Friday, 15 December 2017

 

ফসল উৎপাদনে সবুজ কৃষি প্রযুক্তি

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ:আর্থিক ক্ষতি কমানো, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন-এখন সময়ের দাবি। তাছাড়া আধুনিক কৃষির জন্য চ্যালেঞ্জ ও বটে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার লক্ষে নিরলস পরিশ্রমে নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। কৃষি কর্মীরা এ সব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে দ্রুতই ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সুফল ভোগ করছেন কৃষকরা। রক্ষা পাচ্ছে নির্মল পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সবুজ প্রযুক্তির মধ্যে পার্চিং অন্যতম। তাছাড়া আলোক ফাঁদ প্রযুক্তিটিও অনেক আগে থেকেই একটা জায়গা দখল করে আছে। তাই এই দুটো সবুজ প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করব।

 

পার্চিং
ইংরেজি শব্দ পার্চ মানে হলো উঁচু স্থানে বসা। জমিতে উঁচু স্থানে পাখি বসার সুযোগ তৈরি করাই পার্চিং। উঁচু স্থান তৈরি করার ক্ষেত্রে বাঁশের কঞ্চি, গাছের ডালপালা, ধৈঞ্চা গাছ এসব ব্যবহার করা যায়। পার্চিং পোকা দমনের একটি যান্ত্রিক পদ্ধতি। আইপিএম কৌশলের অন্যতম সবুজ প্রযুক্তি পার্চিং খুবই সহজ, কম খরচ ও পরিবেশবান্ধক পোকা মাকড় দমনের প্রযুক্তি।

পার্চিং এর উদ্দেশ্য: পোকা ধরে খাওয়ার জন্য পাখিকে বসার জন্য জায়গার ব্যবস্থা করাই মূল উদ্দেশ্য। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায়। ফসলের উৎপাদন খরচ কমে। বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা যায়। তাছাড়া পার্চিং এর মাধ্যমে পোকার বংশবিস্তার কমানো যায়। সহজেই পোকার বসতি ধ্বংস করা যায়। এমনকি পোকার বসতি তৈরি করার সুযোগ নষ্ট করা যায়।

পার্চিং এর প্রকারভদ: দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমত মৃত: বাঁশের কঞ্চি, গাছের ডালপালা এসব। দ্বিতীয়ত জীবন্ত: ধৈঞ্চা গাছ। জীবন্ত পার্চিং এর ক্ষেত্রে আফ্রিকান ধৈঞ্চা খুবই উপকারি। বাংলাদেশে বহুলভাবে চাষকৃত আফ্রিকান ধৈঞ্চা পার্চিং হিসেবে পোকা দমন করে। ধৈঞ্চা গাছে বসে পাখি দুল খেতে পছন্দ করে। ধৈঞ্চা গাছের পাতা, নডিউল এবং পাখির বিষ্টা জমিতে বাড়তি জৈব সার যোগাতে সহযোগিতা করে। একমাস বয়সী ধৈঞ্চা গাছ ফসলের মূল জমিতে লাগানো উচিত। ফসলের উচ্চতা থেকে কমপক্ষে একফুট উচ্চতায় পার্চিং এ বসার স্থান ব্যবস্থা করা উচিত।

পার্চিং এর সংখ্যা: সাধারণত বন্ধু পোকা মাকড়গুলো খাবার সংগ্রহের জন্য বেশি বেশি নড়াচড়া ও চলাফেরা করে। অন্যদিকে ক্ষতিকর পোকা মাকড় চুপচাপ বসে রস চুষে খায় বা ফসল কেটে কেটে বা কুড়ে কুড়ে খায়। এসব চুপচাপ ক্ষতিকর পোকা ধরে খাওয়ার জন্যই একটু ঘন ঘন পার্চিং দেয়া হয়। পাখি যেন সহজেই ক্ষতিকর পোকা মাকড়দের দেখতে পায় এবং ধরতে পারে। ধান ফসলে প্রতি ০৫ শতকে ০১ টি করে পার্চিং ব্যবহার করতে হয়। যা বিঘায় প্রায় ০৬ টি। এভাবে একর প্রতি প্রায় ১৮ টি থেকে ২০ টি পার্চিং ব্যবহার করতে হয়।

