Monday, 20 November 2017

 

ধান গাছের ব্লাস্ট রোগ দমনে করণীয়

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান: ব্লাস্ট রোগ বাংলাদেশে ধানের প্রধান রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিবছর আমন ও বোরো মৌসুমে কম-বেশি এ রোগের আক্রমণ দেখা দেয়। এ রোগের আক্রমণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। বর্তমান সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ধানগাছ ব্লাস্ট রোগে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন ধান চাষে সংশ্লিস্টরা। তবে রোগটি সম্পর্কে সচেতন থাকলে এর ভয়াবহতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারেন কৃষক ভাইরা।আর এ রোগটি সম্পর্কে জানিয়েছেন বিজ্ঞানী ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান।

রোগের নাম: ব্লাস্ট রোগ (Blast)। ধান গাছের ৩ টি অংশে রোগটি আক্রমন করে থাকে। গাছের আক্রান্ত অংশের উপর ভিত্তি করে এ রোগ তিনটি নামে পরিচিত যেমন- ১. পাতা ব্লাস্ট, ২. গিট ব্লাস্ট এবং ৩. নেক/শীষ ব্লাস্ট।
রোগের কারণ: পাইরিকুলারিয়া গ্রিসিয়া (Pyricularia grisea) নামক ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার:
এই রোগটি আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই হতে পারে। ধানের চারা অবস্থা থেকে ধান পাকার আগ পর্যন্ত যে কোন সময় এ রোগটি হতে পারে। বীজ, বাতাস, কীট-পতঙ্গ ও আবহাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। রাতে ঠান্ডা, দিনে গরম ও সকালে পাতলা শিশির জমা হলে এ রোগ দ্রুত ছড়ায়। হালকা মাটি বা বেলে মাটি যার পানি ধারণ ক্ষমতা কম সেখানে রোগ বেশী হতে দেখা যায়। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম পটাশ সার দিলে এ রোগের আক্রমণ বেশি হয়। দীর্ঘদিন জমি শুকনা অবস্থায় থাকলেও এ রোগের আক্রমণ হতে পারে।

রোগের লক্ষণ:
১.পাতা ব্লাস্ট

  • পাতায় প্রথমে ডিম্বাকৃতির ছোট ছোট ধূসর বা সাদা বর্ণের দাগ দেখা যায়।
  • দাগগুলোর চারিদিক গাঢ় বাদামী বর্ণের হয়ে থাকে।
  • পরবর্তীতে এ দাগ ধীরে ধীরে বড় হয়ে চোখের আকৃতি ধারণ করে।
  • অনেকগুলি দাগ একত্রে মিশে পুরো পাতাটাই মেরে ফেলতে পারে।
  • এ রোগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হলে জমিতে মাঝে মাঝে পুড়ে যাওয়ার মত মনে হয়।
  • অনেক ক্ষেত্রে খোল ও পাতার সংযোগস্থলে কাল দাগের সৃষ্টি হয়।
  • যা পরবর্তীতে পঁচে যায় এবং পাতা ভেঙ্গে পড়ে ফলন বিনষ্ট হয়।

২.গীট বা নোড ব্লাস্ট

  • ধান গাছের থোড় বের হওয়ার পর থেকে এ রোগ দেখা যায়।
  • গিঁটে কালো রংয়ের দাগ সৃষ্টি হয়।
  • ধীরে ধীরে এ দাগ বেড়ে গিঁট পঁচে যায়, ফলে ধান গাছ গিঁট বরাবর ভেঙ্গে পড়ে।

৩.নেক বা শীষ ব্লাস্ট

  • এ রোগ হলে শীষের গোড়া অথবা শীষের শাখা প্রশাখার গোড়ায় কাল দাগ হয়ে পঁচে যায়।
  • শীষ অথবা শীষের শাখা প্রশাখা ভেংগে পড়ে।
  • ধান চিটা হয়।

রোগের প্রতিকার:

  • রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে।
  • মাটিতে জৈব সারসহ সুষম মাত্রায় সব ধরনের সার ব্যবহার করতে হবে।
  • আক্রান্ত জমির খড়কুটা পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং ছাঁই জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
  • সুস্থ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে, দাগী বা অপুষ্ট বীজ বেছে ফেলে দিয়ে সুস্থ বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • গের আক্রমন হলে জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
  • জমিতে সব সময় পানি রাখতে হবে।
  • রোগের শুরুতে হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি (বিঘা প্রতি ৫ কেজি) পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
  • ট্রাইসাইক্লাজল (ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি) বা টেবুকোনাজল + ট্রাইফ্লক্সিস্ট্রবিন (নাটিভো ৭৫ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

=============================
লেখক:- উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব)
মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই
শিবগঞ্জ, বগুড়া।
Mobile No. 01911-762978; 01558-313632; 01673-632486.
E-mail: ;