Tuesday, 21 August 2018

 

ধানের মাজরা পোকা ও তার দমন ব্যবস্থাপনা

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ: মাজরা পোকা ধান ফসলের কান্ডের অভ্যন্তরে ভক্ষণকারী একটি ক্ষতিকর পোকা। মাজরা পোকার কীড়া গাছের কান্ডের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে ও ভিতর থেকে কান্ডকে কুড়ে কুড়ে খায়। অনেকের ধারণা কান্ডের মাইজ বা মধ্যখানে বা মধ্যে আক্রমন করে বিধায় এর নাম মাজরা পোকা রাখা হয়েছে। মাজরা পোকার আক্রমণে সাধারণতঃ ১৩ থেকে ২৬ ভাগ ফলন কম হতে পারে। ব্যাপক আক্রমণ হলে ৩০ থেকে ৭০ ভাগ পর্যন্ত ফলনের ঘাটতি হতে পারে। বাংলাদেশে ধান ফসলের জন্য ক্ষতিকর তিনটি প্রজাতির মাজরার পোকা আছে। এগুলো হলো হলুদ মাজরা, কালমাথা মাজরা এবং গোলাপী মাজরা পোকা । এছাড়াও সাদা প্রজাতির মাজরা ইদানিং পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী  প্রায় ৫০ প্রকারের  মাজরা পোকা পাওয়া যায়।  তবে হলুদ মাজরা পোকা ধান ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে।

পোকা পরিচিতি
হলুদ মাজরা পোকা দেখতে হলুদ বর্ণের হলেও পাখার একেবারে নিচের দিকে একটি করে কালো বর্ণের স্পট বা দাগ থাকে। কালো মাথা মাজরা পোকা বাদামী ধূসর বর্ণের হয় এবং গোলাপী মাজরা পোকার ঘাড়ের মধ্যে কেশর থাকে। তাছাড়া মাজরা পোকার কীড়াগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য হলো হলুদ মাজরা পোকার কীড়ার মাথা হলুদ বর্ণের, কালো মাথা মাজরা পোকার কীড়ার মাথা কালচে বর্ণের এবং গোলাপাী মাজরা পোকার কীড়ার মাথা গোলাপী বর্ণের হয়ে থাকে।  হলুদ মাজরা পোকা পাতার উপরের অংশে ডিম দেয়। ডিমগুলো হলুদ বর্ণের হয়। তাছাড়া হলুদ বর্ণের আঁশ দ্বারা ঢাকা থাকে।

একটি হলুদ মাজরা পোকার জীবনে প্রায় ৩০০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। মাজরা পোকার জীবন চক্র চারটি স্তরে বিভক্ত। যথাঃ  ডিম, কীড়া বা লার্ভা, পুত্তলী বা পিউপা এবং পূর্ণাঙ্গ পোকা। হলুদ মাজরা পোকার জীবনকাল প্রায় ৪০ থেকে ৬০ দিন। তাপমাত্রা ও বাতাসের আদ্রর্তার উপর নির্ভর করে ৪৭ থেকে ৮৬ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এক বছরে এরা প্রায় ৫ থেকে ৬ বার বংশবিস্তার করে থাকে। মাজরা পোকার ডিম ফুটে কীড়া হতে প্রায় ৬ থেকে ৮ দিন সময় লাগে। কীড়া অবস্থায় এরা প্রায় ২৪ থেকে ৩২ দিন পর্যন্ত সময় নেয়। সময়ে সময়ে আবার প্রায় ২৮ থেকে ৫৬ দিন পর্যন্তও কীড়া বা লার্ভা অবস্থায় থাকতে পারে।  পরবর্তীতে পুত্তলীতে রুপান্তরিত হয়। পুত্তলিগুলো গাছের গোড়ার দিকে অবস্থান করে। প্রায় ৬ থেকে ১২ দিন পুত্তলী অবস্থায় থেকে এরা পূর্ণাঙ্গ পোকায় রুপান্তরিত হয়। পূর্ণাঙ্গ পোকা ৭ থেকে ১০ দিন বেঁচে থাকে।

ক্ষতির লক্ষণ
হলুদ মাজরা পোকা সাধারণতঃ আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই ব্যাপক আক্রমণ করে। কালো মাথা মাজরা প্রধানতঃ বোরো এবং আউশ মৌসুমে আর গোলাপী মাজরা বোরো মৌসুমে আক্রমণ করে। এ পোকা ফসলে বীজতলা থেকে ফসল পাকা পর্যন্ত আক্রমণ করতে পারে। মাজরা পোকা শুধু কীড়া অবস্থায় ধান গাছের ক্ষতি করে থাকে। ডিম থেকে সদ্য ফোটা কীড়াগুলো দুই/চারদিন গাছের খোল পাতার মধ্যে থাকে। তারপর খেতে খেতে গাছের কান্ডের ভিতর চলে যায় এবং খাওয়ার এক পর্যায়ে গাছের মাঝখানের ডিগ কেটে ফেলে। ফলে ডিগ মারা যায়।