পার্চিং স্থাপনের সময়: ফসল রোপনের পরপরই পার্চিং স্থাপন করতে হবে। যে সব এলাকায় বাবুই পাখি, চড়–ই পাখি, টিয়া পাখি আছে, সেসব এলাকায় চাষকৃত ধানের পাকা স্তরে পার্চিং তুলে নিতে হবে। অন্যথায় পার্চিং তুলে ফেলার দরকার নেই।

পার্চিং এ বসে দোল খেতে খেতে পাখিরা আরামে পোকা ধরে খায়। সব পাখিরাই কিন্তু পার্চিং-এ বসে না। মূলত ফিঙ্গে, শালিক, বুলবুলি, শ্যামা, দোয়েল, সাত ভায়রা এসব পাখিরা পার্চিং এ বসে পোকা ধরে খায়। এক গবেষণায় জানা যায়, একটি ফিঙে পাখি সারা দিনে অন্তত: ৩০ টি করে মাজরা পোকার মথ, ডিম, কীড়া ও পুত্তলী খেয়ে থাকে। একটি পাখির দ্বারা প্রতি মাসে কমপক্ষে ২ লাখ ৭০ হাজার পোকা ধ্বংস করা সম্ভব হয়। (পাক্ষিক কৃষি প্রযুক্তি কার্তিক ২য় পক্ষ ১৪২১ এ প্রকাশিত তথ্য)।

পার্চিং এ যে সব পোকা-মাকড় নিয়ন্ত্রন হয়: পাখিরা মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা, ধানের স্কিপার পোকার মথ ধরে ধরে খায়। লার্ভা বা কীড়াগুলোর মধ্যে শিষ কাটা লেদা পোকা, সবুজ শুড় লেদা পোকার কীড়া খায়। খাটো শুড় ঘাস ফড়িং, লম্বা শুড় ঘাস ফড়িং, উড়চুঙ্গা এসব ফড়িং গুলোও খায়। তাছাড়া পাখিরা বন্ধু পোকাগুলোর মধ্যে লেডি বার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটল এসব পোকাও খায়।

আলোক ফাঁদ

আলোক ফাঁদ: আলো সংবেদনশীল বা আকৃষ্ট হয় এমন পোকাকে আকৃষ্ট করাকে লাইট ট্র্যাপ বা আলোক ফাঁদ বলে। ইহা ফসলের মাঠে পোকামাকড়ের উপস্থিতি যাচাই এবং নিয়ন্ত্রণ করার একটি পরিবেশবান্ধব কৌশল। আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পোকা মাকড় উড়ে এসে আলোর উৎসের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। এক পর্যায়ে নিচে ডিটারজেন্ট ও কেরোসিন মিশ্রিত পানির পাত্রে পরে যায়। পানির পাত্রের পরিবর্তে আঠা মিশ্রিত সাদা বা রঙ্গিন শক্ত কাগজও ব্যবহার করা যেতে পারে।

আলোক ফাঁদ এর উদ্দেশ্য: আলোক ফাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। পোকার উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে বালাই ব্যবস্থাপনা নেয়া। শত্রু পোকার বংশ বিস্তার কমিয়ে আনা। এতে শত্রু পোকা নিয়ন্ত্রণের একটা মোক্ষম উপায়। সুনির্দিষ্ট পোকা কেন্দ্রিক সঠিক বালাই ব্যবস্থাপনা করা। এতে কীটনাশক ব্যবহার কমানো যায়। ফলে খরচ কমার সাথে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়। সর্বোপরি জীব বৈচিত্র্য রক্ষা পায়।

আলোক ফাঁদ স্থাপনের উপকরণসমূহ: আলোর উৎস হিসেবে হারিকেন, হ্যাজাক বাতি বা ফ্লোরোসেন্ট লাইট। সাধারন বাল্বও ব্যবহার করা যায়। বাঁশের তিনটি খুঁটি। একটি ডিশ বা গামলা। সামান্য পরিমাণ ডিটারজেন্ট পাউডার ও অল্প পরিমাণ কেরোসিন।

