Wednesday, 15 August 2018

 

নওগাঁর চালকলের ছাইয়ে পরিবেশ বিপর্যয়

কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ:‘বাতাস হলেই ছাই উড়ে এসে চোখ-নাক-মুখে পড়ে। কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়ে যায়। খাবারের থালাতে পর্যন্ত ছাই উড়ে অ্যাসে পড়ে। হামরা আর এ গ্রামে থাকতে পাচ্ছি না। দিনকা-দিন যেভাবে চারদিকে বয়লার হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে কিছু দিন পরে হামাগেরে ভিটে-মাটি ছ্যাড়ে পালাতে হবে। হয় সরকার হামাগেরে ছাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করুক, না হয় অন্য জায়গায় বাড়ি করে দিক।’ ক্ষোভের সঙ্গে এ কথাগুলো বলেন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার আখেড়া গ্রামের গৃহবধু পূর্ণিমা রাণী।

শুধু পূর্ণিমা নয় এমন ক্ষোভ আর উৎকণ্ঠা ঝরছে চালকলের ছাইয়ে বিপর্যস্ত মহাদেবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আখেড়া, নাটশাল, দক্ষিণ হোসেনপুর, সিদ্দিকপুর, দুলালপাড়া, ধর্মপুর ও কুঞ্জবন গ্রামের বাসিন্দাদের।

ওই সব গ্রামের অন্তত ২৫ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চালকলের ছাইয়ের কারণে গ্রামের বাসিন্দাদের সেখানে বসবাস করা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ নীতির তোয়াক্কা না করে সড়কের দুই ধারে যত্রতত্র চালকলের ছাই ফেলায় বাসিন্দাদের মধ্যে বিভিন্ন রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি গাছপালা ও ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি মানুষের জীবনহানির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কের পাশে ফেলে রাখা এসব ছাই। ভুক্তভোগীরা পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে চালকল মালিকদের বারবার অনুরোধ করেও কোনো লাভ পায়নি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি তাঁরা।

জেলা চালকল মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলাতে ১ হাজার ১৮০টি চালকল রয়েছে। এর মধ্যে অটোমেটিক চালকল রয়েছে ৩৬৫টি। বাকিগুলো পুরোনো পদ্ধতির ম্যানুয়াল রাইস মিল। এগুলোকে স্থানীয় ভাষায় হাস্কিং মিলও। মহাদেবপুর উপজেলায় ৬৫টি অটোমেটিক চালকল ও ২২৯টি হাস্কিং মিল সহ মোট ২৯৪টি চালকল রয়েছে।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, নওগাঁ-নজিপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক ও মহাদেবপুর-পোরশা সড়কের পাশে উপজেলার আখেড়া, কুঞ্জবন, নাটশাল, ধর্মপুর ও দুলালপাড়া আবাসিক এলাকায় বেশ কয়েকটি অটোমেটিক রাইসমিল ও হাস্কিং মিল গড়ে উঠেছে। এসব চালকলের উৎপাদিত ছাই ফেলে রাখা হয়েছে নওগাঁ-নজিপুরসড়ক, আখেড়া-নাটশালসড়ক, মাতাজী-মহাদেবপুরসড়ক এবং মহাদেবপুর-পোরশা সড়কের পাশে। বয়লারের ছাই উড়ে এসে বাসাবাড়ির দেয়ালে, ছাদে, গাছপালার উপর পড়ে কালো স্তর পড়ে রয়েছে। এছাড়া বয়লারের তরল বর্জ্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন নালায়। তরল বর্জ্যরে উৎকট গন্ধের কারণে নালার পাশ দিয়ে চলার সময় পথচারীদের নাক চেপে ধরে পথ চলতে দেখা যায়।

কুঞ্জবন এলাকার বাসিন্দা গৌতম কুমার মহন্ত বলেন, ‘গত ২০ মার্চ তাঁর মেয়ে গৌরি রাণী মহন্ত (২২) মহাদেবপুরবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে দ্রুতগামী মাটি বহনকারী একটি ট্রলিকে (ট্রাক্টরচালিতট্রাক) সাইট দিতে গিয়ে রাস্তার পাশে রাখা ছাইয়ের স্তুপের মধ্যে পড়ে যায়। ছাই জলন্ত থাকায় তাঁর শরীর ঝলসে যায়। আমার মেয়ে এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাঁর শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে।’

ছাই চোখে পড়ে দুলালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ওই চোখ দিয়ে কোনো রকম দেখতে পান। আনোয়ার আগে পায়ে ঠেলা রিকশা চালাতো। চোখ নষ্ট হওয়ার পর এখন তিনি ভিক্ষাবৃত্তির পেশা বেছে নিয়েছেন।

