Friday, 15 December 2017

 

মানসম্মত ফিড তৈরিতে আমরা বদ্ধপরিকর-মসিউর রহমান

কৃষি ফোকাস ডেস্ক:বিগত দিনগুলোর তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের ফিড ইন্ডাষ্ট্রি অনেক আধুনিক। ফিড ফরমুলেশন থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ব্যবহার সবক্ষেত্রেই আমুল পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমরা অনেক এগিয়ে আছি। আজ রাজধানীর একটি হোটেলে ফিড ইন্ডাষ্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) এবং ইউ.এস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (ইউ.এস.এস.ই.সি) আয়োজিত “মৎস্য খাদ্য আইন ও বিধিমালা” বিষয়ক একটি কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিআব সভাপতি মসিউর রহমান এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন-এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের ফিডের সুনাম আছে। আমরা চাই সারা পৃথিবী আমাদের ফিডের সুনাম করুক। তাই মানসম্মত ফিড তৈরির ব্যাপারে আমরা বদ্ধ পরিকর।

জনাব মসিউর বলেন- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে মৎস্য ও পশুখাদ্য আইন এবং ২০১১ সালে ‘মৎস্য খাদ্য বিধিমালা’ প্রণয়ন করেছেন। এ বিধিমালায় নির্ধারিত মান অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার মাছের খাদ্য উৎপাদনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ বিধিমালা সঠিকভাবে পালন হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সরকার, তার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করেছে। তিনি বলেন- পোল্ট্রি এবং ফিস ফিড সংক্রান্ত বেশ কিছু ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের সাথে কাজ করছে ফিআব। এর পাশাপাশি পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল আমদানিতে যে সকল শুল্ক, এআইটি, এটিভি, ভ্যাট, ইত্যাদি আরোপ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কাজ করছে বিপিআইসিসি।

জনাব মসিউর আরো বলেন- সরকারের পাশাপাশি বিদেশী ক্রেতারাও ফিডের মান পরীক্ষা করে থাকেন-বিশেষ করে চিংড়ির ক্ষেত্রে। যেহেতু চিংড়ি রফতানি হয়; তাই কমপ্লায়েন্স একটা বড় ইস্যু। সে কারণে শুধু মাছ নয়, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা প্রায়শই আমাদের ফিড মিলগুলোও ভিজিট করেন। এ ধরনের মনিটরিং ফিডের মান উন্নয়নে যথেষ্ঠ সহায়ক হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জনাব মসিউর। তিনি বলেন- আমরা ফিআব সদস্যভুক্ত প্রতিটি ফিড মিলে উৎপাদিত ফিডকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চাই। সে কারণেই দক্ষতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

জনাব মসিউর জানান- সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক আদেশের মাধ্যমে ফিড উৎপাদনকারি সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের পাশাপাশি ফিআব এ সদস্যভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কাজেই যে সব ফিড মিল এখনও ফিআব এ নিবন্ধিত হয়নি, সেগুলোকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই নিবন্ধিত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অনিবন্ধিত ফিড মিলগুলোকে তাদের কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মান-সম্মত ফিড উৎপাদনে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান জনাব মসিউর। তিনি জানান-পোল্ট্রি খাদ্য উপকরণের পুষ্টি মান বিষয়ে সরকার প্রণিত তফসিলে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। এ বিষয়ে ফিআব একটি সুপারিশমালা মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে।

ইউ.এস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (ইউএসএসইসি) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন প্যাম হেল্মসিং (Pam Helmsing). বিশ্বজুড়ে ইউ.এস সয়াবিনের প্রসার, পণ্যের মানোন্নয়নে গবেষণা এবং সয়া খামারিরা আন্তর্জাতিক মানের সয়াবিন উৎপাদনে কীভাবে কাজ করেন সে বিষয়ে অংশগ্রহণকারিদের অবহিত করেন প্যাম। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে ইউএসএসইসি -এর কার্যক্রম এবং আগামীতে সংগঠনটির পরিকল্পনা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করেন মিজ প্যাম।      

ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার (ইউ.এস.এ.ডি) এর প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট লি গ্রস বলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় মূল্যবান কৃষি পণ্য হচ্ছে মাছ। এটি প্রাণিজ আমিষের অন্যতম একটি উৎস। তিনি বলেন- যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত সয়াবিন উন্নতমানের ফিড উৎপাদনে সহায়তা করছে। মিষ্টার গ্রস বলেন-সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক পিলেট ফিস ফিডের উৎপাদন ও এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ফিস এন্ড আইওয়া স্টেট রিপোর্ট এর কথা উল্লেখ করে গ্রস বলেন-এ পরিমান বছরে প্রায় ১০ লাখ টন।     

কর্মশালায় রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ইউএসএসইসি কনসালট্যান্ট মার্ক নিউম্যান। "Using Soybean Meal as the Protein Source in Aqua Feeds" শীর্ষক একটি পেপার উপস্থাপন করেন মিস্টার নিউম্যান। প্রশ্ন-উত্তর পর্বে তিনি বলেন-বোনমিল ব্যবহারের কিছু নেতিবাচক প্রভাব আছে। তাছাড়া এতে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অ্যাশ থাকতে পারে। তিনি বলেন-প্রোটিন চাহিদা পূরণে, বিশেষ করে তেলাপিয়াসহ কার্প জাতীয় মাছের প্রোটিন চাহিদা পূরণে ফিস ফিডে ৫৬শতাংশ পর্যন্ত সয়ামিল ব্যবহার করা যেতে পারে।

