Tuesday, 21 August 2018

 

বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন: তারাপুরের ক্ষুদ্রতম মসজিদ

বগুড়া জেলার সান্তাহারের তারাপুরে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে নির্মিত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম মসজিদ। মসজিদটি সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। সম্প্রতি মসজিদটি ঘুরে এসে লিখছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবুল বাশার মিরাজ ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম নিশাদ

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের ঘটনা। এমন একটি মসজিদ তৈরি হবে যার আকৃতি হবে অনেক ছোট। মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারবে এমনভাবেই নির্মাণ করা হয় এমন একটি মসজিদ। মসজিদটি এক গুম্বুজ বিশিষ্ট আছে একটি মিনার। নেই কোন জানালা। আছে ছোট আকৃতির একটি দরজা।এত ছোট মসজিদ পৃথিবীতে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ছোট হলেও সবকিছুরই নির্দিষ্ট একটা মাপ থাকে। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে এতই ছোট যে, মাত্র তিনজন মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবে এই মসজিদে। লম্বায় এই মসজিদের উচ্চতা ১৫ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। মসজিদের দরজার উচ্চতা ৪ ফুট আর চওড়া দেড় ফুট। একটি মানুষ অনায়াসে সেখানে ঢুকতে বা বের হতে পারবে। একটি গুম্বুজ আছে যেটা অনেকটাই উঁচুতে। আর দেওয়ালের পুরুত্ব দেড় ফুট। এছাড়া দেওয়ালটি ইটের তৈরি। তবে যে ইটগুলো মসজিদের দেওয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো অর্ধেক ভাঙা (এই ইটকে গ্রামে অধলা ইট বলে)। মসজিদের দরজায় দুইটি রাজকীয় নিদের্শনার আদলে নির্মিত খিলান আছে।

মসজিদটি বগুড়ার সান্তাহার এক আজব জায়গায় পরিণত হয়েছে। সান্তাহার থেকে ৩ কিলোমিটার  ভেতরে একটি গ্রাম। নাম তারাপুর। তারাসুন্দরী নামের এক মহিলার নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ করা হয়। তবে তারাসুন্দরী কে বা তিনি কীভাবে এই গ্রামে এলেন তা জানা যায়নি। তারাপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে  এই মসজিদটি।

কথিত আছে, আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে এখানে নামাজ পড়া হতো। কে বা কারা, কেন এই মসজিদ নির্মাণ করেছে এ নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে অনেক মতবিরোধ আছে। মসজিদটি সম্পর্কে ওই গ্রামের এক যুবক জানান, তারা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছেন এই মসজিদ এভাবে, এই অবস্থায় আছে। কেউ কেউ এখানে মানতও করে। তবে তার দাদা তাদের কাছে গল্প করেছেন, দাদার দাদার আমলে এখানে নামাজ পড়া হতো আর এখানে নামাজ পড়ত একজন। সম্ভবত তার নাম শিতন। গ্রামবাসী তাকে ও তাঁর পরিবারকে একঘরে করে দেয়ার কারণে সেখানে তিনি নিজে নিজে মসজিদ স্থাপন করে এবং একা একা নামাজ পড়া শুরু করেন। গ্রামবাসীর মধ্যে আরও একজন বয়স্ক মানুষ জানান। তার দাদা গল্প করত তারাপুরে আজ থেকে সাড়ে তিনশ বছর আগে  তেমন কোন মসজিদ ছিল না। জমিদার অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে এখানে জমিদারের কয়েকজন মুসলমান পেয়াদা কাজ করার জন্য বেশকিছু দিনের জন্য স্থায়ী হন। আর তারা তাদের নামাজ পড়ার জন্য স্বল্প পরিসরে একটি মসজিদ স্থাপন করেন।  যেখানে হাতেগোনা একসঙ্গে দুই-তিন জন নামাজ পড়তে পারবে। জমিদারের পেয়াদাদের নামাজ পড়ার ব্যাপারে এই মসজিদ নির্মিত বলে এটি জমিদারের বিশেষ ব্যবস্থায় নির্মাণ করা হয়। আর তার জন্য এটি দেখতে রাজকীয় একটি পুরাকীর্তির মতো।

গ্রামের একজন তরুণ বলেন, সান্তাহারের ছাতিয়ানে রানী ভবানীর বাবার বাড়ি। আর সান্তাহারের আশপাশসহ আমাদের তারাপুরও রানী ভবানীর বাবার রাজত্ব ছিল। তারই অংশ হিসেবে রানী ভবানীর আসা যাওয়া ছিল এই গ্রামে। একজন মুসলমান মহিলা এই গ্রামে ছিল যিনি পরহেজগার। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে ওই মহিলার নামাজপাড়ার অনেক অসুবিধা হতো। রানী ভবানী এমন কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই এই গ্রামে চলে আসেন আর সেই মহিলাকে যেন  কেউ তার নামাজ পড়াতে অসুবিধা না করতে পারে তার জন্য পেয়াদাদের হুকুম দেন রাজকীয় নকশায় একটি মসজিদ তৈরি করে  দেয়ার। এভাবেই এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তবে এটাও তার দাদার মুখ  থেকে শোনা। তার দাদা আবার শুনেছে তার দাদার কাছে।

ইতিহাস যেটাই হোক না কেন? আমাদের জানতে হবে মসজিদটির সম্পর্কে। এটি যে একটি মসজিদ আর ওখানে যে নামাজ পড়া হতো তা নিয়ে কারও মনে সন্দেহ নেই। আসলে এটি এত পুরনো আর সংস্কারের অভাবে এটির যে অবস্থা এতে এই মসজিদের ব্যাপারে মসজিদটি দেখার পরও  তেমন কোন বিশেষ চিহ্ন বা নিদর্শন চোখে পড়ে না। এমন একটি ঐতিহ্য নিদর্শন আমাদের সংরক্ষণ করা দরকার। কারণ এটি আমাদের দেশকে এনে দিতে পারে সম্মান। এ বিষয়ে সরকার যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে বলে এ এলাকার লোকজন মনে করেন।