Saturday, 23 September 2017

 

কোরবানির পশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও কোরবানির প্রস্তুতি

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ:রাত পোহালেই দেশে পালিত হবে পবিত্র ঈদুল আযহা। আমাদের দেশে একদিনে অর্থাৎ পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে প্রায় তিন মিলিয়ন (৩০ লাখ) পশু জবাই হয়ে থাকে। এতো কম সময়ের ব্যবধানে এ বিশাল পরিমাণ পশু জবাই করার রেকর্ড সম্ভবত: পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন দেশে নেই। আমাদের দেশে মূলত গরু, ছাগল, ভেড়া এসব পশুই কোরবানি দেওয়া হয়ে থাকে। কোরবানি মানে ত্যাগ বা উৎসর্গ। যা শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক।

কোরবানি করতে গিয়ে প্রত্যেকের কতগুলো বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া উচিত। উৎসর্গকে মহিমান্বিত করতে, আরোও অধিকতর বিশুদ্ধ করতে কোরবানির পশুর সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা, বিশেষ পদ্ধতিতে পশুকে মাটিতে ফেলা ও নিয়ন্ত্রণ, চামড়া ছাড়ানো, চামড়া সংরক্ষণ, বর্জ্য পরিষ্কার ও ব্যবস্থাপনা এবং জবাই করার জায়গা ও তার আশপাশের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত রাখার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। কোরবানির মত মহৎ কাজটি করতে গিয়ে যদি নানা ধরনের বিপদ বিপত্তি, অব্যবস্থাপনা এমনকি পরিবেশ দূষিত হয়ে অসুখ বিসুখের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তা নেহায়েৎ কাম্য নয়। তাই আমার অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে কতিপয় অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে নিচে বিশদ আলোচনা করা হলো।

কোরবানির পশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও প্রস্তুতিমূলক করণীয় বিষয়াদি
ক্রয়কৃত পশুটিকে ছায়াচ্ছন্ন, শীতল স্থান ও শান্ত পরিবেশে রাখা দরকার। তাছাড়া পশুটিকে স্বতন্ত্রভাবে বা এককভাবে রাখা উচিত। কোরবানির দিনের আগের দিনের রাত হতে খাবার দেওয়া বন্ধ করা উত্তম। তবে জবাইয়ের ১২ ঘন্টা পূর্বে থেকে অবশ্যই কোন খাবার দেওয়া ঠিক হবে না। তবে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানি পান করাতে পারেন। জবাইয়ের পূর্বে পশুটিকে পর্যাপ্ত পরিমান বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। জবাইয়ের পূর্বে ভালোভাবে গোসল করানো উচিত। শরীর পরিষ্কারের পাশাপাশি শুকনা হওয়ার জন্য কোরবানির দিন সকালে গোছল করানো উত্তম।

জবাইয়ের স্থান নির্বাচন ও জবাই ব্যবস্থাপনা কৌশল
জবাইয়ের স্থানটি সমতল বা সমান হওয়া উচিত। স্থানটি খুব শক্ত বা পাকা হওয়া উচিত হবে না। জবাইয়ের পূর্বে স্থানটি অবশ্যই পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করে নিতে হবে। জবাইয়ের স্থানের পাশে রক্ত জমা হওয়ার জন্য একটি ছোট গর্ত খুড়ে নিলে ভাল হয়। জবাইয়ের পরপরই রক্ত ভর্তি গর্তটি মাটি দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। জবাইয়ের পূর্বে প্রাণিটিকে বাম পাশে শুয়াতে হবে। কারণ প্রাণির ডানপাশে যকৃত বা লিভার থাকে। কোন কারণে ডানপাশে ধপাশ করে ফেলে দিলে, শরীরের চাপে যকৃতে আঘাত লাগতে পারে এমনকি প্রাণিটি মারা যেতে পারে।

শোয়ানো অবস্থায় প্রাণিটির পেটে বেশি জোরে চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। গরুকে দড়ি দিয়ে প্যাচ দিয়ে মাটিতে ফেলার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। এই পদ্ধতিতে প্রথমে একটি লম্বা মোটা শক্ত দড়ির এক প্রান্ত দিয়ে দুই শিং বেঁধে পরে স্কন্ধ বা শোল্ডারের ঠিক সন্মুখ ও পেছনে মোট দুটি এবং টিউবার কক্সির ঠিক সামনে একটি ফাঁস বা পেঁচিয়ে পেছনের দিক থেকে টানলেই গরু মাটিতে পড়ে যাবে। পরে মাটিতে শোয়ানো প্রাণিটির চারটি পা একত্রে বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করে জবাই এর কাজ শুরু করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় সহজেই প্রাণিটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই পদ্ধতিটিকে হাটউইপ’স পদ্ধতি বলে। তাই জোর জবরদস্তি করে প্রাণিটিকে কষ্ট দিয়ে মাটিতে শোয়ানোর চেষ্টা না করে বৈজ্ঞানিক এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে পারেন। প্রাণিটি মাটিতে শোয়ানোর পর যথাসম্ভব খুব দ্রুত জবাই করতে হবে। জবাইয়ের সময় অবশ্যই ধারালো ছুরি ব্যবহার করা উচিত। এতে জবাই প্রক্রিয়া সহজ হবে ও পশু কম কষ্ট পাবে।

-লেখক: আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।