Friday, 15 December 2017

 

সবার জন্য প্রোটিন নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে

কৃষি ফোকাস ডেস্ক:আগামীদিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে সবার জন্য প্রোটিন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পোল্ট্রিখাতের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হবে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং ইউ.এস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (ইউএসএসইসি) এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রোটিন ফর অল’ শীর্ষক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুষ্টি, পোল্ট্রি এবং গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠনে ডিম, দুধ, মাছ, মাংস সহ সব ধরনের প্রোটিন খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দেন।

বিপিআইসিসি’র সভাপতি জনাব মসিউর রহমান বলেন- প্রোটিন ছাড়া মানুষের শরীর স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করতে পারেনা। তাই আমাদের প্রোটিন গ্রহণ করতেই হবে। তিনি বলেন- পুষ্টি সূচকে বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক উন্নতি লাভ করেছে কিন্তু এখনও আমাদের প্রোটিন ইনটেকের পরিমান সন্তোষজনক নয়। জনাব মসিউর বলেন- আগামীদিনের বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি,  সুস্থ্য মা ও শিশু এবং কর্মক্ষম জনশক্তি। পুষ্টি ঘাটতির কারণে অসুস্থ্য ও খর্বাকৃতি শিশুর জন্ম হচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পুষ্টি ঘাটতির কুফল বইতে হচ্ছে জাতিকে। এ থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন। আর সে কারণে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং সাধারন মানুষ যেন তা সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।  

জনাব মসিউর বলেন- বাংলাদেশে মাথাপিছু প্রোটিন কনজাম্পশন প্রায় ৬৬ গ্রাম। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ আসে প্রাণিজ আমিষের উৎস থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু প্রোটিন কনজাম্পশন ৮৩ গ্রাম যার ৬৭ শতাংশই আসে প্রাণিজ আমিষের উৎস থেকে। কাজেই শুধু প্রোটিন কনজিউম করলেই হবেনা, প্রাণিজ উৎস থেকে প্রোটিন ইনটেকের পরিমান আরও বাড়াতে হবে।  

জনাব মসিউর বলেন- মানসম্মত পোল্ট্রি ও ফিস ফিড উৎপাদনে বাংলাদেশ যথেষ্ঠ অগ্রগতি লাভ করেছে কারণ ভূট্টা, সয়াবিনসহ  যে সকল কাঁচামাল ব্যবহৃত হচ্ছে তা পরিক্ষিত এবং অত্যন্ত উন্নত মানের। এজন্য তিনি ইউ.এস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলকে তাঁদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। জনাব মসিউর বলেন- পোল্ট্রি এবং মাছ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় খরচ হয় ফিডে। তাই ফিডের উৎপাদন খরচ কমাতে হলে অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল আমদানিতে এআইটি এবং শুল্ক তুলে নিতে হবে। পাশাপাশি এ শিল্পের ভিত মজবুত করতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে হবে সরকারকে।    

ইউএসএসইসি এর কনসালট্যান্ট মি. পাওয়ান কুমার বলেন- সাধারন মানুষের আয়ুস্কাল ৮৫ বছর এবং কর্মজীবন ৭০ বছরে উন্নীত করতে হবে। ২০১৫ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন উল্লেখ করে মি. পাওয়ান বলেন, প্রায় ৮০ শতাংশ ভারতীয়ই প্রোটিন ঘাটতিতে ভুগছেন। ভারতের গ্রামাঞ্চলে প্রোটিন ঘাটতি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন- শুধু খাদ্য গ্রহণ করলেই হবে না, শরীরের প্রয়োজন মত পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে। এমন প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে যা খুব সহজেই হজম হয়। প্রোটিন ঘাটতির কারণে মানবদেহে কী ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে সে বিষয়েও আলোকপাত করেন মি. পাওয়ান। তিনি বলেন উনবিংশ শতাব্দিতে নেদারল্যান্ডস এর মানুষ খাটো ছিল কিন্তু এখন তাদের গড় উচ্চতা প্রায় ১৮৩ সেন্টিমিটার। পাওয়ান বলেন- রিও অলিম্পিকে সর্বোচ্চ সোনাজয়ী দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় বৃটেন। প্রোটিন ইনটেকের দিক থেকেও তারা যথাক্রমে প্রথম এবং দ্বিতীয়। মেডেল তালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারি অপরাপর দেশগুলোর প্রোটিন ইনকেটও প্রথম সারিতেই রয়েছে। ভারত এবং বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ প্রোটিন আসে খাদ্য শষ্য থেকে কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে শষ্য থেকে আসে মাত্র ২০-৩০ শতাংশ প্রোটিন। মি. পাওয়ানের মতে- প্রোটিন সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি। তাই জনসচেতনতা বাড়াতে গণশিক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়াম্যান ড. এস.কে রায় বলেন- ২০১২ সালে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ ওয়েস্টেড চিল্ডরেন বা কম-ওজনের শিশুর জন্ম হয়েছে। ড. রায় বলেন- ১৯৯২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমান বেড়েছে। তিনি বলেন- ১৯৯৫-৯৬ সালে গরুর মাংসের মাথাপিছু কনজাম্পশন ছিল ৬.৬০ গ্রাম, ২০১০ সালে তা হয়েছে ৬.৮৪ গ্রাম। খাসির মাংসের মাথাপিছু কনজাম্পশন ১ গ্রাম থেকে কমে হয়েছে ০.৬০ গ্রাম। মুরগি/হাঁসের মাংসের মাথাপিছু কনজাম্পশন ৪ গ্রাম থেকে বেড়ে ১১.২২ গ্রাম;  ডিমের মাথাপিছু কনজাম্পশন ৩.২০ গ্রাম থেকে বেড়ে ৭.২৫ গ্রাম এবং মাছের মাথাপিছু কনজাম্পশন ৪৩.৮০ গ্রাম থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৯.৪১ গ্রাম হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়কালে গরুর মাংসের মাথাপিছু কনজাম্পশন তেমন বাড়েনি। কমেছে খাসির মাংসের কনজাম্পশন। অন্যদিকে মুরগি/হাঁসের মাংসের কনজাম্পশন প্রায় তিন গুণ এবং ডিমের কনজাম্পশন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে গরু এবং খাসির মাংস খাওয়ার পরিমান আশংকাজনক হারে কমেছে কিন্তু বেড়েছে মুরগি/হাঁসের মাংস এবং ডিম খাওয়ার পরিমান। ড. রায় বলেন- ডিম নিয়ে অনেক ভুল ধারনা প্রচলিত আছে। এগুলো দূর করা প্রয়োজন। তিনি বলেন- সাধারন মানুষের জন্য খিচুরি, পুষ্টি চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।        

