Tuesday, 21 November 2017

 

সাপাহারে জবই বিল যৌবন ও ঐতিহ্য হারিয়ে এখন মরা খাল

কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ:নওগাঁ জেলার অন্যতম ও সাপাহার উপজেলার প্রাকৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী জবই বিল এখন তার সকল প্রকৃতি ও ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে মরা খালে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর খরা মৌসুুমে এ বিল শুকিয়ে ছোট একটি খালে পরিণত হয়। সংস্কার অভাবে হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই বিলে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা কাদা, বালি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটির ধ্বসে বিলটি এখন প্রায় ভরাট হতে চলেছে।

জেলার প্রায় ৬৫ কিলো পশ্চিমে সাপাহার উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষে বিলটির অবস্থান। ঐতিহ্যবাহী বিলটি উত্তরে ভারত থেকে উৎপত্তি হয়ে দক্ষিনে পূর্নভবা নদীতে মিলিত হওয়ায় যুগ যুগ ধরে সাপাহার উপজেলাবাসীকে দু’ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। ১৯৯৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার রাষ্টৗয় ক্ষমতায় এলে প্রায়ত সফল বানিজ্য মন্ত্রী জননেতা আঃ জলিল এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ওই জবই বিলের উপরে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার এপ্রোচ সংযোগ সড়ক ও ২০০মিটার একটি সেতু সহ ১৬কিলোমিটার একটি পাকা রাস্তা নির্মান করে উপজেলার বিভক্ত হয়ে পড়া মানুষদের মাঝে একটি সংযোগ ও সেতু বন্ধন তৈরী করেন।

সরকারী রেকর্ড অনুযায়ী বিলটির প্রকৃত আয়তন প্রায় ১হাজার একর যা বর্ষা মৌসুনে ৫হাজার একরে বিস্তৃত হয়ে যায়, আর বিলটির প্রকৃত নাম দামুর মাহিল বিল, বিলটি জবই গ্রামের কোল ঘেঁসে বয়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে এর নামকরণ হয় জবই বিল হিসেবে। অতীতে বিলের বুক চিরে নৌকা যোগে ওপার পাহাড়ী পুকুর হয়ে লোকজন জবই গ্রামের উপর দিয়ে সাপাহার উপজেলা সদরে তাদের বিভিন্ন কাজে আসত আর ওই নৌ-পথের উত্তরের অংশকে বলা হত দামুর বিল আর দক্ষিনের অংশকে মাহিল। সাপাহার উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের আইহাই, পাতাড়ী ও গোয়ালা ইউনিয়নের একাংশ সহ প্রায় ৩টি ইউনিয়নের লোকজনের বাস বিলের ওপারে।

বহু পূর্বে খরা মৌসুমে পুরো উপজেলা সহ পাশের পত্নীতলা ও পোরশা উপজেলার কিছু অংশের মানুষ বিল বাহিচের সময় আসত এই বিলে মাছ ধরতে তখনকার দিনে প্রতি সপ্তাহের দুটি দিন ধার্য ছিল মাছ ধরার জন্য। বিলের উত্তর অংশে মাছ ধরা হত সপ্তাহের রোববার আর দক্ষিন অংশে ধরা হত মঙ্গলবার করে। সে সময় বিলে ধরা পড়ত প্রায় ১মণ, ৩০কেজী ওজনের বোয়াল, সৌল, আইড়, গজার, সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। তখন প্রতিবছর এই বিলে মাছ ধরতে এসে একটি করে প্রাণ হারিয়ে যেত বিলের মাছের আঘাতে। প্রতি বছর ঘটনাটি ঘটায় কুসংস্কার হিসেবে মানুষ ধরেই নিয়েছিল এটি মানুষ খেকো বিল। তখনকার বিলে প্রাকৃতিক ভাবে গজিয়ে ওঠা শাপলা, শালুক সহ অসংখ্য কাঁটা যুক্ত কচুরী পানায় পুরো বিল ঢেকে থাকত সারা বিল জুড়ে কোথাও একটুকু পানির দেখা মিলতো না।  

প্রতি বছর শীতকালে বিলে বালি হাঁস, ছন্নি হাঁস, রাজ হাসঁ, পানকৌড়, মাছ রাঙ্গা, ডাহুক, সহ প্রায় হাজার প্রজাতির এমন কি সুদুর সাইবেরিয়া হতে অসংখ্য অতিথি পাখী আসত এই বিলে। সে সময়ে কিছু সৌখিন প্রকৃতির মানুষ তাদের বন্দুক কাধেঁ নিয়ে আসত বিলে পাখি শিকার করতে। তখনকার পরিসংখ্যান হিসেবে জানা গেছে দেশের বিভিন্ন স্থান এমনকি সুদুর রাজধানী ঢাকা শহর থেকেও মানুষ পাখি শিকার করতে আসত এই বিলে। এছাড়া এক শ্রেণীর লোভী মানুষ জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে নির্বিচারে পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করত।

