন-সমৃদ্ধি ও মুক্তি সম্ভব হবে।
===============================================
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: পরিচালক, এশিয়ান ইনস্টিটিউট, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