Thursday, 23 November 2017

 

সবজির চারা উৎপাদন কলাকৌশল

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ: সবজি অত্যন্ত রুচিশীল, সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার। “সুস্থ সুন্দর দেহমন, হাসিখুশি সারাক্ষন” থাকতে হলে খাবার টেবিলে সবজির বিকল্প নেই। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রায় ২৫০ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। খাদ্য উপাদানের প্রত্যেকটি উপাদান বিভিন্ন সবজির মধ্যে কমবেশি বিদ্যমান। অর্থনৈতিকভাবেও সবজি উৎপাদন খুবই লাভজনক। বাংলাদেশে প্রায় ৮৯ ধরনের শাকসবজি চাষ করা হয়। সবজির ভাল উৎপাদন অনেকাংশে গুণগত মানের চারার উপর নির্ভরশীল। তাই সবজির চারা উৎপাদনের সময় বিশেষ প্রযুক্তি ও কলা কৌশল অনুসরণ করতে হয়।

আমাদের দেশে সাধারণত টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, লাউ, বাঁধাকপি, মরিচ, পেঁয়াজ এসব সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে আগাম শীতকালীন ও রবি মৌসুমের সবজি চাষের জন্য সবজি চারা উৎপাদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। উৎকৃষ্ট মানের সবজিরর চারা উৎপাদনের জন্য প্রচুর দক্ষতা এবং বিশেষ কিছু প্রযুক্তি বিবেচনা করা উচিত।

সবজির বীজ
বিশ্বস্থ ও প্রকৃত বীজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাহিদা মাফিক সঠিক জাতের সবজি বীজ ক্রয় করতে হবে। জাত নির্বাচন ও বীজ ক্রয়ের ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। প্যাকেটের গায়ে বীজের গুণগত মানের কতগুলো তথ্যাদিসহ উক্ত বীজের মেয়াদ স্পষ্ট করে লেখা আছে এমন বীজের প্যাকেট কিনতে হবে। হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

বীজতলার স্থান নির্বাচন
সবজির চারা উৎপাদনের জন্য সঠিক স্থানে বীজতলা তৈরি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বীজতলাকে শিশু চারার বিছানা বলা হয়ে থাকে। নরম, তুলতুলে, পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন ও রোগ জীবাণুমুক্ত বীজতলা সবজি চারা উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই বীজতলা তৈরির স্থান নির্বাচনের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন- অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি, যেখানে বৃষ্টি বা বন্যার পানি জমে না এবং সহজে নিষ্কাশন করা যায়। ছায়াবিহীন, পরিষ্কাার এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের উপযোগী স্থানে বীজতলা করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, বীজতলার কাছাকাছি যেন পানির উৎস থাকে এবং বাড়ি, খামার বা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হলে অফিসের কাছাকাছি হওয়া উচিত। বীজতলার মাটি বেলে দোঁআশ বা দোঁআশ এবং অবশ্যই উর্বর হতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করতে হলে বীজতলা যতদূর সম্ভব ক্রেতাদের কাছাকাছি এবং ভাল যোগাযোগ সম্পন্ন স্থানে স্থাপন করতে হবে।

বীজতলা তৈরী
একক বীজতলা বা হাপোর সাধারণত এক মিটার চওড়া ও তিন মিটার লম্বা হবে। প্রয়োজনে বড় জমিকে ভাগ করে একাধিক বীজতলা তৈরি করা যায়। পাশাপাশি দুটি বীজতলার মধ্যে কমপক্ষে ৬০ সেমি ফাঁকা রাখতে হবে। বীজ বপনের কয়েকদিন আগে বীজতলার মাটি ২০-২৫ সেমি গভীর করে ঝুরঝুরা ও ঢেলা মুক্ত করে তৈরি করতে হবে। বীজতলা সাধারণত ১০-১৫ সেমি উঁচু করে তৈরি করতে হবে। মাটি, বালি ও পঁচা গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেয়াই ভালো। উর্বরতা কম হলে প্রতি হাপোরে ১০০ গ্রাম টিএসপি সার বীজ বপনের অন্তত এক সপ্তাহ আগে ছিটিয়ে দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশাতে হবে। বাণিজ্যিক ভাবে চারা উৎপাদন করতে চাইলে ইট সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ী বীজতলা তৈরি করাই শ্রেয়।