মাজরা পোকা দুই ধরনের ক্ষতি করে থাকে। প্রথমত: মরা ডিগ বা ডেডহার্ট লক্ষণ। কুশি অবস্থায় আক্রমন হলে মরা ডিগ বা ডেড হার্ট লক্ষণ দেখা যায়। কুশির শীষ বা ছড়া আসার আগে ডিগ/মাইন কেটে দিলে সে গাছের ধানের শীষ আর বের হয় না। জমিতে কৃষক শুধু সাদা ডিগ বা মরা পাতা দেখতে পায়। দ্বিতীয়ত: সাদা শীষ বা হোয়াইট হেড লক্ষণ। ধানের পিআই বা পেনিকেল ইনিশিয়েশান বা থোড় আসার প্রাথমিক অবস্থা থেকে ফুল হওয়া অবস্থা পর্যন্ত সময় কীড়াগুলো যদি ডিগ/মাইন কেটে দেয় তাহলে শীষের সবগুলো ধান চিটা হয়ে যায় এবং শীষ সাদা হয়ে যায়। কীড়াগুলো কান্ডের ভিতরের অংশ যদি সম্পূর্ণভাবে কেটে না দেয় তাহলে ধান গাছের আংশিক ক্ষতি হয়।

মাজরা পোকার আক্রমণে সাধারণতঃ ১৩ থেকে ২৬ ভাগ ফলন কম হতে পারে। ব্যাপক আক্রমণ হয়ে ৩০ থেকে ৭০ ভাগ পর্যন্ত ফলনের ঘাটতি হতে পারে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, হলুদ মাজরা পোকার একাধিক কীড়া যৌথভাবে একটি কুশিকে খায় না বরং একটি কীড়া একটি কুশিকে খেয়ে নষ্ট করে পরবর্তীতে অন্য একটি কুশিতে আক্রমন করে বিধায় ধান ক্ষেতের বেশি ক্ষতি হয়।

মাজরা পোকার দমন ব্যবস্থাপনাঃ
মাজরা পোকা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পোকার স্তরভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিলে খুব সহজেই ইহা দমন করা যায়। শুরুতেই পুর্ণাঙ্গ মাজরা পোকা দমনে পার্চিং বা ডাল পুতে পাখি বসার বন্দোবস্ত করে পোকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। হাতজাল ও আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে মাজরা পোকার মথ দমন করা যায়। এতে করে পরবর্তী পর্যায়গুলো স্বাভাবিকভাবেই মোকাবিলা করা সহজ হয়। মাজরা পোকার ডিম নষ্ট করার ক্ষেত্রে ধানের পাতা ক্লিপিং বা কেটে নেয়া, ব্যাম্বো বুস্টার ব্যবহার করা, পলি ব্যাগ রেয়ারিংসহ হাতে ও পায়ে পিষে ডিমগুলো নষ্ট করা যেতে পারে।

মাজরা পোকার সবচেয়ে ক্ষতিকর স্তুর কীড়া বা লার্ভা দমন করার জন্য সরাসরি কোন পদ্ধতি ব্যবহার করার উপায় নেই। কারণ লার্ভা বা কীড়াগুলো কুশির ভিতরে থাকে। যা সহজে দেখা যায়না তবে আক্রান্ত কুশি এবং গোছা তুলে ফেলতে হবে। মাজরা পোকার পিউপা বা পুত্তলী অবস্থায় ধ্বংস করার জন্য ধান কাটার পর জমিতে থাকা নাড়া পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তবে বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে, ধান কাটার সময় গোড়া থেকে কেটে তুলে নেয়া। জমি চাষের সময় খুব ভালোভাবে মাটি চাষ করতে হবে। সমকালীন চাষাবাদ পোকা মাকড় ও রোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাজরার ডিমযুক্ত চারা বা আক্রান্ত চারা রোপন না করা। চারার অভাব হলে তবেই কেবল আক্রান্ত চারার মাথা কেটে ধ্বংস করতে পারেন।

পোকা ও রোগ প্রতিরোধী জাতের ব্যবহার করতে হবে। আগাম ও স্বল্প জীবনকালের ধান যেমন ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬২ সহ বিনা ৭ ধান চাষ করতে পারেন। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার পরিহার করতে হবে। এক্ষেত্রে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।

প্রাকৃতিকভাবেও মাজরা পোকা ধ্বংস করা যায়। লেডি বার্ড বিটল, মিরিড বাগ, লম্বাশুড় উড়চুঙ্গা, লম্বাশুড় ঘাসফড়িং, মিরিড বাগ এসব পোকা মাজরা পোকার ডিম খায়। এয়ার উইগ, ক্যারাবিড বিটল, মাইক্রোভেলিয়া, মেসোভেলিয়া, ওয়াটার স্ট্রাইডার, ওয়াটার বোটম্যান, বিভিন্ন জাতের  মাকড়সা যথা নেকড়ে মাকড়সা, লিনক্স, লম্বামুখী ও অর্ব মাকড়সা মাজরা পোকার কীড়া খায়। প্রেয়িং মেনটিড, পাখি, মাছ, ব্যাঙ, ড্যামসেল ফ্লাই, ড্রাগন ফ্লাই এসব প্রাণীরা মাজরা পোকার মথ খেয়ে থাকে। পাখি মাজরা পোকার পুত্তলী খায়।

