Saturday, 22 July 2017

 

স্বপ্নচারী সফল কৃষি প্রকৌশল উদ্যোক্তা মো. আবুল মিয়া

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ:মননে সৃজনশীলতা আর তীক্ষè মেধার অধিকারী কৃষি যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি উদ্ভাবক, আত্মপ্রত্যয়ী স্বপ্রকৌশলী জনাব মো. আবুল মিয়া। তিনি সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের চর মোহাম্মদপুর গ্রামের বাসিন্দা। লেখাপড়ার ইতি টেনে তিনি মেকানিক্স হিসেবে যোগ দেন স্থানীয় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে। শুরুটা করেছিলেন সেই ১৯৮৭ সালে।

নিজের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল এই ওয়ার্কশপে। ওয়ার্কশপটিকে তিনি শুধু আয়ের উৎস হিসেবে নয় বরং আবিষ্কারের কারখানা হিসেবেই লালন করেছিলেন। তাই অন্য মেকানিক্সরা যেখানে মজুরী কাজে ব্যস্ত তখন তার ছিল নিজস্ব প্রতিভাগুলোর বিস্তারের ব্যস্ততা। আবিষ্কারের নেশায় তাকে উন্মাদ করে দিয়েছিল।

অত:পর জীবন গরজের তাগিদে একদিন পাড়ি দিতে হয় বিদেশের মাটিতে। দূর পরদেশে তিনি থমকে যাননি বরং রুটিন মাফিক কাজ শেষ করে ছুটে যেতেন স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করতেন। অন্যদের কাজগুলোও রপ্ত করতেন। দিনে দিনে একজন অভিজ্ঞ মেকানিক্স বনে যান তিনি। বিদেশের মাটিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। অর্জিত মেকানিক্যাল বিদ্যা, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে একদিন দেশের মাটিতে ফিরে আসেন। এতটুকু সময় নষ্ট না করেই ১৯৯৯ সালে নিজ উদ্যোগে তিনি মেসার্স আবুল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

সঞ্চিত বিদ্যা ও কারিগরি অভিজ্ঞতা দ্বারা দেশীয় প্রযুক্তিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির গবেষণা, উন্নয়ন ও প্রস্তুত করতে মনোনিবেশ করেন। তৈরি করতে থাকেন একের পর একটি যন্ত্র। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে মেসার্স আবুল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে আরোও একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে দেন কয়েক জন বেকার আত্মপ্রত্যয়ী যুবকদের। সবাই মিলে কৃষি যন্ত্রের এক বিপ্লব তৈরি করেন।

কৃষি কাজে ব্যবহার উপযোগী বিভিন্ন মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছেন। উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো বাজারজাত করেছেন। তার উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে আবুল পাওয়ার টিলার, আবুল ধান মাড়াই কল, আবুল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ মিক্চার মেশিন, আবুল ব্লাইন্ডার মেশিন, আবুল চিনি মাড়াই কল, আবুল মশলা প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিন এসব।

এসব কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো উদ্ভাবনের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শণী বাস্তবায়ন, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মেলায় অংশগ্রহন ও কৃষকদের মাঝে উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তাগণ তার এই ইন্ড্রাস্ট্রিজ পরিদর্শন করেছেন। নানাভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশংসিত হয়েছেন। কৃতিত্বেও ঝুলিটিও তার অনেক বড়।

তিনি মনে প্রাণে উপলব্দি করেন, কৃষি কাজ অসম্ভব কঠিন কাজ। মাটি ভেদ করে ফসল ফলানো কি যে কঠিন তা শুধু কৃষক ভাইয়েরাই জানে। তাদের কাজকে একটু সহজ করে দেয়ার প্রত্যয়ে একদিন কৃষি যন্ত্রের আবিষ্কারের নেশায় মত্ত্ব হন জনাব মো. আবুল মিয়া। সুপ্ত মেধাকে শাণিত করে আবিষ্কার করেন কৃষি কাজে ব্যবহার উপযোগী নানা যন্ত্রপাতি। কৃষি ও কৃষকের কল্যাণে নিবেদিত করেন তার জীবনকে।

জনাব আবুল সাহেবের উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতিগুলো যথেষ্ট উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন, স্বল্প খরচ, স্থায়ীত্ব অনেক বেশি এবং পরিচালনা করা অনেক সহজ। তাছাড়া মেরামত রক্ষণাবেক্ষনও বেশ সহজ বিধায় এই মেশিনগুলোর চাহিদা ব্যাপক। বিশেষ করে, আবুল পাওয়ার টিলার এবং আবুল মাড়াই যন্ত্র কৃষকদের মাঝে বেশ সমাদৃত।
বর্তমানে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে সরকার সম্প্রতি একটি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ রোডম্যাপ গ্রহন করেছেন। জনাব আবুল কৃষির যান্ত্রিকতা নিয়ে ভেবেছেন সেই ১৯৯৯ সালে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের ইন্ড্রাষ্ট্রিজ, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে কৃষি যান্ত্রিকতা প্রযুক্তির বিকাশ ও যান্ত্রিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি যান্ত্রিকতা নিয়ে আরোও বিশালাকারে কাজের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ের এসব দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার দরকার। তার স্বপ্ন, তার ইন্ড্রাস্ট্রিজে মেধাবী তরুণ ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করবে, কাজ শিখবে এবং নতুন নতুন যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করবে।

তার অন্তরে রয়েছে কৃষি ও কৃষকের প্রতি গভীর ভালবাসা রয়েছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, কৃষকরা চাহিদামাফিক কৃষি উপকরণসমূহ সময়মত পাবেন। ফসল বীমা, ভর্তুকি বৃদ্ধি, সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকার তাদেরকে সহযোগিতা করবে। মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাতœ্য কমিয়ে সঠিক দাম প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। তাছাড়া তিনি দেশীয় খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি বেসরকারি ভাবে সহযোগিতা ও উদ্বুদ্ধকরণ করার আহবান করেন। দেশীয় প্রযুক্তিতে কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ সরকার  বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪১৭ তে ভূষিত করেন।তিনি স্বপ্ন দেখেন, বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষক হবে এক একটি প্রতিষ্ঠান।
============================
আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।