Thursday, 22 February 2018

 

সাপাহারে ঐতিহ্যবাহী জবই বিল খরা মৌসুমে মরা খাল ও বর্ষা মৌসুমে ভরা যৌবন

কাজী কামাল হোসেন,নওগাঁ:প্রাকৃতিক হরেক রকম মাছ ও পাখপাখালীতে ভরা এককালের ঐতিহ্যবাহী সাপাহার উপজেলার জবই বিল এখন তার আগের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে ঠুটো জগন্নাথের মত খরা মৌসুমে মরা খাল ও বর্ষা মৌসুমে ভরা যৌবন নিয়ে উপজেলার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

এলাকার প্রবীন ব্যক্তিদের নিকট থেকে জানা গেছে ৮০ দশকে কিংবা তারও পূর্বে ঐতিহ্যবাহী বিলটি সাপাহার উপজেলার জনসাধারণকে দু'ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। তখনকার দিনে সারা বছরই বিলটি পানিতে পরিপূর্ন ও প্রাকৃতিতে জম্ম নেয়া বহুপ্রজাতীর দেশীয় মাছ এবং নানা ধরনের কচুরীপানায় ভরে থাকত। কচুরী পানার দাপটে বিলের কোন অংশই ফাঁকা না থাকায় বিল জুড়ে কোথাও পানির দেখা মিলতনা। এসময় প্রতিবছর খরা মৌসুুমে বিলের পানি প্রাকৃতিক ভাবেই একটু কমলে বহু দুর দুরান্ত থেকে প্রতি সপ্তাহের রোববার ও মঙ্গলবার হাজার হাজার মানুষ বিলে মাছ ধরতে আসত।

তখনকার দিনে নিম্নে ১০/১৫ কেজি থেকে ১মন ওজনের বোয়াল, শোল, আইড়, সহ নানা প্রজাতির মাছ ধরা পড়ত মৎস্য শিকারীদের জালে, এছাড়া ওই বিলে মাছ ধরতে আসা মানুষদের মধ্যে প্রতিবছরই ১ জন করে মানুষ বড় বড় মাছের আঘাতে মারা যেত। সেসময়ে কুসংস্কার হিসেবে মানুষ এই বিলকে মানুষ খেকো বিলও বলত।

অপর দিকে প্রতিবছর শীতের সময় দেশীয় প্রজাতীর হরেক রকম পানকৌড়, নানা প্রজাতির বক পাখী, মাছরাঙ্গা, ধলেস্বরী, বার্লিহাঁস, ছন্নীহাঁস এমনকি সুদুর সাইবেরিয়া হতে অসংখ্য অতিথি পাখী এই বিলে আসত এবং প্রতিবছরই শীতকালে দেশের নানা স্থান এমনকি রাজধানী ঢাকা শহর থেকেও মানুষ পাখী শিকারের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ, বন্ধুক সহ এই বিলে পাখী শিকার করতে আসত। অতীতে বিলটিতে বার মাসই যে যার ইচ্ছেনুযায়ী মাছ ধরতে পারত। ১৯৮৬/৮৭ সালের দিকে তৎকালীন এরশাদ সরকার বিলটিকে নীতিমালার আওতায় এনে খাজনার মাধমে মৎস্যজিবীদের মাঝে লিজ প্রদান করে সরকারের রাজস্ব আদায় শুরু করে।

তখনকার দিনে মৎস্যজিবীদের তালিকা অনুযায়ী ওই এলাকায় প্রকৃত মৎস্যজিবীর সংখ্যা ছিল ৩১৭ জন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের দিকে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকার এ নীতমালা পরিবর্তন করে জাল যার জলা তার নীতির ঘোষনা দেয়, ফলে মৎস্য আইন ভঙ্গ করে যার যা ইচ্ছেনুযায়ী বিল হতে মৎস্যজিবীদের বিলে জমানো মা মাছ, পোনা মাছ সহ সব ধরনের মাছ নির্বিচারে নিধন করে বিলটিকে মৎস্য শূন্য করে ফেলে। যার কারণে এই এলাকায় মাছে ভাতে বাঙালী কথাটি ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।

