Saturday, 18 November 2017

 

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প ও পুষ্টি মানের অগ্রগতি

এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম, ডেস্ক:বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। সাধারন মানুষ পোল্ট্রি’র ডিম কিংবা ব্রয়লার মুরগীর মাংস খেতেই চাইতো না। পোল্ট্রি’র মাংস যে কতটা সুস্বাদু, নরম এবং স্বাস্থ্যসম্মত তা বোঝাতে শুরুর দিকের উদ্যোক্তাদের অতিথি ডেকে এনে রান্না করা মাংস পরিবেশনও করতে হয়েছে। আশির দশকে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ছিল মাত্র ১৫শ’ কোটি টাকা। আর বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পোল্ট্রি উদ্যোক্তা ও খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই এ অসাধ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

মাত্র তিন যুগের ব্যবধানে সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর খাতটি এখন অনেকটাই আত্ম-নির্ভরশীল। বর্তমানে পোল্ট্রি মাংস, ডিম, একদিন বয়সী বাচ্চা এবং ফিডের শতভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প। সাধারন গরীব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জন্য কম দামে প্রাণিজ আমিষের যোগান দিচ্ছে এ শিল্প। শিশুর পেশীগঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির যোগান দেয়া, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, সামোসা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার- যা কিছুকাল আগেও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো।

সমৃদ্ধ আগামীর জন্য পোল্ট্রি
যে ধরনের অগ্রগতির কথাই বলুন না কেন, তা অর্জন করতে হলে সবার আগে দরকার সুস্থ, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি। স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতির জন্য আমাদেরকে মাথাপিছু আয় কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় উন্নীত করতে হবে যেন মানুষ তার প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারে। পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারে। আশার কথা হল আমাদের দেশের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে- ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১১৯০ মার্কিন ডলার। ২০১৪-১৫ সালে তা বেড়ে হয় ১,৩১৪ ডলার। ২০১৫-১৬ সালে ১,৪৬৬ ডলার। ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে সামিল হবে। মাথাপিছু আয় ২০০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা বলে আশা করছে সরকার।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা স্বাস্থ্যবান মেধাবী জাতি গড়ার ক্ষেত্রে পোল্ট্রি শিল্পের ভূমিকা কতখানি? নি:সন্দেহে অনেক বড় ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এর মতে- ২০২১ সালের চাহিদা মেটাতে হলে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম অর্থাৎ বছরে প্রায় ১,৪৭৯ কোটি ২০ লাখ ডিম উৎপাদন করতে হবে এবং দৈনিক প্রায় ৩,২৯৯ মেট্রিক টন অর্থাৎ বছরে প্রায় ১২ লক্ষ ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদন করতে হবে। সার্বিক বিচারে পোল্ট্রি শিল্পে মোট বিনিয়োগ হতে হবে ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান বিনিয়োগের সাথে যুক্ত হবে আরও প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা। কারণ এ শিল্পের সাথে এগ্ এবং মিট ইন্ডাষ্ট্রি ছাড়াও, ব্রিডিং ও হ্যাচারি ইন্ডাষ্ট্রি, ফিড ইন্ডাষ্ট্রি, লিংকেজ ইন্ডাষ্ট্রি, ঔষধ, কাঁচামাল এবং সার্ভিস ইন্ডাষ্ট্রি জড়িত। কাজেই এ শিল্পের অগ্রগতির সাথে সাথে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ ঘটতে থাকবে।  

দারিদ্রতা কমানোর ক্ষেত্রে কীভাবে অবদান রাখবে? পোল্ট্রি শিল্প সরাসরি প্রায় ২০-২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এ শিল্পের সাথে জড়িত বা নির্ভরশীল। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। বিপিআইসিসি’র হিসাব মতে ২০৩০ সাল নাগাদ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে।  

পারিবারিক পুষ্টি: একজন মানুষ যখন খামার করেন তখন তাঁর পরিবারে ডিম এবং মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমান বাড়ে। এটা সহজ সাধারন হিসাব। কারণ তখন তাকে টাকা দিয়ে ডিম কিংবা মুরগি কিনতে হয়না। আবার অন্যভাবে দেখুন- একজন স্বল্প আয়ের মানুষ ৮ টাকায় একটি ডিম কিনতে পারে। দরিদ্র পরিবারে ২টা ডিম দিয়ে ৪ জনের একবেলার তরকারি হয়ে যায়। এত কম খরচে অন্য কোন প্রাণিজ আমিষের কথা কল্পনাও করা যায় না।