আনোয়ার হোসেন জানান, আখেড়া মোড়ে রিকশা চালানোর সময় হঠাৎ চোখে ছাইপড়ে। তাৎক্ষণিভাবে সঙ্গে সঙ্গে চোখে পানি দিলে কিছুটা ভালো অনুভব করেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন পর চোখ দিয়ে পানি পরতে শুরু করে। পরে স্থানীয় বিভিন্ন চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নেন তিনি। তারপরেও তাঁর চোখ রক্ষা হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাবলে এ ধরণের অন্তত ২০-২৫ জন ভুক্তভোগীর নাম পাওয়া গেল, চালকলের ছাই পড়ে তাঁদের কারও চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আবার জ্বলন্ত ছাইয়ে অসাবধানতাবশত পা পড়ে কিংবা কোনো কারণে ছাইয়ে স্তুপে পড়ে গিয়ে কারও শরীর ও পা ঝলসে গেছে।

এছাড়া চালকল থেকে উদগীরন হওয়া ছাই কিংবা রাস্তার পাশে ফেলে রাখা ছাই উড়ে এলাকার পরিবেশের উপর মারাত্বক প্রভাব ফেলছে। গাছের উপর ছাই পড়ে আম, কাটাল, নারিকেল সহ ফলের গাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

মহাদেবপুর উপজেলা সদরের বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু দিন আগে পূর্নিমা রাণী এবং গত জানুয়ারি মাসে নাটশাল গ্রামে রাস্তার পাশে রাখা ছাইয়ে পড়ে গিয়ে সাত্তার মন্ডল নামের এক ব্যক্তির শরীর ঝলসে যায়। এ ধরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও চালকল মালিক সমিতির কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি চালকল মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নূন্যতম ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত দেয় না। এ দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে এক সময় মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচিও পালিত হয়েছে কিন্তু কোনো লাভই হয়নি। চালকল মালিকেরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’

মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আ. ম. আখতারুজ্জামান জানান, চোখের সমস্যা নিয়ে প্রায়ই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী আসেন। বেশিষ করে চোখে পড়া রোগীরা আসেন। এছাড়া রাস্তার পাশে ফেলে রাখা জ্বলন্ত ছাইয়ে পা পড়ে ঝলসে গিয়ে অনেক মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রতিদিন অন্তত তিন-চার জন রোগী এ ধরণের সমস্যা নিয়ে আসেন। বয়লারের ছাই ও কালো ধোঁয়া চোখের তাৎক্ষণিক কিংবা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, ফুসফুসের সমস্যা, অ্যাজমা, চর্মরোগ ও ব্রঙ্কাইটিসের মতো রোগের কারণ অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।  

সরেজমিনে দেখা যায়, আখেড়া এলাকায় মেসার্স বিসমিল্লা চালকলের কাছে আখেড়া-নাটশাল সড়কের পাশে স্তুপাকারে ছাই ফেলে রাখা হয়েছে। হালকা বাতাস কিংবা সড়ক দিয়ে দ্রুত গতির গাড়ি যেতেই ছাইগুলো উড়াউড়ি করছে। জানতে চাইলে বিসমিল্লা চালকলের মালিক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার চালকলের ছাই সব সময় এখানে ফেলে রাখি না। তবে কিছু দিন হলো ট্রাক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ছাই পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। তাই চালকলের কাছে ছাইগুলো ফেলে রেখেছি। দু-এক দিনের মধ্যেই ছাইগুলো অপসারণ করব।’

এ প্রসঙ্গে মহাদেবপুর উপজেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি আতাউর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘চালকলের ছাই যাতে রাস্তা পাশে কিংবা আবাসিক এলাকায় ফেলা না হয় এজন্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রায়ই আমাদের নির্দেশনা দেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে সভা করে এমনকি প্রত্যেক চালকল মালিককে চিঠি দিয়ে যত্রতত্র ছাই না ফেলতে আদেশ দিয়েছে। এরপরই অনেকেই রাস্তার পাশে গায়ের জোরে ছাই ফেলছে। এ বিষয়ে এখন প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।’

মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মকবুল হোসেন বলেন, ‘ইতোমধ্যে উন্নয়ন সভা ও আইন-শৃঙ্খলা মিটিয়ে চালকলের পরিবেশ দূষণের বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। আমি এখানে যোগদান করেই ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছি, ব্যবসা করলে অবশ্যই আইন মেনে ব্যবসা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যাঁরা রাস্তার পাশে ছাই ফেলছে, খুব শিঘ্রই তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ছাইকেন্দ্রিক কোনো শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায় কিনা, বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিদর্শক মকবুল হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘পরিবেশ নীতি অনুযায়ী প্রতিটি চালকলে ছাই ও তরল বর্জ্য ফেলার জন্য আঁধার বা পুকুর রাখতে হবে। কিন্তু নওগাঁর অনেক চালকল মালিক এ আইন মানছেন না। যাঁরা এ আইন মানছেন না তাঁদের প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রাখা হয়েছে। আইন কার্যকর করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপরেও যাঁরা আইন মানবে না তাঁদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলতি এপ্রিল মাস থেকে এ অভিযান পরিচালিত হওয়ার কথা।’