Saturday, 22 July 2017

 

সৌন্দর্যের টানে সিলেট

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শেষবর্ষের শিক্ষার্থীরা পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের আয়োজনে সিলেট শহরে শিক্ষাসফরে যান। তারা ঘুরে বেড়ান সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলোতে। স্মৃতিময় সেই শিক্ষাসফর নিয়ে লিখছেন আবুল বাশার মিরাজ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবন মানেই ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও সেমিনার উপস্থাপনার এক ব্যস্ততম মুহূর্ত। এগুলো শেষ করে আবার ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে আবার হলে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডার স্থানগুলোতে যেন ব্যতিক্রম নেই। সেই জব্বারের মোড়, ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টি.এস.সি), গ্রন্থাগার ভবন, নদীর পাড়, বিজয় একাত্তর, মরণ সাগর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ছাত্রীহলের সামনের হতাশার মোড়, কামাল রঞ্জিত মার্কেট (কে.আর.মার্কেট), সন্ধ্যাভর গ্রুপিং অথবা দুই যুগল মিলে আড্ডা। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাতে ক্লান্তি এসে জড়ো হয় শরীরে। পরদিন ক্লাস টেস্ট অথবা অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে টুকটাক পড়াশোনা। এরপর গভীর ঘুম। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যময় আনন্দের জীবন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে এসে স্বাভাবিকভাবে সবাই অনেক বেশি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। কারণ শেষ হতে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্নাস লাইফের সুন্দর দিনগুলো। চার বছরে বন্ধৃত্বের বাঁধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এক সাথে ক্লাস করা ক্লাস শেষ করে চায়ের আড্ডার ঝড় তোলা দিনগুলো বুজি ফুরিয়ে আসছে। মনের কোণে এক ঝাঁক ভীষন্নতা ভর করে নিজের অৎান্তেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনগুলোকে আরও রাঙাতে ও জীবনের ক্যানভাসে  বেঁধে রাখতে আয়োজন করা হয় সিলেট সফর। শেষ শিক্ষা সফরটি সুযোগ এনে দেয় পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ। এ বিভাগের সকলের সহায়তায় এবং সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে শিক্ষা সফরের সকল প্রস্তুতি শেষ করা হয় কয়েক দিন আগেই। এবার শুধু বেরিয়ে পড়ার পালা।                                                                  

দিনটি ছিল বুধবার। বাহারি পোষাকে সজ্জিত হয়ে সন্ধ্যা ৭ টার দিকে সবাই জড়ো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যালিপ্যাডে। এখন শুধু যাত্রা শুরু করার পালা। রাত ১১ টার দিকে শুরু হল যাত্রা। ভোর চার টার দিকে সিলেট শহরে। থাকার বন্দোবস্ত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ একাডেমিতে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নাস্তা করে বেরিয়ে পরলাম। উদ্দেশ্য প্রকৃতি কন্যা হিসাবে সারাদেশে এক নামে পরিচিত সিলেটের জাফলং-এ। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের বিছানা জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। সীমান্তে ওপারে ভারতের পাহাড় টিলা। ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরাম প্রবাহমান জলপ্রপাতে জলে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে আছে বৃহৎ পাথর। দূরে ঝুলন্ত ডাউকি সেতু, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি, উঁচু পাহাড়ে গহীন অরণ্যের শুনশান নীরবতার ভেঙ্গে পাথরের বুক চিরে ভেসে আসা জলে সুমধুর সুর আমাদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে রাখে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে জাফলং বিউটি স্পট কিংবা সৌন্দর্যের রাণী- হিসেবেও  বেশ পরিচিত। সিলেট ভ্রমণে এসে জাফলং না গেলে ভ্রমণই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। সিলেটের বিখ্যাত পানসী রেস্টুরেস্টে দুপুরের খাবার শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম শহরের সৌন্দর্য দর্শনে। ছোট টিলায় ঘেরা শহর। কিছুক্ষণ পর চা বাগান শহরকে বেধে রেখেছে সবুজের মায়ায়। চা বাগান, সিলেট ক্যাডেট কলেজ, এম এ জি ওসমানী বিমান বন্দর, সিলেট স্টেডিয়াম দেখে গেলাম শাহ জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মৃদু আলো আধাঁরে ক্যাম্পাস যেন এক নিস্তব্ধ সৌন্দর্যের ডালি। ক্যাম্পাস থেকে সরাসরি শাহজালাল (রঃ) মাজার থেকে আবার সেই বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ একাডেমিতে।

