Saturday, 18 November 2017

 

বোরো ধানে চিটা হওয়ার কারণ ও তার প্রতিকার

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ: প্রকৃতির সাথে কৃষির রয়েছে সুনিবিড় সম্পর্ক। ফসল উৎপাদনে আবহাওয়ার প্রভাব ঔতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা যতই সমৃদ্ধ হউক না কেন প্রকৃতির কাছে এখনও আমরা নিদারুন অসহায়।

অবশ্য প্রকৃতির সাথে সেতুবন্ধনেই আমাদের কৃষক এগিয়ে যাচ্ছে। ধান ফসলও আবহাওয়ার প্রভাবে দারুন প্রভাবিত। বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এই হলো ধান আবাদের বিন্যাস। শুধু আবহাওয়া জনিতকারণে এই বিন্যাসগুলোর রয়েছে স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য।

বোরো মৌসুম ঠান্ডা হিম শীতলের সমন্বয়ে নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ন) মাসে শুরু হয়। আর শেষটা হয় চরম গরমের এপ্রিল-মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) মাসে। বোরো মৌসুমের প্রতিটা দিনেই রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্যতা। গবেষণায় দেখা গেছে, ধান গাছ তার জীবনচক্রের মধ্যে কাইচ থোড় থেকে ফুল ফোটা পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত ঠান্ডা ও গরম সহ্য করতে পারে না। ঐ সময় বাতাসের তাপমাত্রা যদি ১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে অথবা ৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসের উপরে যায়, তাহলে ধানে ব্যাপকভাবে চিটা দেখা দেয়। তাছাড়া এ সময়ে খরা, ঝড়, পোকামাকড় বা রোগবালায়ের আক্রমন হলেও চিটা হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে ধানের জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তরে ক্রিটিক্যাল (নিম্ন) তাপমাত্রা:

গবেষণা মোতাবেক ধান গাছের জীবন চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রিটিক্যাল (নিম্ন) তাপমাত্রার একটি স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। ধানের জীবনচক্রের অঙ্কুরোদগম অবস্থায় ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস, চারা অবস্থায় ১৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস, কুশি অবস্থায় ১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস, থোড় অবস্থায় ১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং ফুল ফোটা অবস্থায় ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এর নিচে তাপমাত্রা চলে গেলে ফলনে মারাতœক প্রভাব পড়ে। এতে ফলন অনেক কমে যায়।

ধানে চিটা হওয়ার মূল কারণসমূহ:

স্বাভাবিকভাবে ধানে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ চিটা হয়। চিটার পরিমান এর চেয়ে বেশি হলে ধরে নিতে হবে থোড় থেকে ফুল ফোটা এবং ধান পাকার আগ পর্যন্ত ফসল কোনো না কোনো প্রতিকূলতার শিকার হয়েছে, যেমন অসহনীয় ঠান্ডা বা গরম, খরা বা অতিবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ¦া, পোকা ও রোগবালাই। একটু বিস্তারিত বলতে গেলে,

ঠান্ডা:  রাতের তাপমাত্রা ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ২৮-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (কাইচ থোড় থেকে থোড় অবস্থা অবধি) ধান চিটা হওয়ার জন্য মোটামুটি সংকট তাপমাত্রা। তবে এই অবস্থা পাঁচ/ছয় দিন শৈত্য প্রবাহ চলতে থাকলেই কেবল অতিরিক্ত চিটা হওয়ার আশংকা থাকে। রাতের তাপমাত্রা সংকট মাত্রায় নেমে আসলেও যদি দিনের তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর বেশি থাকে তবে চিটা হওয়ার আশংকা কমে যায়।

গরম: ধানের জন্য অসহনীয় তাপমাত্রা হলো ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি। ফুল ফোটার সময় ১-২ ঘন্টা উক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করলে মাত্রাতিরিক্ত চিটা হয়ে যায়।

ঝড়ো বাতাস: প্রচন্ড ঝড়ো বাতাসের কারণে গাছ থেকে পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়। এতে ফুলের অঙ্গসমূহ গঠন বাধাগ্রস্থ হয়। আবার ঝড়ো বাতাস পরাগায়ন, গর্ভধারণ ও ধানের মধ্যে চালের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এতে ধানের সবুজ খোসা  খয়েরি বা কালো রং ধারণ করে। ফলে ধান চিটা হয়ে যেতে পারে।

খরা: খরার কারণে শিষের শাখা বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং বিকৃত ও বন্ধ্যা ধানের জন্ম দেয়ায় চিটা হয়ে যায়।

শৈত্যপ্রবাহ বা ঠান্ডাজনিত কারণের লক্ষণসমূহ:

চারা অবস্থায় শৈত্য প্রবাহ থাকলে চারা মারা যায়। কুশি অবস্থায় বাড় বাড়তি কমে যায়, গাছ হলুদ হয়ে যায়, থোড় অবস্থায় শিষ পুরোপুরি বের হতে পারে না, শিষের অগ্রভাগের ধান মরে যায় বা সম্পূর্ণ চিটা হয়ে যায়।

প্রতিরোধের উপায়:

ফসল চক্রে নেমে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করা কঠিন। কিন্তু বোরো ধান অগ্রহায়নের শুরুতে বীজ বপন করলে ধানের থোড় এবং ফুল ফোটা অসহনীয় নিম্ন বা উচ্চ তাপমাত্রায় পড়ে না, ফলে ঠান্ডা ও গরম এমনকি ঝড়ো বাতাসজনিত ক্ষতি থেকেও রেহাই পাওয়া সম্ভব। চিটা ব্যবস্থাপনা করার প্রয়োজনীয় পরামর্শ হলো-

  • ব্রি ধান২৮ এর ক্ষেত্রে ১৫-৩০ নভেম্বরের মধ্যে এবং ব্রিধান ২৯ এর ক্ষেত্রে ৫-২৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ দীর্ঘ জীবনকাল সম্পন্ন (১৫০ দিনের উপর) ধানের জাতগুলো নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং স্বল্প জীবনকালের (১৫০ দিনের নিচে) জাতগুলো ১৫ নভেম্বর থেকে বীজতলায় বপন করতে হবে।
  • বোরো মৌসুমে কেবল ব্রি ধান ২৮ চাষ না করে বিআর ১, ব্রি ধান৩৫ ও ব্রি ধান৩৬ এর আবাদ করতে হবে।
  • বীজতলায় চারা থাকা অবস্থায় শৈত্য প্রবাহ চললে চারার উচ্চতা ভেদে ৫-১০ সেমি পানি রাখতে হবে। তাছাড়া স্বচ্ছ এবং পাতলা পলিথিনের ছাউনি দিয়ে শৈত্য প্রবাহ কালে দিনে ও রাতে আচ্ছাদিত রাখতে হবে।
  • চারা রোপনের জন্য ৩৫ থেকে ৪৫ বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। কুশি অবস্থায় শৈত্য প্রবাহ চললে জমিতে ১০ থেকে ১৫ সেমি পানি রাখতে হবে। তাছাড়া থোড় ও ফুল ফোটা স্তরে অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকলেও ১০ থেকে ১৫ সেমি পানি রাখলে চিটার পরিমাণ হ্রাস করা যায়।
  • অতি আক্রমনকাতর জাতের আবাদ পরিহার করা বা অবস্থার প্রেক্ষাপটে কৃষক আবাদ অব্যাহত রাখলে ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি পরিমিত ইউরিয়া সার ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
  • আকস্মিক বন্যা-প্রবণ এলাকায় বেড়িবাধ নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটু সহজ করে বলতে চাই, আমরা জানি, ব্রি ধান২৮ এর গড় জীবনকাল ১৪০ দিন। মনে করি, একজন কৃষক ২৫ নভেম্বর বীজতলায় বীজ বপন করল। ৪০ দিন বয়সের চারা মাঠে রোপন করেন (অর্থাৎ ০৪ জানুয়ারি)। মূল জমিতে চারা লাগানোর পর থেকে সর্বোচ্চ কুশি স্তর পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৪০ দিন (অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি)। অত:পর ধান গাছের প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তর শুরু হয়। ধান গাছে কাইচ থোড় থেকে ফুল ফোটা স্তর পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৩০ দিন (অর্থ্যাৎ ১৫ মার্চ)। পরবর্তীতে ধান পাকা পর্যায়ের দুধ স্তর শুরু হয়ে পরিপক্কতায় পৌছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে (অর্থ্যাৎ ১৫ এপ্রিল)।

এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রেক্ষিতে দেখা যায় জানুয়ারি মাস সবচেষে শীতল মাস। তাছাড়া এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে। হাওর অঞ্চলে আগাম বোরো ধান আবাদ করলে অর্থাৎ অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বীজতলা এবং ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে মূল জমিতে রোপণ করলে নিশ্চিত অতিরিক্ত ঠান্ডা কালীন সময়ে (১৫ জানুয়ারি) প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তর আক্রান্ত হয় ফলে চিটা হয়।

ঠান্ডাজনিত কারণে চিটা হলে আমরা এটাকে কোল্ড ইনজুরি বলে থাকি। আবার অনেক কৃষক ভাইয়েরা যদি একটু দেরিতে বোরো আবাদ করেন অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে বা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে তাহলে প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তরটি অতি গরমকালীন সময়ে (১৫ মার্চ) গরমে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে ধানে চিটা হতে পারে।

এক কথায় বলতে গেলে, ব্রি ধান২৮, ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সমযে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে সবচেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যায়। ব্রি ধান২৯, ২০ ডিসেম্বর হতে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে চিটার পরিমান কম হয় এবং ফলন বেশি হয়। তাই ব্রি ধান২৯ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ০৫ হতে ২৫ নভেম্বর এবং ব্রি ধান২৮ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ১৫ থেকে ২৫ নভেম্বর। তাই, উফশী নাবী জাতগুলো ৫ নভেম্বর এবং আগাম জাতগুলো ১৫ নভেম্বর থেকে বীজ বপন শুরু করলে ফসলের থোড়/গর্ভাবস্থা ১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করতে পারে, ফলে ঠান্ডা বা গরমের কারণে ধান চিটা মুক্ত হবে এবং ফলন বেশি হবে।

মোদ্দাকথা হলো ধানের কাইচ থোড় থেকে ফুল স্তর পর্যন্ত সময়টুকু অতিরিক্ত ঠান্ডা (জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রয়ারি) এবং অসহনীয় গরম (মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল) এ সময়ে ফ্রেমে যেন না পড়ে সেদিকে একটু বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের স্বাভাবিক কৃষি কাজ ও অগ্রগতিকে লন্ডভন্ড করে দেয়। ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। শৈত্য প্রবাহ, অসহনীয় উত্তাপ, ঝড়, বন্যা, পোকামাকড়, রোগবালাই এর প্রাদুর্ভাব সমূলে নির্মুল করা সম্ভব নয় তবে উপয্ক্তু ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। তাই কৃষকদেরই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। জয় হউক কৃষকের।

---লেখক: আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট।