Saturday, 18 November 2017

 

সত্য ও ন্যায়ের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগের শিক্ষা দেয় মুহাররম

এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম ইসলামিক ডেস্ক:রক্তস্নাত কারবালার শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে মুহাররম এসেছে সত্য ও ন্যায়ের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগের আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে। ইসলামী ও আরবি বর্ষপঞ্জির অত্যন্ত সম্মানিত ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস মুহাররম। এ মাসে সংঘটিত হয়েছে মানবজাতির ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ঘটনা, যা এই মাসকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মর্যাদার অধিকারী করেছে। তাই মুহাররমের শিক্ষা ও তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানবজাতির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্য দশই মুহাররম বা আশুরার দিন। এ দিনেই সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদম (আ:) মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মনোনীত ‘খলীফা’ রূপে পৃথিবীতে আগমন করেন এবং এ দিনেই তাঁর তওবা কবূল হয়। হযরত নূহ (আ:) এ দিনেই মহাপ্লাবন শেষে কিশতীর সকল আরোহীসহ নিরাপদে ভূপৃষ্ঠে অবতরণ করেন। আবার এ দিনেই হযরত ইদ্রীস (আ:) সশরীরে জান্নাতে গমন করেন এবং হযরত আইয়ুব (আ:) দীর্ঘকাল রোগভোগের গর আরোগ্য লাভ করেন এবং হযরত ইউনুস (আ:) চল্লিশ দিন মাছের পেটে অবস্থানের পর মুক্তি লাভ করেন।

এই  মুহাররমের দশ তারিখেই হযরত ইবরাহীম (আ) নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে সহীহ-সালামতে বের হয়ে আসেন এবং হযরত মুসা (আ:) বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার করেন, আর ফেরআউন তার দলবলসহ লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয়। আবার যেদিন আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী হযরত ঈসা (আ:) ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত থেকে উদ্ধার করে আপন সান্নিধ্যে উঠিয়ে নেন, সেদিনটিও ছিল এই  আশুরার দিন। আর হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী এ দিনেই সংঘটিত হবে ‘মহাপ্রলয়’ কিয়ামত।

উল্লেখিত ঘটনাবলীর আলোকে একথা সহজেই অনুমান করা যায় যে, অত্যন্ত বরকতময় ও তাৎপর্যমন্ডিত দিন এই আশুরা। কিন্তু ৬১ হিজরীর মুহাররম মাসের এই দিনেই সংঘটিত হয় এমন এক ঘটনা যা আশুরার পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করে, আশুরার শিক্ষা, মর্ম ও তাৎপর্যকে করে আরো ব্যাপকতর, আরো গভীরতর। যে ঘটনার স্মরণ গোটা মুসলিম উম্মাহকে শোক বিহবল ও বিস্ময়বিমূঢ় করে, পাষাণ হৃদয়কেও করে বেদনাহত রক্তাক্ত, যে ঘটনা জন্ম দেয় শত-সহস্র ‘বিষাদ সিন্ধুর’।

সে দিন ফোরাত নদীর তীরে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইতিহাসের নির্মম ও নৃশংতম ঘটনা। সত্য ও ন্যায়ের ঝান্ডা সমুন্নত রাখতে, পৃথিবীর বুকে আল্লাহর মনোনীত খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে স্বৈর শাসক ইয়াযীদের অনুগত সৈন্যদের হাতে অত্যন্ত নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন নবী-দৌহিত্র জান্নাতী যুবকদের সর্দার মা ফাতেমার নয়নের মণি হযরত হুসাইন বিন আলী (রা) ও তাঁর সাথীগণ।

কারবালা প্রান্তরে অকাতরে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে হযরত হুসাইন (রা) সে স্বর্ণোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তা স্বীয় মহিমায় আজো অম্লান, আজো ভাস্বর। সত্য ও ন্যায়ের জন্য এরূপ আত্মনিবেদন গোটা মানবজাতির ইতিহাসে অতি বিরল। কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত সেদিনের সেই নির্মমতা ও নৃশংসতার কথা স্মরণে আমাদের হৃদয়মন বেদনাহত হয়, চোখ অশ্রুভারাক্রান্ত হয়। এ সত্য, স্বাভাবিক, কিন্তু মুহাররম ও আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্য কিন্তু এই বেদনা ও শোক প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয়; সীমাবদ্ধ নয় ‘হায় হোসেন’ মাতমে আর মর্সিয়া ক্রন্দনে। বরং ‘ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন ক্রন্দন চাহিনা” এই হয় মুহাররম ও আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ও মর্মবাণী।

বর্তমান সমাজে মুহররম ও আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্যের উপলব্ধি একেবারে অনুপস্থিত। ইসলামের জন্য তথা সত্য ও ন্যায়ের জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণই পারে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে। আসুন আমরা সকলে মিলে মুহররম ও আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্যের উপলব্ধি করি এবং নিজেদের জীবরে কাজে লাগাই।শহান রাব্বুল আলামিন আমাদের তাওফিক দিন-আমিন।