পোল্ট্রি শিল্পের অগ্রগতির কারণে সাধারন মানুষের প্রোটিন ইনটেকের পরিমান বেড়েছে। আমরা যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই তাহলেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখতে পাব। সেভ দ্য চির্ল্ডেন এর Malnutrition In Bangladesh (মার্চ ২০১৫) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- “১৯৯৭ সালে শিশুদের i chronic malnutrition হার যেখানে ছিল ৬০%, ২০১১ সালে তা ৪১ % নেমে এসেছে। বর্তমানে এ হার আরও নিম্নগামী।” দেখা যাচ্ছে উন্নতি প্রায় ১৯%। ২০০৯-১১ সালে পোল্ট্রি শিল্পের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮-২০ শতাংশ। পোল্ট্রি শিল্পের প্রবৃদ্ধির সাথে অপুষ্টির হার কমার ক্ষেত্রে এক ধরনের সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা বলছিনা যে কেবল মাত্র পোল্ট্রি’র কারণেই অপুষ্টির হার কমেছে। তবে পোল্ট্রি’র ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদনও যে অবদান রেখেছে তা বলা যেতে পারে।

নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় পোল্ট্রি শিল্প ভূমিকা রেখেছে। পোল্ট্রি শিল্পে নিয়োজিত জনশক্তির ৪০%ই নারী। এ সক্ষমতা তাকে পরিবার এবং সমাজে স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে বর্তমানে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২.৪ শতাংশ। ২০২১ সাল কিংবা ২০৩০ নাগাদ এ অবদান যে উল্লেখযোগ্য পরিমান বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নাই।

পোল্ট্রি শিল্পের অগ্রগতি হলে পুষ্টি মানের কী উন্নতি হবে?

শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতি: ২০১৩ সালে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলা হয়-বয়স ভিত্তিক বিবেচনায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪১% খর্বাকৃতির এবং ৩৬% কম ওজনের। আবার উচ্চতা বিবেচনায় ১৬% শতাংশ শিশু কম ওজনের। ৫১% রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে। বলা হয়- প্রতি বছর অন্তত: ৫৩ হাজার শিশু মৃত্যুবরণ করছে অপুষ্টি জনিত জটিলতার কারণে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের অন্তত: ৪৫% মারা যায় অপুষ্টির কারণে। তাছাড়া লক্ষ লক্ষ শিশু এক কিংবা একাধিক প্রকৃতির অপুষ্টি জনিত সমস্যায় আক্রান্ত। বলা হয় অপুষ্টির কারণে শিশুরা রোগে ভুগছে-যা তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

নারীর পুষ্টি পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়: ৪২% কিশোরী (adolescent girls) অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে অপুষ্টিতে ভুগছে। আরও বলা হয় মাতৃত্বকালীন অপুষ্টির (maternal malnutrition) ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশ সবার শীর্ষে। অপুষ্টি’র প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। কারণ অপুষ্টির শিকার মা, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর জন্ম দেয়। এ শিশু মেয়ে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেও একজন অপুষ্টির শিকার মা’ই হয়ে থাকে। আর এভাবে অপুষ্টি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞারিত হয়। আবার পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে অনেক সময় ছেলে সন্তানের তুলনা মেয়ে সন্তান কম পুষ্টিকর খাদ্য পেয়ে থাকে।

২০১৫ সালের মার্চে ‘সেভ দ্য চির্ল্ডেন’ (Save the Children) কর্তৃক প্রকাশিত “ম্যালনিউট্রিশন ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রতিবেদন এবং ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউএসএআইডি কর্তৃক প্রকাশিত "Bangladesh: Nutrition Profile" এ মূলত: একই চিত্র তুলে ধরা হয়। ‘সেভ দ্য চির্ল্ডেন’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়- অপুষ্টির হার বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শীর্ষে। বলা হয় দেশের প্রায় ৬০ লাখ শিশু “chronically undernourished”।

আমরা জানি যে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে বিগত বছরগুলোতে দারিদ্র, অপুষ্টি, মা ও শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য পরিমান কমেছে। কিন্তু পাশাপাশি একথাও সত্য যে বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের করণীয় কী হবে? উত্তরটা সহজ-পুষ্টিকর খাবারের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, এ ধরনের খাবার সাশ্রয়ী দামে যেন মানুষ কিনতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে,  মানুষ যেন এ ধরনের পুষ্টিকর খাদ্য প্রয়োজন মত গ্রহণ করে সে বিষয়ে উৎসাহ বা অনুপ্রেরণা যোগাতে হবে, শুধু ভাতের উপর নির্ভরশীল না থেকে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে। সমাধান মুখে বলা যতটা সহজ, অর্জন ততটা সহজ নয়। তবে সরকারের পাশাপাশি পোল্ট্রি শিল্পও এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।
-সৌজন্যে ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা