Wednesday, 23 May 2018

 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ঢাকায় ‘নারী ও ইসলাম’ শীর্ষক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত

ইসলামিক ডেস্ক:আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে ৮ মার্চ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট (বিআইআইটি)’র উদ্যোগে রাজধানীর উত্তরাস্থ সংস্থার মিলনায়তনে প্রায় শতাধিক নারী-পুরুষের অংগ্রহণে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে নারী ও ইসলাম’ শীর্ষক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, নারী অধিকার আদায়ে সদা সোচ্চার বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক, গবেষক ও দার্শনিক শাহ আব্দুল হান্নান।

উদ্বোধনী বক্তব্যে বিআইআইটি’র নির্বাহী পরিচালক ড. এম আব্দুল আজিজ বলেন, মূলত মজুরি বৈষম্য দূর করা, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় আন্দোলনরত একদল শ্রমজীবী নারীর উপর মালিকপক্ষের দমন-নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং পরবর্তী নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম নারী সম্মেলন করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও এ দিনটি  নারীর সংগ্রামের এ ইতিহাসের স্মরণে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের ৫ নম্বর লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখ করে ড. আজিজ বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। তাই উন্নয়নের স্বার্থে নারীদের পিছিয়ে রাখা যাবে না, তাদের প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, সুষম উন্নয়নের স্বার্থে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের গতিধারাকে বেগবান করতে হলে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।

উক্ত কনফারেন্সে "Women in Development: Islamic Perspective"-শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন অন লাইনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক উইটনেস-এর সভাপতি ড. নাসিমা হাসান। ড. নাসিমা তার প্রবন্ধে উন্নয়নের সূচক যথা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ মাতৃত্ব, লিঙ্গ সমতাসহ প্রতিটিতে নারীর ভূমিকা রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, পরিবার, সমাজ তথা দেশের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য নারী এবং পুরুষ উভয়ের ভূমিকাই অনস্বীকার্য এবং সমাজের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য তাদের উভয়কেই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তিনি আল-কুরআনের সুরা তওবার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নারী এবং পুরুষ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক; তারা পরস্পর নিজেদেরকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করবে এবং অন্যায়-অপরাধ থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখবে। তাই তিনি পরিবার ও সামাজে নারীরা যেন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন, তাদের প্রাপ্য অধিকার যেন তারা অর্জন করতে পারেন, নারীরা যেন সবধরনের শোষণ-বঞ্চনা থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারেন সেজন্য পুরুষদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।

ড. নাসিমা হাসান তার প্রবন্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে ন্যায়, সমতা ও ভ্রাতৃত্বভিত্তিক সমাজ গঠনে নারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তাহলেই কেবল নারীদের ক্ষমতায়নে এবং লিঙ্গ সমতা অর্জনে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান তার আলোচনায় বলেন, ইসলামই কেবল নারীদের অগ্রাধিকার দিয়েছে, কন্যা-জায়া ও জননী হিসেবে দিয়েছে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা। তিনি রাসুল সা.-কে উদ্ধৃত করে বলেন, মায়ের মর্যাদা বাবার চেয়ে ৩ গুণ বেশি। শালীনতা বজায় রেখে শরী’আহ সম্মত যে কোনো কাজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে নারীদের কোনো বাধা ইসলামে নেই।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল কবির বলেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি করতে ইসলামে দেনমোহর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি সম্পদে নারীর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নারী-পুরুষ সবাইকে এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা রাখতে বলেন। তিনি বলেন, মানুষ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা। এ ইবাদত পালনে নারী-পুরুষে কোনো পার্থক্য কুরআনে আল্লাহ তায়ালা করেননি।

বিশিষ্ট সমাজকর্মী এবং হাঙ্গার প্রকল্পের সেচ্ছাসেবী তাজিমা হোসেন মজুমদার বলেন, অশিক্ষা নারী উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। তিনি বলেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি হতে হবে। তবে পুরুষদের বাদ দিয়ে নারী একা চলতে পারবে না, এটা কাম্যও নয়। তিনি নারীদের সংঘঠিত হওয়ার উপর জোড় দিয়ে তাদের কর্মকা-যেন টেকসই হয়, সবার কাজে লাগে সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে শাহ আব্দুল হান্নান বলেন, অনেক মুসলিম দেশেই নারীরা বহুবিধ বৈষম্য এবং সামাজিক প্রবঞ্চনার স্বীকার। যদিও ইদানিং ক্রমে ক্রমে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। নারীর প্রশ্নসমূহ সমাজের সামনে চলে আসছে। এটা বলা যায় যে, আগামী শতাব্দীতে ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রগতি যে কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে তার মধ্যে একটি হবে মানবাধিকার, বিশেষ করে নারীর অধিকার ইসলাম কতটা নিশ্চিত করতে পারবে তার উপর।

তিনি বলেন, ইসলামে নারী-পুরুষে কোনো মৌলিক ভেদাভেদ নেই। শুধু বলা যায়, কিছু ক্ষেত্রে নারী পুরুষের চেয়ে এগিয়ে যেমন মাতৃত্ব। আবার কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ নারীরের চেয়ে এগিয়ে যেমন সংসারের পুরো অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, পাশ্চাত্য নারীর অবস্থা খারাপ, সেখানে পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাওয়ায় নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পাশ্চাত্যে দেহ ব্যবসা ও মাদক নিষিদ্ধ না হওয়ায়, নারীরা পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত নারীরাই মূলত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। কিন্তু ইসলামে এসবকে অবৈধ্ বলায় নারীরা এ থেকে কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে না।

তিনি আল-কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পুরুষরা হলো নারীর Protector আর একজন Protected, Protector-এর চেয়ে বেশি মর্যাদাবান বলেই তার Protection দরকার। তিনি ইসলামে নারী-পুরুষের সাম্যের উল্লেখ বিদায় হজের ভাষণ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সাদার উপর কালোর আর কালোর উপর সাদার কোনো মর্যাদা নেই। সার্বিক বিবেচনায়, নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই। তবে তিনি যে সব কাজে গর্ভাশয়ের ক্ষতি হয় তা নারীদের না করাই ভালো।-প্রেস বিজ্ঞপ্তি