মৎস্য খাদ্য আইন ও বিধিমালা বিষয়ে আলোচনা করেন মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক জনাব রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন-নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ হিসেবে মাছের উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং ফিডের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর কাজ করছে। ফিড ইন্ডাষ্ট্রি’র সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে জনাব রফিক সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সাথে কিছু ছোট ফিড কারখানার সাধারন কিছু বিচ্যুতি তুলে ধরে সেগুলো সরকারের দেয়া নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত করার তাগিদ দেন। আমদানিকৃত কাঁচামালের মান নিশ্চিত করা এবং অপমিশ্রণ/ভেজাল প্রতিরোধে সরকারের বিধানও তুলে ধরেন জনাব রফিক। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে কিছু সংশোধনী আসবে বলেও জানান তিনি।

উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা বলেন-‘ল্যাবরেটরি’র কথা বলা হলেও সরকারি নির্দেশনায় ‘স্টান্ডার্ড ল্যাবে’র কোন স্পেশিফিকেশন নেই। অভিযোগ করে বলা হয় ফিড উৎপাদন, বিপনন, আমদানি-রফতানির জন্য আলাদা আলাদা লাইসেন্স, জটিলতার সৃষ্টি করছে। অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তারাও সঠিকভাবে বলতে পারেন না আসলেই কয়টা লাইসেন্স লাগবে। কাজেই বিষয়টির সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আইনে বিভিন্ন ধরনের ফিডের বিষয়ে উল্লেখ আছে কিন্তু কোন্ সাইজ বা বয়সের মাছের জন্য কোন্ ফিড প্রযোজ্য হবে তার উল্লেখ নেই। ফিডে ব্যবহৃত উপকরনে ক্রোমিয়ামের সর্বোচ্চ পরিমানের উল্লেখ আছে কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া কাঁচামাল যেমন- সয়াবিন, ভূট্টা, ইত্যাদি গবেষণা করে দেখা গেছে ক্রোমিয়াল লেবেল প্রেসক্রাইবড লেবেল থেকে বেশি। কাজেই ক্রোমিয়াম লেবেল বিষয়ে সংশোষধনী প্রয়োজন।

আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা আরো বলেন-ডাইজেস্টিবিলিটির উপর ভিত্তি করেই উপকরনের শতকরা হার নির্ধারণ করা উচিত। ফিড তৈরির ৭ দিনের মধ্যে সরকারি ল্যাবে নমুনা পাঠানো এবং অনূর্ধ ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার বিধান থাকলেও রিপোর্ট পেতে কখনও কখনও দেড় থেকে দু’মাস এমনকি এরচেয়েও বেশি সময় লেগে যায়। সে কারণে ল্যাব এবং টেকনিশিয়ানের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। একই সাথে প্রি-নার্সারি ফিড এবং চিংড়ি, পাঙ্গাস, রুই ইত্যাদি মাছের ক্ষেত্রে ব্রুড ফিডকে অন্তর্ভূক্ত করার এবং এ ধরনের ফিডের স্পেশিফিকেশন আইনে উল্লেখ করার সুপারিশ করা হয়। প্রতিটি জেলায় সরকারি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা সে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচরে আনার অনুরোধ জানান অংশগ্রহণকারিরা।

দিনব্যাপী কর্মশালার সমাপনী ঘোষণা করেন-বিপিআইসিসি’র উপদেষ্টা শ্যামল কান্তি ঘোষ। কর্মশালায় মোট ২৬টি কোম্পানীর ম্যানেজমেন্ট ও ফিড ম্যানুফ্যাকচারিং এর সাথে জড়িত টেকনিক্যাল পারসন অংশগ্রহণ করেন।

কোম্পানীগুলো হচ্ছে- প্যারাগন, আফতাব, নারিশ, স্পেকট্রা হেক্সা, কোয়ালিটি, কাজী, সিপি-বাংলাদেশ, এসিআই, আগাতা, বেঙ্গল ফিড, আরআরপি এগ্রো, এআইটি, এডভান্স পোল্ট্রি, এগ্রোটেক, পাওয়ার ফিস এন্ড পোল্ট্রি ফিড, রূপসী ফিস ফিড, এসবি, এলিয়া, এজি এগ্রো, আমান ফিড, লায়ন ফিডস, সুগুনা, এস.এম.এস ফিডস, সিটি ফিড, পদ্মা ফিড এবং তামিম এগ্রো। এছাড়াও বাংলাদেশ শ্রিম্প এন্ড ফিস ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ল্ড ফিস, এগ্রো সলিউশন, ইউএসডিএ, ইউ.এস.এস.ই.সি, বিপিআইসিসি, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ফিড ইন্ডাষ্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিসহ মোট ৬৩ জন এ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।-সংবাদ বিজ্ঞপ্তি