এরপর ১৯৯৯ সালের দিকে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাপাহারে সরকারী সফরে এসে বিভিন্ন উন্নয়নে পাশাপাশী ওই এলাকার দরিদ্র মৎস্যজিবীদের ভাগ্যন্নোয়নে মাছ শূন্য বিলটিকে ঢেলে সাজানোর জন্য তৎকালীন সময়ে ৩ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা ব্যয়স্বাপেক্ষে বিলে একটি বৃহত মৎস্য প্রকল্প তৈরীর ঘোষনা দেন। এরপর ওই সরকারের শাসনামলে ডিজিটাল যুগ শুরু হলে আওয়ামীলীগ সরকারের তৎকালীন বানিজ্য মন্ত্রী জননেতা আব্দুল জলিল উপজেলার তিনটি বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নের মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা করে ওই এলাকার প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষের যাতায়াত ব্যাবস্থার উন্নয়নে বিলের মাঝখান দিয়ে একটি ২০০ মিটার ব্রীজ ও বিলের উপর ৫০০মিটার কজওয়ে/এপ্রোচ সড়ক নির্মান করেন।

এছাড়া বিলটি মৎস্য প্রকল্পের আওতায় আসায় মৎস্যজীবিন নিজদের ভাগ্যন্নোয়নে ওই বিলের সমস্ত কচুরী পানা তুলে ফেলে বিলটিকে একেবারে চকচকে ফেলেন ও তাদের মৎস্য চাষের প্রকল্প তৈরী করে প্রতিবছর বিলে মাছ ধরে নিজদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এমতাবস্থায় গত ২০০৬ সালে পুনরায় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে বিলে সাজানো প্রকল্পটি আবারো ভেঙ্গেচুরে শেষ করে বিলটিকে মৎস্য শূন্য করে ফেলে এর পর পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার পুনরায় রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় এসে দ্বিতীয়বারের মত পুনরায় বিলটিকে প্রকল্পের আওতায় এনে মৎস্য চাষ শুরু করেন।

বর্তমানে এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিলটি কচুরী পানা মুক্ত হওয়ায় সারা বছর বিলে বিভিন্ন কাজে মানুষ নেমে থাকায় শীতকালে সাইবেরিয়া হতে অতিথি পাখী আসাতো দুরের কথা এখন আর অতীতের মত কোন পাখী চোখে পড়েনা। তাই বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী বিল হতে হাজারো মানুষের জিবীকা নির্বাহ হলেও এখন আর অতীতের কোন ঐতিহ্য সাধারনত চোখে পড়েনা। বিলটি এখন অতীতের সকল ঐতিহ্য হারিয়ে ঠুটো জগন্নাথের মত শুধু মানুষের উপকার করে চলেছে।

বর্তমানে সাপাহার এলাকায় আনন্দঘন কোন মহুর্তে সময় কাটানোর জন্য চিত্তবিনোদনের কোন স্পট বা জায়গা না থাকায় প্রতিবছর দুই ঈদে এখানকার মানুষ ওই বিলে তাদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে গিয়ে বিলপাড়ে বিলের পানির স্পর্শ গায়ে লাগিয়ে কোন কোন সময়ে বাংলার ঐতিহ্য নৌকা বাইচ দেখে সময় কাটান। এলাকার পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষ বৃহত এই বিলের উভয় পাড়ে মাঝে মধ্যে অতিথিশালা বিশ্রামাগার নির্মান করে বিলটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেছেন। ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী এই বিলটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এলাকার মানুষের জন্য যেমন আনন্দ বিনোদনের উত্তম স্থান হবে ঠিক তেমনই বিভিন্ন স্থান হতে অসংখ্য পর্যকট তাদের মনের খোরাক হিসেবে এই বিলে এসে ভির জমাবে ফলে ডিজিটাল যুগে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি এখান থেকে সরকারেরও রাজস্ব আদায় হবে। তবে ইতো মধ্যেই সাপাহার উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে ৫০০মিটার এপ্রোচ সড়কের উভয় পাশে অতিথিদের বসার জন্য ইট সিমেন্ট বালি দিয়ে বেশ কিছু চেয়ার নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে প্রকৌশল বিভাগ থেকে জানা গেছে।