Wednesday, 22 November 2017

 

বাকৃবিতে কচ্ছপগতির ওয়াইফাইয়ে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা: ব্রডব্যান্ডের দাবি

আবুল বাশার মিরাজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ►একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তিগত বিপ্লব মানব সভ্যতার গতিপ্রকৃতি দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বদলে যাচ্ছে জীবনযাপন পদ্ধতি এবং জীবনমান। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার নিয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট সংযোগ বিড়ম্বনায় চরম  ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ডিজিটাল এ যুগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখনো মানসম্মত ইন্টারনেট সংযোগ পাচ্ছেন না। এতে শিক্ষার্থীরা তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে ক্ষোভ আর হতাশা।

জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র ফাইবার ক্যাবল ও ওয়াইফাই সিস্টেম স্থাপনের কাজ শুরু হয় গত ২০১৩ সালের জুন মাসে। সে বছর ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র ওয়াইফাইয়ের আওতায় আনার কথা থাকলেও নানাবিধ কারণে তা পিছিয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে ওয়াইফাই সংযোগ পেয়ে আনন্দে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রতিটি হলের জন্য মাত্র একটি রাউটার স্থাপন করায় হলের সবাই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেটা চিন্তা করে বিশ্ববিদ্যালয় হল প্রভোস্টরা ছেলেদের ৯টি হলে মোট ১২টি অতিরিক্ত রাউটার সংযোগ করেন। কিন্তু এরপরও চাহিদামত ইন্টারনেট সংযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। শামসুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাজবীর রহমান বলেন, আমাদের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ পাঠের বই ডাউনলোড করতে কিংবা কোন একটি মেইল পাঠাতে অনেক সময় লাগছে। সেবা গ্রহণের আশায় ওয়াইফাইয়ের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে উল্টো ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে আমাদের।  

দুঃখের বিষয় মেয়েদের ৪টি হলে পরবর্তীতে নতুন কোন রাউটার না লাগানোই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন ছাত্রীরা। বেগম রোকেয়া হলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, “হলে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে মোবাইল কোম্পানীর ইন্টারনেট ক্রয় করেও তা ব্যবহার করতে পারছি না।”

২০১৩ সালে ৩৮ এমবিপিএস ব্রান্ডউইথ দিয়ে যাত্রা শরু করলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ৩০১এমবিপিএস। সরকারি (বিটিসিএল) ব্যান্ডউইথের পরিবর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অনিক কম্পিউটারের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ কেনা হচ্ছে। অনিক আবার ব্যান্ডউইথ কোম্পানির নিকট হতে। প্রতি এমবিপিএসের জন্য বিনিময়ে  বিশ্ববিদ্যালয়কে গুনতে হচ্ছে ৬৫০টাকা। আর এ সমপরিমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যান্ডউইথ দিয়ে  সর্বমোট ৭০০৮টি সংযোগ ইন্টারনেট দেওয়া হয়েছে। আর এ সংযোগ দেওয়ার জন্য আইসিটি সেলে নিয়জিত রয়েছেন একজন স্যারের তত্ত্বাবধানে মাত্র ৬জন টেকনিশিয়ান। এদের মধ্যে ৫ জনই সাময়িক বেতনভুক্ত (মাস্টাররোল) কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি হল, অফিস, আবাসিক শিক্ষকের বাসায় সংযোগ ও মেরামতের কাজ তদারকি করে থাকেন। জনবল কম হওয়ায় তারা সার্বক্ষণিক সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে ওয়াইফাই সংযোগ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে প্রতিটি স্নাতক শিক্ষার্থীর জন্য সেমিস্টার প্রতি ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি কেউ যদি ওয়াইফাই নাও ব্যবহার করতে পারে, তাকেও গুনতে হবে সমপরিমাণ অর্থ।

সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হলগুলোর বেশির ভাগ কক্ষেই ওয়াইফাই পাওয়া যায় না। এদের মধ্যে শামসুল হক হল, ফজলুল হক হল, বঙ্গবন্ধু হলে সমস্যাটি বেশ জোরালো। ওয়াইফাই রাউটারের মাত্র কয়েক গজের মধ্যে থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এর ফলে শিক্ষার্থীদের রাউটারের নিচে ভিড় করতে দেখা যায়। রাউটারের নিচে গিয়েও ওয়াইফাইয়ের কচ্ছপগতির কারণে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। এমনকি মাঝে-মধ্যেই বিনা কারণে ওয়াইফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর একবার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দুই-তিন দিন লেগে যায় তা ঠিক করতে।

শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে চালুকৃত ওয়াইফাই সংযোগের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা শিকার হচ্ছেন ভোগান্তির। প্রয়োজনের সময় এ সুবিধা না পেয়ে এবং ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়েই ঝুঁকছেন বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির দিকে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের গুনতে হচ্ছে প্রচুর নগদ অর্থ। এমতাবস্থায় প্রসাশনের কাছে শিক্ষার্থীদের দাবি অতি দ্রুত যেন ওয়াইফাই গতির উন্নয়ন করা হয় এবং সবাই যেন নিজ কক্ষ থেকে এ সংযোগ পায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হলের আবাসিক ছাত্র আব্দুল আলীম, রোকনুজ্জামানসহ অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হলে ওয়াইফাই সংযোগ এই আছে এই নাই। সকালে নেট কানেকশন পাওয়া গেলে বিকালে নেই। বিকালে পাওয়া গেলে আবার রাতে নেই। এরকম ভোগান্তিতে বাধ্য হয়ে এখন মডেম ব্যবহার করছি।

অভিযোগের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবহলের প্রভোস্ট মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “আমিও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একমত। আমার কাছে এ বিষয়ে নিত্যই অভিযোগ আসে। আমার হলে প্রায় ৬০০ জন আবাসিক ছাত্র থাকে। হলের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সবাইকে ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পারছি না। আবার সর্বশেষ লাগানো রাউটার দিয়ে সর্বোচ্চ ৬০জন শিক্ষার্থী ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পারে। বাকিদের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব নয়। অতিরিক্ত রাউটার লাগানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি।”

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আশরাফ আলী বলেন, চাহিদার অনুপাতে আমাদের ব্যান্ডউইথের পরিমাণ খুবই কম। ব্যান্ডউইথের পরিমান ১০০০এর এমবিপিএসের  হলে সকল শিক্ষার্থীকে চাহিদামত ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পারবেন। একই সাথে আরও রাউটার স্থাপন করতে হবে। বিষয়টি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন। সরকারি  প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেন ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কেনা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফাইবার কাটাসহ বিটিসিএল এর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। আর বিটিসিএলকে অভিযোগ দিলে তারা কাজ করতে গাফিলতি করেন ও অনেক সময় নেয়। তাই বাধ্য হয়ে আমরা অন্যত্র হতে ব্যান্ডউইথ কিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট ব্যবস্থা সচল রেখেছি।

ব্রডব্যান্ড সংযোগের দাবি:
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অফিসারদের চেম্বার ও আবাসিক বাসভবনে তার যুক্ত ব্রন্ডব্যান্ড সংযোগ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এ সেবা পান না শিক্ষর্থীরা। অনান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় শিক্ষার্থীরা টাকা দিয়ে হলেও ব্রডব্যান্ড দিতে আগ্রহী। তারা বলছেন তার যুক্ত ব্রডব্যান্ড সংযোগের ব্যবস্থা করলে  সমস্যাটি টি থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব ও চাহিদামত ইন্টারনেট সুবিধা পাবেন।