বীজ বপন
বীজ বপনের পূর্বে বীজ পরীক্ষাকরণ, বীজ শোধন ও বীজতলার মাটি শোধন করে নিতে হবে। বীজতলায় সারি বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা যায়, তবে সারিতে বপন করা উত্তম। সারিতে বপনের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট দূরত্বে (৪ সেমি) কাঠি দিয়ে ক্ষুদ্র নালা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। শুকনা মাটিতে বীজ বপন করে সেচ দেয়া উচিত নয়, এতে মাটিতে চটা বেঁধে চারা গজাতে ও বাতাস চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সেচ দেয়া মাটির জো অবস্থা এলে বীজ বপন করতে হয়। যে সমস্ত বীজের আবরণ শক্ত, সহজে পানি প্রবেশ করে না, সেগুলোকে সাধারণত বোনার পূর্বে পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘন্টা অথবা শতকরা এক ভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে এক রাত্রি ভিজিয়ে বপন করতে হয় (যেমন লাউ, চিচিংগা, মিষ্টি কুমড়া, করলা, উচ্ছে ও ঝিংগা ইত্যাদি)।

বীজতলায় আচ্ছাদন ও মশারী
বৃষ্টির পানি ও অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে বীজতলাকে রক্ষা করার জন্য আচ্ছাদন করা যায়। কম খরচে বাঁশের ফালি করে বীজতলায় প্রস্থ বরাবর ৫০ সেমি পরপর পুতে নৌকার ছৈ এর আকার তৈরি করে, বৃষ্টির সময় পলিথিন দিয়ে এবং প্রখর রোদে চাটাই দিয়ে বীজতলার চারা রক্ষা করা যায়। সাধারণত সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণের জন্য বীজতলায় আচ্ছাদনের পাশাপাশি মশারীর ব্যবস্থা করলে খুব ভালো হয়।

চারার যত্নঃ যতনে রতন মিলে। চারা গজানোর পর হালকা ছায়া, পরিকল্পিতভাবে পানি সেচ, চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর দ্বিতীয় বীজতলায় সারি করে রোপন এসব করলে ভালোমানের চারা তৈরি হয়।

দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ
জমিতে চারা লাগানোর পূর্বে মূল বীজতলা থেকে তুলে দ্বিতীয় বীজতলায় সবজি চারা রোপনের পদ্ধতিকে সবজির চারার দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ পদ্ধতি বলে। সাধারণত ১০-১২দিনের চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তরিত করা হলে কপি গোত্রের সবজি, বেগুন ও টমেটো চারা শিকড় বি¯ৃ‘ত ও শক্ত হয়, চারা অধিক সবল ও তেজী হয়। চারা লাগানোর পর হালকা পানি দিতে হবে এবং বৃষ্টির পানি ও প্রখর রোদ থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন বা চাটাই দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

বীজতলায় চারার রোগ দমন
বীজতলায় বপনকৃত বীজ গজানোর পূর্বে এবং পরে রোগাক্রান্ত হতে পারে। তাই আগেই বীজতলার মাটি কাঠের গুড়া পুড়িয়ে, সৌরতাপ, পোল্ট্রি রিফিউজ ও খৈল ব্যবহার করে শোধন করে নিতে হবে। বীজতলার মাটি সুনিষ্কাশিত রাখা রোগ দমনের প্রধান উপায়। প্রতিষেধক হিসেবে মাটিতে কপার অক্সি ক্লোরাইড দুই গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে বীজতলার মাটি ভাল করে ভিজিয়ে কয়েকদিন পর বীজ বপন করতে হবে।

বন্যার সময় বীজতলায় চারা উৎপাদনের জন্য বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে সবজির চারা কাঠের বা প্লাস্টিকের ট্রে, পলিথিনের ব্যাগে, মাটির টবে, গামলায়, থালায়, কলার খোলে উৎপাদন করা যায়। ছোট আকারের পলিথিনের ব্যাগে বা অন্যান্য মাধ্যমে এদের চারা উৎপাদন করলে সহজে শেকড় ও মাটিসহ চারা রোপণ করা যায়। এসব কলাকৌশলগুলো সঠিকভাবে মেনে চললে সবজির সুস্থ সবল চারা উৎপাদন করা সম্ভব।
-লেখক: আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।