আলোক ফাঁদ স্থাপনের কৌশল: ত্রিকোণাকার করে তিনটি খুঁটি মাটিতে স্থাপন করতে হবে। খুঁটি তিনটি উপরের অংশ একই পয়েন্ট বা জায়গায় ভালোভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। খুঁটি তিনটির মিলিত জায়গা থেকে লাইট বা আলোর উৎসটি আটকাতে হবে। লাইট বা আলোক ফাঁদের আলোর উৎসটি ফসলের ক্যানোপি বা উপরি অংশ থেকে ২ থেকে ৩ ফুট উপরে থাকতে হবে। ডিটারজেন্ট ও কেরোসিন মিশ্রিত পানির পাত্র বা গামলাটি আলোর উৎসের নিচে বসাতে হবে। একটু ফেনা উঠা পরিমাণ ডিটারজেন্ট হলেই চলবে। আর এক বা দুই ফোঁটা কেরোসিন দিলেই হবে। এভাবেই আলোক ফাঁদ তৈরি করতে হবে।

আলোক ফাঁদ স্থাপনের সময় ও স্থান: ফসলি জমি বা ফসল থেকে একটু দূরে আলোক ফাঁদ বসাতে হবে। এক্ষেত্রে ৫০ মিটার থেকে ২০০ মিটার এর মধ্যে স্থাপন করা ভালো। সাধারণত জমির ভিতরে আলোক ফাঁদ স্থাপন করতে নেই। তবে ফাঁদ বসানোর মত কোন জায়গা না থাকলে জমির ভিতরে স্থাপন করা যাবে। মনে রাখতে হবে, ঐ দিনই ফাঁদের কাছাকাছি জায়গায় উপযুক্ত কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। ঠিক সূর্যাস্থের আধা ঘন্টা পর থেকে পরবর্তী ২ থেকে ৩ ঘন্টা এর মধ্যে আলোক ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। আলোক ফাঁদ কমপক্ষে আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা পর্যন্ত রাখতে হবে। জমিতে পোকামাকড়ের উপস্থিতি ও তীব্রতার উপর আলোক ফাঁদ স্থাপন নির্ভর করে। পোকা মাকড় বেশি হলে প্রতিদিন ব্যবহার করা ভালো। তবে মাঠে সকল কৃষক ভাইয়েরা মিলে একই সাথে ফাঁদ স্থাপন করলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।

যে সব পোকা আলোক ফাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হয়: পূর্ণাঙ্গ পোকারাই আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়। আলোক ফাঁদে ক্ষতিকর পোকার মথ যেমন মাজরা পোকা, চুঙ্গি পোকা, পাতা মোড়ানো, বিছা পোকা, সোর্য়ামিং ক্যাটারপিলার গুলো আসে। তাছাড়া নলি মাছি, বাদামী গাছ ফড়িং, সাদা পীট গাছ ফড়িং, গ্রিন লিফ হোপার(সবুজ পাতা ফড়িং), হোয়াইট লিফ হোপার (সাদা পাতা ফড়িং), গান্ধি পোকা এসব পোকা আলোক ফাঁদ দ্বারা দমন করা যায়।

পোকা মাকড় ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই বলে বোকার মতো কীটনাশক ব্যবহার করলে চলবে না। বরং সমকালীন চাষাবাদ, ক্লাব গঠন, সমিতি গঠন এমনকি সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করে বালাই দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। সময়ের সাথে কৃষির উপকরণ, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কৃষির উৎপাদন খরচও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। অবিবেচকের মত বালাইনাশক ব্যবহার খরচকে আরোও বাড়িয়ে দেয়।

অজৈব বা রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থা মাঠে খুব দ্রুত কাজ করে। কিন্তু ফসল, পরিবেশ এমনকি জীব বৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। সবুজ কৃষি প্রযুক্তিগুলো মাঠ ফসলে আস্তে আস্তে কাজ করলেও ইহা পরিবেশবান্ধব এবং স্থায়িত্বশীল। তাই সবাইকে সবুজ কৃষি প্রযুক্তি যথা পার্চিং ও আলোক ফাঁদসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগুলো মাঠে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে ও বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন করতে পারব।
লেখক: আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।