এখন বিলটির কিছু সংস্কার হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কর্ম সংস্থানের সুযোগ হয়েছে জাল যার জলা তার নিতি এখন আর নেই যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ ছাড়া আগের মত সকলেই মনের আনন্দে এক সাথে দিন করে বাহিচের মাধ্যমে আর বিলে মাছ ধরতে পারেনা। তৎকালীন সময়ে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা সাপাহারে সরকারী এক সফরে এসে উপজেলার মৎস্য জীবিদের ভাগ্যন্নোয়নে বিশাল এই জলশয়টিকে একটি বৃহত মৎস্য প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষনা দেন। যার ফলে পরবর্তীতে বিলটি এখন পর্যন্ত প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষনানুযায়ী মৎস্যজীবী সমিতির মাধ্যমে প্রকল্পের মধ্যে মৎস্য চাষ হয়ে আসছে।

বর্তমানে এই বিলের উৎপাদিত মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমন কি রাজধানী ঢাকা শহরের কাওরান বাজারে বিক্রি হলেও সেই আগের মত ১মন, ৩০কেজি, ২০কেজি ওজনের বোয়াল, চিতল, আইড়, সৌল মাছ আর ধরা পড়ে না। সুদুর সাইবেরিয়া ত দুরের কথা দেশীয় প্রজাতীর পাখীও আর বিলে আসেনা। এলাকার হাঁস খামারীরা তাদের খামারের হাঁস বিলে বিচরণ করলে মাছ চাষের ক্ষতি হবে মনে করে মাছ চাষীরা এখন খামারীদের চাষ করা হাঁসও আর বিলের পানিতে নামতে দেয়না। অতীতের গভীরতা সম্পন্ন বিলটি এখন প্রাকৃতিক ভাবেই ভারতের উজান ও পাড়াহ হতে নেমে আসা মটিতে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে খরা মৌসুমে বিলে বিল ভর্তি আর পানি থাকেনা তাই বিলটি এখন তার প্রাকৃতিক সৌন্দ্যর্য হারিয়ে ঠুটো জগন্নাথের মত বুক পেতে রয়েছে।

এখন পুরো বিল জুড়ে চাষ হচ্ছে ধান খরা মৌসুুমে বিল এলাকায় গেলে মনেই হবেনা এটি একটি বিল চারিদিকে শুধু ধানের মাঠ আর মাঠ চোখ যে দিকে যায় সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে। বর্তমানে বিলটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেললেও ওই বিল হতে উৎপন্ন হচ্ছে হাজার হাজার টন ধান, গম, ডাল সহ বিভিন্ন রকমের কৃষিজাত ফসল।

বর্তমান সরকারের ধর্ম মন্ত্রনালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নওগাঁ-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপির নিরলস প্রচেষ্টায় বিলটি পুনঃ সংস্কারে, খনন, নেটিং, বাঁধ সহ প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে অচিরেই সেখানে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিলটি সংস্কার করা হলে অতিতের ন্যায় বিল ভর্তি পানি ও বিলে সারা বছরই পার্যাপ্ত পরিমানে মাছ চাষ হবে এবং সে পানি দিয়ে বিল পাড়ে অসংখ্য জমিতে চাষাবাদ করা যাবে যা দেশের আমিষ সহ খাদ্য চাহিদা মেটাতে এক সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে এলাকার অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। এছাড়া বিল সংস্কার করা হলে এই বিল ও বিল পাড়ে দর্শনার্থীদের আনন্দ বিনোদনের জন্য একটি ইকো পার্ক, পানিতে ইস্প্রিড বোর্ড সহ নানা কৃত্রিম সৌন্দর্যে সাজানো হবে যাতে উপজেলাবাসী ও বাহির থেকে আসা দর্শনার্থীরা একটু হলেও আনন্দ বিনোদনে সময় কাটাতে পারবে এই বিলে এসে।

তাই প্রাকৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী জবই বিলটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেললেও এখন থেকে এখানে কৃত্রিম সৌন্দর্য বিরাজের যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যহত রয়েছে বলে স্থানীয় সংসদ সদস্য বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার, উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শামসুল আলম শাহ্ চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফাহাদ পারভেজ বসুনীয়া, উপজেলা মৎস্য অফিসার শাম্মী শিরীন সহ অনেকেই জানিয়েছেন।