Thursday, 23 November 2017

 

অধিক ফলনের জন্য ডলোচুনের ব্যবহার

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ: ফসল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো মাটি। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগকে আমরা মাটি বলে থাকি। খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বাযু ও পানি সমন্বয়ে গঠিত হয় মাটি। মাটির উপরিভাগের প্রায় ১ মিটার পর্যন্ত ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তার সুষ্ঠু ব্যবহারও অনেকাংশে মানুষের ওপরই নির্ভরশীল। মাটি আমাদের অমূল্য সম্পদ। মাটির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাকে উর্বরতা বলা হয়। ফসলের ভালো ফলন মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভরশীল। তাই উর্বর মাটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই মাটিকে উৎপাদনশীল রাখতে হলে এর উর্বরতা বজায় রাখা ও উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের বেশ যত্নবান হতে হবে।

মাটির অম্লমান বা পিএইচ দ্বারা মাটির অম্লত্বের তীব্রতা নির্ধারণ করা হয়। মাটির অম্লমান সর্বাধিক ১৪ পর্যন্ত হতে পারে। মাটির অম্লমান ৭ এর নিচে হলে তা অম্লীয় মাটি এবং ৭ এর উপরে হলে তা ক্ষারীয় মাটি। অম্লমান ৭ থেকে যত কমতে থাকবে মাটি তত বেশী অম্লীয় হবে। মাটির অম্লমান ৫.৫ বা এর কম হলে তা তীব্র অম্লীয় মাটি।

বাংলাদেশ একটি কৃষিভিত্তিক জনবহুল দেশ। প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কমে যাচ্ছে কৃষি জমি। বাড়তি জনমানুষের মুখে দু বেলা দু মুটো খাবার তুলে দেয়ার জন্য কৃষকরা একই জমিতে বছরে দুটি, তিনটি এমনকি চারটি ফসলও চাষ করছে। পক্ষান্তরে কৃষকরা সুষম মাত্রায় সার ও জৈব সার সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন না। ফলে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাটির অম্লত্ব বা এসিডিটি। এসিডিক মাটি বা অম্লযুক্ত মাটিতে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, মলিবডেনাম এর সহজলভ্যতা হ্রাস পায় তাছাড়া মাটিতে এ্যালুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও আয়রণের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পায়। ফলে ফসলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয়, ফলন হ্রাস পায় ও গুণগতমান নষ্ট হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর ফসলি মাটি তীব্র এসিড বা অম্ল মাটি যার পিএইচ মান ৫.৫ এর নিচে। এ সকল মাটিকে এসিডযুক্ত অসুস্থ মাটি বলে। বৃহত্তর রংপুর, বৃহত্তর দিনাজপুর, বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর চট্রগ্রাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় তীব্র এসিডযুক্ত মাটি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় গম গবেষণা কেন্দ্র, বারি,নশিপুর,দিনাজপুর এর দীর্ঘ ১০ বছর গবেষণার পর তীব্র অম্লযুক্ত মাটিকে সংশোধন করার জন্য ডলোচুন ব্যবহারের মাত্রা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়। গবেষণা ফলাফল অনুযায়ী আমাদের দেশের তীব্র অম্লীয় মাটিতে সুপারিশকৃত মাত্রায় ডলোচুন ব্যবহার করা হলে বছরে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৬৫ লক্ষ টন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।

ডলোচুন

ডলোচুন হলো একধরনের সাদা পাউডার জাতীয় দ্রব্য। আমরা ভিন্ন ভিন্ন নামে যেমন ডলোচুন, ডলোঅক্সিচুন বা ডলোমাইট পাউডার হিসেবে পেয়ে থাকি। সুপারিশকৃত মাত্রায় ডলোচুন ব্যবহার করলে তীব্র অম্লীয় মাটিকে সংশোধন করা যায়। ডলোচুনে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে যা তীব্র অম্লীয় মাটির অম্লত্ব হ্রাস করতে সাহায্য করে।

ডলোচুনের সুপারিশকৃত মাত্রা

অধিক ফসলের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশকৃত মাত্রা খুবই জরুরী। অধিক অম্লীয় মাটিতে সুপারিশকৃত মাত্রা হলো শতকে ০৪ কেজি বা একরে ৪০০ কেজি বা হেক্টরে ১০০০ কেজি। কোনোভাবেই এর মাত্রা কম বেশি করা যাবে না। কোনো জমিতে একবার ডলোচুন প্রয়োগ করলে পরবর্তীতে তিন বছর আর ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয় না।