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) সভাপতি জনাব আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান (শাহরিয়ার) বলেন-  প্রোটিনের ঘাটতি দূর করতে সরকার এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এক হয়ে কাজ করতে হবে। জনকল্যাণমুখী বর্তমান সরকার খাদ্যশষ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জনের পর পুষ্টি নিরাপত্তার উপর জোর দিয়েছেন। এটি ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।      

এসিআই -এর নির্বাহী পরিচালক ড. এফ এইচ আনসারি বলেন- আমাদের দেশে প্রোটিন ইনটেক বাড়ছে। কিন্তু ধনী ও গরীবের মাঝে সমতা থাকছে কি না সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট অব কুলিনারি আর্টস এর চেয়ারম্যান এবং উইমেন কুলিনারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর সভাপতি বিশিষ্ট রন্ধন শিল্পী নাজমা হুদা বলেন- “গরীবের খাদ্য ডিম” এই স্লোগানকে জনপ্রিয় করতে পারলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে ডিমের ইনটেক বাড়ানো এবং একই সাথে প্রোটিনের ঘাটতি কমানো যেতে পারে। তাছাড়া টেলিভিশনের রন্ধন বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোতেও ডিম ও মুরগির মাংসের উপকারিতা তুলে ধরার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।

শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন বলেন- স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় মুরগির মাংস অনেক বেশি সমাদৃত। তাছাড়া প্রচুর মাংস থাকে বলে শিশুদের কাছে পোল্ট্রি মাংস বেশ জনপ্রিয়। তিনি বলেন- দুধকে বলা হয় সুষম খাদ্য আর ডিমকে বলা হয় পরিপূর্ণ খাদ্য (কমপ্লিট ফুড)। ডিমের মত এমন একটি খাদ্য পৃথিবীতে হয়ত দ্বিতীয়টি নেই।  

আরটিভি’র প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই) জনাব লুৎফর রহমান বলেন- প্রোটিন বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। পুষ্টি ও প্রোটিন সম্পর্কে এবং প্রোটিন ঘাটতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান ও তথ্য প্রবাহে ঘাটতি রয়েছে। গ্রামের মানুষকে সচেতন করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন জনাব লুৎফর। তিনি বলেন- সরকারি গণমাধ্যমগুলোকে এ ধরনের কাজে আরও বেশি যুক্ত করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারনা চালাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসতে পারেন।

কর্মশালাটিতে সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী, ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ফেলো এবং পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টরা অংশগ্রহণ করেন। অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক কালের কন্ঠের বার্তা সম্পাদক জনাব খায়রুল বাশার শামীম, বৈশাখী টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক জনাব জতির্ময় নন্দী, সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক শাহানাজ বেগম ও মনিরুল হক, এনিমেল হেলথ কোম্পানীজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আহকাব) সভাপতি জনাব এ.কে.এম আলমগীর, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর মহাসচিব জনাব সাইদুর রহমান বাবু, বাফিটা’র সাধারন সম্পাদক জনাব হেলাল উদ্দীন, বিপিআইসিসি’র সচিব জনাব দেবাশিস নাগ, উপদেষ্টা জনাব শ্যামল কান্তি ঘোষ, মিডিয়া উপদেষ্টা জনাব মো. সাজ্জাদ হোসেন প্রমুখ।-সংবাদ বিজ্ঞপ্তি