তাছাড়া কিছু পরজীবী পোকা রয়েছে যথা ট্রাইকোগ্রামা, টেলিনোমাস, টেট্রাটিকাস এসব মাজরা পোকার ডিমকে আক্রান্ত করে নষ্ট করে।  ক্যারপস, কোটেশিয়া এসব মাজরা পোকার কীড়াকে বিষাক্ত করে মেরে ফেলে। জ্যান্থোপিমলা, টেমিলোসা, স্টেনোব্রাকন এসব মাজরা পোকার পুত্তলীকে নষ্ট করে। এ ব্যাপারে কৃষক ভাইয়েরা আপনারা সরাসরি পরজীবি পোকার কোন ব্যবস্থা নিতে না পারলেও বালাইনাশক ব্যবহারে সচেতন হলে এসব পরজীবি প্রাণীকুল বেঁচে থেকে সহজেই উপকারে আসতে পারে।

আপনার ধান ক্ষেতে কুশি অবস্থায় যদি ১০ থেকে ১৫% কুশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে মরাডিগ এবং থোড়ের পর থেকে শিষ বের হওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫% কুশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় কেবলমাত্র তখনি কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন। যেহেতু মাজরা পোকার কীড়া গাছের কান্ডের ভিতরে অবস্থান করে তাই সিস্টেমিক জাতীয় বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। কীটনাশক হিসেবে কার্বোফুরান, এসিফেট, কার্বোসালফান, কারটাপ এসব গ্রুপের বালাইনাশক ব্যবহার করতে পারেন। তাছাড়া ইদানিং থায়ামেথোস্কেম ও ক্লোরানিলিপ্রল গ্রুপের কীটনাশক পরিমিত মাত্রায়, সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে ব্যবহার করে কৃষকরা ভালো উপকৃত হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ে মাজরা পোকার ক্ষতির লক্ষণের সাথে আরোও কিছু রোগ, পোকা ও অন্যান্য প্রানীর আক্রমনের লক্ষণে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে কৃষক ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভুগেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় টিপস হলো, উরচুংগা অনেক সময় ধান গাছের গোড়ার শিকড় কেটে নষ্ট করে দেয়। যা মাটি থেকে প্রয়োজনীয় রস উত্তোলনে বাধা সৃষ্টি করে।  ফলে পুরো গাছ একসাথে হলুদ হয়ে যায়।

ইঁদুরের আক্রমনেও ধান গাছ হলুদ হয়ে মরে যায়। তবে এক্ষেত্রে ধানের কুশির গোড়ায় তেছড়া কাটা বা আড়াআড়ি কাটার চিহ্ন দেয়া যায়। টুংরো রোগে আক্রান্ত হলে ধান গাছের গোছা ও পাতা খাটো বা বসে যাওয়া বা স্টানটেড হয়ে হলুদ থেকে কমলা বর্ণের রং ধারণ করে। বিক্ষিপ্তভাবে এই লক্ষণজণিত ধানের গোছা মাঠে দেখা যায়। ধানের জমিতে নেক ব্লাস্টের আক্রমন হলে ধানের শিষ আক্রান্ত হয়। তবে এক্ষেত্রে ধান গাছের পাতা সবুজ থাকে এমনকি শিষও সবুজ থাকে। চূড়ান্ত পর্যায়ে শিষ হেলে পড়ে। তাছাড়া ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাস্ট (বিএলবি), মিলিবাগ এমনকি মাঠে দস্তার ঘাটতি দেখা দিলে অনেকাংশেই ধান গাছের পাতা হলুদাভ হয়ে মরে যেতে থাকে। এসব লক্ষণগুলো মাঠে কৃষকরা বুঝতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে মাজরা পোকা দ্বারা আক্রান্ত শিষ টান দিলে খুব সহজেই ওঠে আসবে। আক্রান্ত অংশ মসৃণভাবে কাটা থাকবে ও কীড়ার বর্জ্যরে গুড়িগুড়ি পাওয়া যাবে।

কৃষিকাজের ভুবনে সমস্যার শেষ নেই। আজ সুনির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এ ব্যাপারে আরোও জানার প্রয়োজন হলে আপনার নিকটস্থ  উপ সহকারি কৃষি অফিসারের সাথে আলোচনা করতে পারেন। প্রয়োজনে উপজেলা কৃষি অফিসেও যোগাযোগ করতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনার সেবায় সর্বদায় আমরা নিয়োজিত। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান কারন, “যারা যোগায় ক্ষুধার অন্ন, আমরা আছি তাদের জন্য”।
===============================================
লেখক: আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১৮ ৪২৯৪৫৯।