ডলোচুন ব্যবহারের নিয়ম

কোনো জমিতে ডলোচুন প্রয়োগের পূর্বে সুপারিশকৃত মাত্রানুযায়ী মোট ডলোচুনকে সমান দুভাগে ভাগ করে নিতে হবে। জমির মাটিতে জো থাকা অবস্থায় উত্তর-দক্ষিণ বরাবরে অর্ধেক পরিমাণ ডলোচুন ছিটিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক পরিমাণ ডলোচুন পূবর্- পশ্চিম বরাবর বা আড়াআড়িভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইহা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অত:পর কমপক্ষে ৭ দিন পর জমিতে প্রয়োজনীয় চাষ ও মই দিয়ে ফসল বুনতে বা গাছ রোপন করতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বীজ বপন করলে বীজের অঙ্কুরোদগমের হার কমে যেতে পারে বা অঙ্কুরিত গাছের মূল ও কান্ডের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। জমি যদি শুকনা হয় বা রস কম থাকে তাহলে ডলোচুন ব্যবহারের নিয়ম হলো ফাঁকা জমিতে প্রয়োজন মত ডলোচুন আড়াআড়িভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর চাষ দিতে হবে। মই দিয়ে সমান করতে হবে। সাথে হালকা সেচ দিতে হবে। অত:পর কমপক্ষে ৭ দিন পর জমিতে প্রয়োজনীয় চাষ ও মই দিয়ে ফসল বুনতে বা গাছ রোপন করতে হবে।

ডলোচুন প্রয়োগের মৌসুম ও কোন কোন ফসলী জমিতে ব্যবহার করা যায়

সাধারণত বছরের যে কোন সময়ে ডলোচুন প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে আমন ধান কাটার পরে ফাঁকা জমিতে বা রবি মৌসুমে ডলোচুন প্রয়োগের উত্তম সময়। ডলোচুন যেহেতু মাটির এসিডিটি বা অম্লতা সংশোধন করে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করে, ফসল উৎপাদন উপযোগী করে তোলে তাই সব ধরণের ফসল গম, ভূট্রা, আলু, সরিষা, পাট, ডাল জাতীয় ফসল, তৈল জাতীয় ফসল, মসলা জাতীয় ফসল এবং শাক সবজি জাতীয় ফসলের ফলন বৃদ্ধি ও গুণগতমানের ফসল পাওয়ার জন্য অম্লীয় বা গ্যাস্ট্রিকযুক্ত মাটিতে ডলোচুন ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডলোচুন প্রয়োগের সুবিধাসমূহ

ডলোচুন প্রয়োগ করা সহজ, খরচ কম কৃষকের হাতের নাগালে। গম, ভূট্রা, আলু, সরিষা, ডাল, মসলা ও সবজি জাতীয় ফসলের ফলন শতকরা ১০-৫০% বৃদ্ধি পায়। ডলোচুন একবার প্রয়োগ করলে পরবর্তীতে তিনবছর প্রয়োগ করতে হয় না।  ডলোচুন একবার প্রয়োগ করলে ম্যাগনেসিয়াম সারের প্রয়োজন হয় না।  ফসলের গুণগত মান বৃদ্ধি পায় যেমন আলুর স্কেব রোগ কম হয়, সবজি ফসলের রং উজ্জল হয়, পাটের কালো পট্রি রোগ কম হয়। ফসলের বৃদ্ধি সমান হয়।

বিশ টাকার মাধ্যমে মাটির অম্লত্ব পরীক্ষা

বাংলাদেশের সকল মাটিই অম্লীয় নয়। তাই তীব্র এসিডিক বা অম্লীয় আক্রান্ত জমি বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য কৃষক নিজে ইচ্ছা করলে তার জমি তীব্র অম্লযুক্ত কিনা তা মাত্র বিশ টাকায় পরীক্ষা করে নিতে পারে। সেজন্য  কৃষকের মূল জমির এককোণায় ফিতা দ্বারা মেপে মাত্র একশতক জমি চিহ্নিত করতে হবে। অত:পর চিহ্নিত একশতক জমিতে মাত্র বিশটাকা দিয়ে কেনা চার কেজি ডলোচুন নিয়ম মোতাবেক ব্যবহার করতে হবে। তারপর ফসল চাষ করবে এবং অন্যান্য সকল ব্যবস্থাপনা একই হবে। পরবর্তীতে ফসলের বৃদ্ধি এবং ফলনে যদি তারতম্য হয় তাহলে বুঝতে হবে জমিতে গ্যাস্ট্রিক রোগ আছে অর্থাৎ জমির মাটি অম্লীয়। পরীক্ষণটি করতে মাত্র দাম ২০ টাকা দরকর হয় বলে এর নাম দেওয়া হয় ২০ টাকার পরীক্ষা।   

ডলোচুন ব্যবহারে সাবধানতা

ডলোচুন ব্যবহারে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।  সুপারিশকৃত মাত্রার অধিক পরিমাণ ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না। ডলোচুন প্রয়োগের সাথে সাথে চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।  মাঠে ফসল আছে এমন অবস্থায় ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না। বেশি বাতাসের সময় ডলোচুন মাটিতে ছিটানো যাবে না। জমির দাড়ানো পানিতে বা কাদা অবস্থায় ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না।

ফসল উৎপাদনে হাজারো সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো মাটির তীব্র অম্লতা বা এসিডিটি বা গ্যাস্টিক সমস্যা। এই সমস্যা সংশোধনের জন্য সঠিকভাবে সুপারিশকৃত মাত্রা ও পদ্ধতিতে ডলোচুনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে, এখনই। তাইতো, সম্মিলিত কন্ঠে মুখরিত হউক-   

“পান খাইতে লাগে চুন, তরকারিতে লাগে নুন
অধিক ফলন পেতে হলে, প্রয়োগ কর ডলোচুন”।
==============================

আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।