Friday, 24 November 2017

 

ঐতিহ্য হারাচ্ছে ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী গরুর হাট--সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে

এ কিউ রাসেল, গোপালপুর (টাঙ্গাইল) :দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী হাট উন্নয়নে তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থায়ী ইজারা না দেয়ায় হাটটি ঐতিহ্য হারাচ্ছে। অথচ এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি গোবিন্দাসী গরুর হাট। এতে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহর থেকে বঙ্গবন্ধুসেতু হয়ে ৩১ কি.মি. ভূঞাপুর উপজেলা সদর থেকে ৬ কি.মি. এবং বঙ্গবন্ধুসেতু থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে যমুনার কোল ঘেষে ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসীতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট অবস্থিত। গোবিন্দাসীতে সপ্তাহের রোব ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিন হাট বসে। তবে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের এক মাস আগে থেকে প্রতিদিনই গরু কেনা-বেচা হয়। সিলেট, রাজশাহী, রংপুর বিভাগ ছাড়াও ভারত থেকে হাজার হাজার গরুর সমাগম ঘটে এবং গরুর ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় পুরো গোবিন্দাসী মুখরিত হয়ে ওঠে। গরু ভর্তি শ’ শ’ ট্রাকে হাটের তিনদিকে জট লেগে থাকে। এ সুবাধে হাট এলাকায় দোকানপাট গড়ে ওঠার পাশাপাশি কেউ হোটেল করে জীবিকা নির্বাহ করছে, কেউ চা-পান বিক্রি করছে, কেউ গরুর গোয়াল করে ভাড়া দিচ্ছে, কেউ গরুর খাবার খর বিক্রি করছে। মোদ্দা কথা, গরুর হাটকে কেন্দ্র করেই অত্রাঞ্চলের রাজনীতি-অর্থনীতি আবর্তিত হচ্ছে। গোবিন্দাসীসহ অত্রাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান দিচ্ছে এই হাট। এই হাটকে ঘিরে এতদাঞ্চলের অনেকেই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯০ সালের আগে গোবিন্দাসী একটি ছোট বাজার ছিল। চরাঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতো। ১৯৯১ সালের পর সপ্তাহে দুইদিন রোববার ও বৃহস্পতিবার হাট বসানো হয়। সে সময় সাধারণত বিকালে হাট বসতো। সন্ধ্যার পর ‘মশাল’ বাতি জ্বালিয়ে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত দোকানপাট চালানো হতো। তখন স্থানীয়রা ৮-১০টা করে করে গরু হাটে তুলে বিক্রি করার চেষ্টা করে। কখনো বিক্রি হয়, আবার কখনো হয়না।

১৯৯৫ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা গোবিন্দাসী হাটটি মাত্র ৩২ হাজার টাকায় ইজারা নেন।  গোবিন্দাসী হাটটিতে নদী ও স্থল পথে যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনা করে দেশের সিলেট, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের গরু ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদেরকে হাটে আনতে নানা রকম প্রণোদনা চালু করেন। যেমন রংপুর, রাজশাহী বিভাগ ও ভারত থেকে গোবিন্দাসী হাটে গরু আনলে যমুনা নদীর পাড়াপাড়ের জন্য ফেরি ফ্রি, হাটে গরুর পাহারা ফ্রি এ রকম হরেক রকম প্রণোদনা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাটমুখো করতে ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন জেলায় মাইকিং করা হয়। ধীরে ধীরে গোবিন্দাসী গরুর হাটের প্রসারতা বাড়ে, জমে ওঠে গোবিন্দাসী গরুর হাট। বর্তমানে হাটটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট হিসেবে বিবেচিত।

স্থানীয় পর্যায়ে প্রবাদ আছে, যিনি গোবিন্দাসী হাটে গরুর গোবর কুড়াতেন তিনিও এখন কোটিপতি। হাটের আশপাশের বসবাসকারীদের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে এই হাট। অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, বছরে পৌনে তিন কোটি টাকা রাজস্বের গোবিন্দাসী হাটের কোন নিজস্ব সম্পত্তি নেই। স্থানীয় আ’লীগ নেতা ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধার নেতৃত্বে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভূঞাপুর ফেরিঘাট সড়কের পাশে বিবিএ’র নিয়ন্ত্রণাধীন বঙ্গবন্ধুসেতুর অধিগ্রহনকৃত তিন সড়কের মাথায় স্বল্প পরিসরে গোবিন্দাসী হাট প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা একটানা ৯ বছর হাটটির ইজারা নেন। স্থানীয়দের কাছে গোবিন্দাসীর টি-মোড় হিসেবে জায়গাটি সমধিক পরিচিত। সড়ক ও নদী পথে যাতায়াতে সুবিধার কারণে হাটটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।  
   
জানা গেছে, গত বাংলা সনে স্থায়ী ইজারা না দেয়ায় মাত্র দুই কোটি ৭ লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে। অথচ গত ১৪২১ বাংলা সনে দুই কোটি ৮৫ লাখ ৩০ হাজার, ১৪২২ সনে দুই কোটি ৯১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৪ টাকা, ১৪২৩ সনে দুই কোটি ৮৭ লাখ ৩ হাজার ২৬০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। পৌনে তিন কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও গোবিন্দাসী হাটে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া নেই। সরকারিভাবে হাট উন্নয়নে কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি- যা হয়েছে তা পুরোপুরি লুটপাটই বলা চলে।

বয়সের ভারে ন্যূব্জ গোবিন্দাসী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আ’ লীগ নেতা ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা জানান, তিনিই স্থানীয় লোকদের নিয়ে গোবিন্দাসী গরুর হাট প্রতিষ্ঠা করেন। মাইকিং করে, প্রণোদনা দিয়ে, বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে পাইকার ও ক্রেতাদের হাটমুখো করেছেন। হাট উন্নয়নে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও সরকারি সুবিধা না পাওয়ায় ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। ব্যক্তি ও ইজারাদারের কল্যাণে কিছুটা উন্নয়ন করা হয়েছে।

ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশরাফ হোসেন জানান, গোবিন্দাসীসহ অত্র অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষের কর্ম সংস্থান দিচ্ছে এ গরুর হাট। এই হাটকে ঘিরে অত্রাঞ্চলের অনেকেই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সবারই দায়িত্ব হাটটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে উপজেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করা। তিনি বছরের গড় ইজারার ওপর ১০ ভাগ বৃদ্ধির নিয়ম থাকায় যে অর্থের হিসাব দাঁড়ায় ইজারাদাররা সেই টাকায় হাট না নেওয়ায় উপজেলা প্রশাসন থেকে সরকারি ভাবে হাটবার ইজারার মাধ্যমে টোল আদায় করা হচ্ছে।