দিনের প্রচন্ড গরম শেষে সন্ধ্যায় শান্তির পরশ নিয়ে আসে এক পশলা বৃষ্টি। বৃষ্টিস্নাত পরিবেশে ক্লান্তি ভূলে গল্প-গুজব, হাসি ঠাট্টা আর দুষ্টমিতে কাটে আমাদের সারা রাত। পরদিন ভোরে নাস্তা শেষ করে আবার গাড়ির ছুটে চলা। এবার উদ্দেশ্য দেশের বৃহত্তম একমাত্র প্রাকৃতিক জলপ্রপাত মাধবকুন্ড ইকোপার্ক। একটু এডভ্যাঞ্চার নিতে বাসের ছাদে চড়ে পাড়ি দেই সিলেট থেকে মাধবকুন্ড পর্যন্ত। মাধবকুন্ডের সুবিশাল পর্বত গিরি, শ্যামল সবুজ বনরাজি বেষ্টিত ইকোপার্কে নবীন-প্রবীন, নারী-পুরুদের উচ্ছ্বাস অট্টহাসি আর পাহাড়ী ঝরণার প্রবাহিত জলরাশির কল কল শব্দ স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখী, বন্য বানর ও কীটপতঙ্গের অচেনা সুর লহরী শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক ও ভ্রমণ পিপাসুদের মনে এন দেয় এক অনাবিল আনন্দ। সুউচ্চ পাহাড় শৃঙ্গ  থেকে শুভ্র জলরাশি অবিরাম গতিতে গড়িয়ে পড়ছে। পানি পতনের স্যাঁ স্যাঁ শব্দ অর্ধ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কখন শুরু আর কখন শেষ হবে স্রোতধারা কেউ জানে না। জলপ্রপাতের অবিরত স্রোতধারা প্রবাহিত হওয়ায় পাহাড়ের গা পুরোটাই কঠিন পাথরে পরিণত হয়েছে। ঝর্ণার স্বচ্ছ জলরাশিতে জলকেলি খেলায় মেতে উঠি আমরা। জলের সাথে আমাদের দুরন্তপানা, জলের চলার পথে শুয়ে পড়ে কৃত্রিম বাঁধ সৃষ্টি করার প্রয়াশ আগত পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। ইচ্ছেমত ঝর্ণার জলে ¯œান করার লোভ সামলাতে না পেরে আমাদের সাথে যোগ দেয় অন্যান্য দর্শনার্থীরাও। এর মাঝে চলে যুগল বন্দি হয়ে সেলফি এবং গ্রুপ ফটোশুট। মাধবকুন্ড যাওয়ার পথে চোখে পড়ে উচু নিচু পাহাড়ী টিলায় দিগন্ত জোড়া অসংখ্য চা বাগান, পাহাড়ী ঢলের সৃষ্টি সুতার মত গড়িয়ে চলা জলের লহরী। টিলার ভাঁজে ভাঁজে খাসিয়াদের পান পুঞ্জি ও জুম চাষ। পাহাড়ীদের সনাতনী বাড়িঘর আর উপজাতি ললনাদের চা পাতা সংগ্রহ কারা কিংবা পাহাড়ীর ঝর্ণার জলে তাদের গোসল করার দৃশ্য বা কলসীতে জল নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য যা সত্যিই অপূর্ব।

দুই দিনের শিক্ষা সফরের পুরোটা সময় নেচে গেয়ে আনন্দ দিয়েছে মাহী, মোশারফ, পায়েল, জনি, সোহান, মাসুম, ত্বোহা, মারিয়া, কাদেরসহ সবাই। ছবি তোলায় ব্যাস্ত থেকেছে সম্রাট, শিহান ও হাবীব। এছাড়াও আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার ছিল আজহার স্যারের নাচ ও সুমন স্যারের ক্লান্তিহীন গান। হয়ত কিছু দিনের মধ্যেই আমরা একে একে সবাই আলাদা হয়ে যাব, একই ক্লাসে আর চাইলেই বসা হবে না। ব্যস্ত হয়ে পড়বো নিজেকে নিয়ে। কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও হাতছানি দিয়ে পিছু ডাকবে এই অসাধারণ দিনগুলো।