Sunday, 19 November 2017

 

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ:পাখিদের জন্য তৈরি করেছেন অভয়াশ্রম

এ কিউ রাসেল, গোপালপুর (টাঙ্গাইল):পাখির জন্য বাসস্থান! শুনলে অনেকটা অবাকই হতে হয়। কিন্তু এমনটাই করে দেখালেন টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো:মাহবুব হোসেন। তিনি পাখির জন্য তৈরি করেছেন নিরাপদ বাসস্থান। পাখির বাস-উপযোগী মাটির তৈরি হাঁড়ি ঝুলিয়ে দিয়েছেন গাছের প্রতিটি ডালে ডালে, যেখানে নিশ্চিন্তে আবাস গড়ে তুলেছে বিভিন্ন জাতের পাখি। আর এতে করে পাখির বংশবিস্তার করতে সুবিধা হবে। টাঙ্গাইল শহরের সার্কিট হাউজ থেকে শুরু করে হর্টিকালচার ও সদ্য-নির্মিত ডিসি লেক এলাকার গাছগুলোতে হাঁড়ি দিয়ে পাখির বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় ছোট বড় সব গাছগুলোতে হাঁড়ি লাগানো হয়েছে। পাখি ভেদে হাঁড়ির আকার ও আকৃতিও ভিন্ন। গাছের ডালে ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এসব মাটির হাঁড়ি। ছোট গাছগুলোতে ২-৩টি ও বড় গাছগুলোতে ৪-৫টি বা তারও অধিক হাঁড়ি লাগানো হয়েছে। অনেক হাঁড়িতে পাখির আসা-যাওয়া দেখা গেছে।

স্থানীয় ও সেখানে ঘুরতে আসা মানুষ ‘পাখির বাসস্থান’ দেখে মুগ্ধ। তাদের মতে এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। আর এ উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন। তারা পাখির জন্য বাসস্থান এই বিষটির কথা আগে কখনো শুনেনি, দেখেওনি। এবারই প্রথম দেখছেন। এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় শরিফুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, এখানে পাখির জন্য বাসস্থান করা হয়েছে। এতে এ এলাকায় পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। সত্যিই এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

কথা হয় ফয়সাল আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, পাখির জন্য বাস স্থান এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এর ফলে এখানে পাখির আসা-যাওয়া বৃদ্ধি পাবে। আমি আশা করছি জেলা প্রশাসক এ কাজে সফলতা পাবে। বিভিন্ন কারণে পাখির বাসস্থান কমে যাচ্ছে। পাখিসহ প্রকৃতির সকল প্রানিই আমাদের জন্য অপরিহার্য। যদি জেলার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে পাখির জন্য বাসস্থান করা যায় তাহলে  মানুষেরই উপকার হবে বলে তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সবারই বাসস্থান দরকার। পাখি নিজেরাই নিজেদের বাসস্থান তৈরি করে। তারপরও পাখি যাতে নিরাপদে থাকতে পারে এ জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, প্রায় ২ মাস আগে পরীক্ষামূলকভাবে আমরা এখানে কয়েকশ’ গাছে ১ হাজার হাঁড়ি লাগিয়েছি। লেকের আশপাশ, সার্কিট হাউজ ও তার আশে পাশের এলাকায় হাঁড়ি লাগানো হয়েছে। যদি এখানে সফলতা পাই তাহলে জেলার প্রতিটি উপজেলায় পাখির জন্য বাসস্থান করা হবে।

তিনি বলেন, যদি কোন পাখির বাসস্থান না থাকে তাহলে তারা এখানে আশ্রয় নিতে পারবে। ঝড়-বৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পাখির বাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এ কারণে পাখির ডিম ও বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে বংশবিস্তার কমে যায়। পাখির বংশবিস্তার বৃদ্ধির লক্ষে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাখিকে সবাই ভালোবাসে। এখানে প্রচুর  পাখি আসলে সবারই ভালো লাগবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল-ফুল হবে। পাখি থাকলে মন ও পরিবেশ  দুটোই ভালো থাকবে।
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের এ উদ্যোগকে সর্বস্তরের লোকজন স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে এটি বাস্তবায়িত হলে পাখির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শিমুল শেখ বলেন, মানুষের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নতি, আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা, উচ্চাভিলাস ও সেইসঙ্গে অবিবেচনাপ্রসূত প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, নিবনিকরণ, জলাশয় ভরাট, রাসায়নিকের উচ্চমাত্রায় ব্যবহার, জনসংখ্যাবৃদ্ধি-এসব মিলিয়ে প্রকৃতি যখন হুমকির সম্মুখিন ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে বিশ্বমানবতা অস্তিত্বের টান অনুভব করছে টিকে থাকার।

সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সর্বোচ্চ ব্যবহারের সাথে সাথে টেকসই প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন ভাবনা আজ গোটা পৃথিবীর মানুষের প্রাণের দাবি। প্রকৃতি যখন বিপন্নপ্রায় জীববৈচিত্রতা নিয়ে নানা সংকট ও দুর্যোগের মুখোমুখি তখন টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের ‘পাখির জন্য বাসস্থান’ তৈরি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

তিনি আরো বলেন, অধিক জনসংখ্যার এদেশে আইন করেও যে জিনিস বাস্তবায়ন করা কঠিন জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে তাহা বাস্তবায়ন অনেকটা সহজ এবং যাহা গণবান্ধব। পাখিদের অভয়, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ আবাস হতে পারে Indigenous Plant গুলি। সেদিকে সাধারণ মানুষদেরকে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। শুধু পাখির বাসাই পাখিকে নিরাপত্তা দিবে বিষয়টি এমনও নয়। পাখির খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিতে ব্যবহৃত রাসয়নিক ও কমিয়ে জৈব প্রযুক্তির ব্যহার বাড়াতে হবে। একই সাথে জলাশয় নির্ভর পাখিদের জন্য জলাশয় সংরক্ষণও জরুরী বিষয়।

তিনি আরো বলেন, ২০১৬ সালে বাজারে ইলিশ মাছের পর্যাপ্ততাই তা প্রমান করেছে। জনসচেতনতা বাড়িয়ে জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজ জনগনকে দিয়ে করিয়ে জনগনকে উপহার দেয়া সম্ভব। বাংলার মানুষ পারে, বাংলার মানুষই পারবে, শুধু থাকতে হবে জীববৈচিত্রতা বান্ধব যোগ্য নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশনা।