Thursday, 14 December 2017

 

হাওরে বোরো ধান : আকস্মিক বন্যার ভয়াল থাবা

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ, আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট:কোন ভোগ বিলাসিতা নাই বরং কাকডাকা ভোর সকালে ছেড়া গেঞ্জি গায়ে এক থালা ঠান্ডা ভাতের সাথে শুটকি ভর্তা হলেই চলে যায় মধ্য দুপুর পর্যন্ত। পার্থিব জগতে অক্লান্ত পরিশ্রম, মাথার ঘাম পায়ে, কাঠ ফাটা তপ্ত রোদে, ঝড়ো বর্ষায়, মাঘের শীতের কনকনে হাওয়া, চৈত্রের দাবদাহ কোন কিছুই কৃষকদের দাবিয়ে রাখতে পারে না।

ফসলের কাঙ্খিত ফলনের আশায় নিশিদিন একটানা পরিশ্রম করে যায়। অকুতোভয়, অক্লান্ত পরিশ্রমী মানুষগুলো মাথায় হাত দিয়ে সোনার ফসলের দিকে তাকিয়ে থাকে, আস্ফালন করে, অসহায় আত্নসমর্পন করে প্রকৃতির নির্মম নিষ্ঠুর দুর্যোগ পাহাড়ী ঢল ও আকস্মিক বন্যার কাছে। আমাদের কি কিছুই করার নাই তাদের প্রতি?

সিলেট অঞ্চলের হাওর ও নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় বোরো ফসল নষ্ট হওয়া একটি গতানুগতিক হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনই এর মূল কারণ। আগাম আকস্মিক বন্যা, শিলা বৃষ্টি, বজ্রপাত, ঝড়ো বাতাস সবমিলিয়ে সিলেট অঞ্চলের কৃষিকাজ কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী সবার জন্যই একটা বড় চ্যালেঞ্জ বটে। যথোপোয্ক্তু পরিকল্পনা, সঠিক নির্দেশনা, সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ জনপ্রতিনিধিগণের সুচিন্তিত দায়িত্বশীলতাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে।  

আকস্মিক বন্যা : ভৌগোলিক পাহাড়ী পাদদেশীয় নিচু এলাকা যেমন নদী, হাওর, বাওর, বিল, ঝিল, নদী অববাহিকা, হাওর বেসিন এসব এলাকায় হঠাৎ দ্রুত ও ক্ষীপ্রগতিতে বন্যায় প্লাবিত হওয়াকে আকস্মিক বন্যা বলা হয়। আকস্মিক বন্যা মানে হঠাৎ পথ ঘাট, ফসলি মাঠ, ময়দান, ব্রীজ, কালভার্ট ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ খুবই অল্প সময়ে বিস্তর জায়গায় আকস্মিক বন্যা হয়ে থাকে।

আকস্মিক বন্যা দুরকমের যথা- আগাম আকস্মিক বন্যা ও নাবী আকস্মিক বন্যা। বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই বিশেষ করে এপ্রিল মাসে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তবে জুলাই-আগস্ট মাসেও আকস্মিক বন্যার প্রার্দুভাব ঘটে। আকস্মিক বন্যা নিয়ে আগাম কিছু বলা বা ধারনা করা কঠিন। আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে সাধারণত তুমুল বৃষ্টিপাত, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, হ্যারিকেন, ঘূর্ণিঝড়, তুষারপাত, বরফগলন, বাঁধভাঙন এসব বিষয়গুলো দায়ী। নিয়মিত বা সাধারণ বন্যার সাথে আকস্মিক বন্যার পার্থক্য হলো ইহা আকস্মিকভাবেই  সংগঠিত হয়।

বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায়, মাত্র ০৬ (ছয়) ঘন্টা বা তার কম সময়ের মধ্যেই আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের জেলা যেমন সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্দা, লালমনিরহাট এসব জেলায় আকস্মিক বন্যা সংগঠিত হয়ে থাকে। সিলেট অঞ্চলের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায়  ব্যাপকভাবে আকস্মিক বন্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। আকস্মিক বন্যায় প্রবল ঝুকিপূর্ণ এলাকা হলো হাওড় বেষ্টিত সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোণা জেলাসমূহ।

বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা হওয়ার কারণ: বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা হওয়ার অন্যতম প্রধান কারন হলো উজানে থাকা ভারতের পাহাড় বেষ্টিত সবুজ সমারোহ মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত এবং দেশে দীর্ঘ সময় টানা বর্ষণ। পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত অঞ্চল চেরাপুঞ্জী ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত। ভৌগোলিক কারনে সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের মেঘালয়, আসাম রাজ্য টিলা, পাহাড় বেষ্টিত ভূ-প্রকৃতিগতভাবেই উঁচু। অর্থাৎ মেঘালয়, আসাম রাজ্য থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহ ভূসংস্থান অনুযায়ী ঢালু রয়েছে।

বৃষ্টির পানি পাহাড়ের গাঁ বেয়ে সহজেই বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহকে সহজেই প্লাবিত করে মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। তাছাড়া পানি প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রবল স্রোতের চাপে সংরক্ষিত বাঁধ ভেঙে গিয়েও আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের পাহাড়গুলোতে বনাঞ্চল ধ্বংস, পাহাড় কাটা সংশ্লিষ্ট এলাকাসহ বাংলাদেশে টানা বর্ষণে পানি জমে গিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, এমনকি সরু নালা বা পানি নিষ্কাশনের পথ প্রণালির অগভীরতা, প্রণালিগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া, দুর্বল বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত খাল খনন এসব কারণে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। আকস্মিক বন্যার বাস্তব পরিস্থিতি কেউ নিজ চোখে না দেখলে এর ভয়াবহতা কখনই উপলদ্ধি করতে পারবে না।


আকস্মিক বন্যার মূল শিকার হাওর: ভাটির দেশ বাংলাদেশ। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টুকরো টুকরো হাওর গুলোর চৌহর্দি মিলেই ভাটির দেশ বা ভাটি অঞ্চল। ভাষা বিজ্ঞানীরা বলেছেন সাগর থেকে সায়র; সায়র অপভ্রংশ হয়ে হাওর হয়েছে। বাংলাদেশে হাওর এলাকার আয়তন প্রায় ০৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৭৩ টি হাওর রয়েছে এই ভাটি বাংলায়। হাওরের বৃুকে, কিনারায় প্রায় ০২ কোটি মানুষের আবাস। বিশালাকার এই এলাকায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৭.৩ লাখ হেক্টর।

হাওর এলাকায় ধানই হলো প্রধান ফসল। প্রতি বছর প্রায় ৫.২৩ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হয়। ভাতের চাহিদা পূরণে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করে আসছে হাওর। হাওরে শস্য নিবিড়তা হচ্ছে প্রায় ১৪৭%। জিডিপিতে হাওরের অবদান ০৩%। বছরের একটি মাত্র প্রধান ফসল বোরো ধানের ওপর নির্ভর করতে হয় হাওরবাসীদের।  এই ফসলের উপরই নির্ভর করে বেঁচে থাকে ঐ এলাকার কৃষক। হাজার প্রতিকূলতায় কোনো কারণে ফসল  বিনষ্ট হলে কৃষকের মাথায় যেন বাজ পড়ে। তাই বোরো ফসল ঘরে না ওঠানো পর্যন্ত তারা খুবই দুশ্চিন্তায় থাকে। বোরো ধানের পাকা মৌ মৌ গন্ধ কৃষকদের বিমোহিত না করে বরং চোখের ঘুম কেড়ে করে নেয়। অতিবৃষ্টি, টানা বৃষ্টি, ঝড়োবৃষ্টি, বেড়িবাঁধ ভাঙন, শিলাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও ধান কাটার শ্রমিক সংকট এই নানা সমস্যা কৃষকদের সবসময় দুশ্চিন্তায় রাখে।  

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় করণীয়: আকস্মিক বন্যার করাল গ্রাস থেকে অপার সম্ভবনাময় হাওর, নি¤œাঞ্চল ও হাওরের ফসল রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। ফসল কৃষকদের নিজ সন্তানেরর মতই। ফসলকে বিনষ্ট হওয়ার সাথে সাথে কৃষকের মনের অবস্থা হয় সঙ্গিন। তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়, চরম কষ্ট পায়। তাছাড়া কৃষকের ক্ষতির পাশাপাশি দেশের খাদ্যশস্যের এবং অর্থনীতির মারাতœক ক্ষতি সাধন হয় ।  

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ী ঢল নির্মূল করা কঠিন তবে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে সুপরিকল্পিত উপায়ে শক্তিশালী স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, উপযুক্ত জায়গায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাঁধ নির্মাণ, প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখ হতে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখের মধ্যে বাধ নির্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ, দরদ দিয়ে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা, খাল খনন করা, নদী খনন করা, বন্যার পানির গতিপথ প্রশস্থ ও প্রবাহ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তাছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সুবিধাদি বৃদ্ধি, সরকারি বেসরকারি সুযোগ সুবিধায় যন্ত্রপাতি সহজলভ্য ও সহজীকরণ করা, কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার উপযোগী ও কার্যকরী করা প্রয়োজন। শ্রমিক মজুরী নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা দরকার। সম্ভব হলে আউট সোর্সিং এর মাধ্যমে সাথে সাথে শ্রমিক সরবরাহ করা যেতে পারে। সকলের সার্বিক চেষ্টায় একটা সামাজিক আন্দোলন তৈরি করে সম্মিলিত উদ্যোগে কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলা করার জন্য গবেষণা, স্বল্পজীবনকাল বিশিষ্ট নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন, কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রযুক্তিসমুহ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন, কৃষকের জন্য জীবন বীমা নিশ্চিত করা, ফসল বীমা নিশ্চিত করা, পরিকল্পিত টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ ও খাল, নদী খনন ব্যবস্থা, সম্মিলিত পরিকল্পিত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষি আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আর এই অর্থনীতির চালক হলেন স্বয়ং কৃষকসমাজ। কৃষক বাঁচলে, বাঁচবে দেশ: গড়বে সোনার বাংলাদেশ।
ছবি:সংগৃহীত