Sunday, 19 November 2017

 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-মেয়েদের হল জীবনের মধুর গল্প

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) রয়েছে ছাত্রীদের জন্য রয়েছে সুবিশাল চারটি হল। হলে মেয়েদের কাটে মধুর সময়। মেয়েদের  কাছ থেকে জানা গেল,  সেইসব নানান গল্প। তাদের সেই হল জীবনের গল্প নিয়ে লিখছেন আবুল বাশার মিরাজ ছবি তুলেছেন শিশির মহন্ত-

জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা। জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্ত-টিকা। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কবিতার কথাগুলো আজ অনেকটাই পরিপূর্ণতা পেয়েছে। আর খুব বেশিদিন নেই যেদিন বাংলাদেশের সব মেয়েরাই জাগবে, সর্বক্ষেত্রে তারা জায়গা করে নিবে এটাই প্রত্যাশা। কেবলমাত্র শিক্ষাই পারে তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছেঁ দিতে। ইদানিং, শিক্ষাক্ষেত্রেও মেয়েরা তাদের দূরদর্শিতা প্রমাণ দেখিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর এস.এস.সি ,এইচ.এস.সি তে মেয়েদের পাশের হার সেটাই প্রমাণ করে। আজকাল পুরুষদের পাশাপাশি সমানভাবে বিভিন্ন পেশায় তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। রাজনীতি থেকে সমাজসেবা সহ বিভিন্ন কাজে মেয়েদের সুনাম এখন চারদিকে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন মেয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫২৪ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর  প্রায় ৪২ ভাগ। মেয়েরা বিশেষ কোন কোঠায় নহে, অদম্য মেধার পরিচয় দিয়ে ভর্তি হয়েছে প্রকৃতিকণ্যাখ্যাত চিরসবুজের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা হাতে-কলমে পাঠ নিচ্ছেন মাটি আর উদ্ভিদের। এরপরও তারা কিভাবে প্রবাসে থেকে পড়ছেন, সে বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সবাই বলেছেন, বেশ ভাল আছি। এমন মধুময় জীবন হারাতে চাই না। চলে যাওয়ার সময় অনেক কষ্টই পাবো। এর আগে চোখ মেলে দেখতে চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কিছু।

ঢাকা থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এবং ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে  ব্রহ্মপুত্র নদের প্রান্তে চিরসবুজে ঘেরা গ্রামীণ পরিমন্ডলে ১২০০ একর এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই প্রকৃতিকন্যার। শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ এ চার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ  থেকে প্রায় ৫৫ বছর আগে ১৯৬১ সালের ১৮ই আগস্ট যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠ। বর্তমানে কৃষি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ছাত্রী হলে জীবনযাপনে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তারপরও হল জীবনের সুখ-দুঃখ, পাওয়া না পাওয়া, টক-ঝাল-মিষ্টি নানান অভিজ্ঞতা।

শেখ ফজিলাতুননেসা মুিজব, তাপসী রাবেয়া সুলতানা রাজিয়া ও বেগম রোকেয়া হলের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী- লিখি, নাদিয়া, হ্যাপি, মনা, জান্নাত, নীলিমা, ইভা, দিশা, জেরিন, মীম, রিয়া, সাবিহা, সেতু, তন্বী, আরিফা, মুত্তাকী, কনক, তিথী, সাদিয়া, প্রিয়া, শাম্মী, তাজকিয়া, রুম্পা, প্রীতি, ইউশা, সোমা, সাথী, রেহেনা, শারমীন, সোনালী, মৌ ,ঝুমুর, নুসরাত, হীমা, মণিকা, ম্যানিলা, রাফিকা, তাসফিয়া, ফারিয়া, মাহিয়া, সৌমি, অস্মিতা, আফরিন, অদিতি, রীতিকা, দীপিকা, দোলা,  আরশি,  ফারহানা, নাবিলাসহ আরও অনেকে তাদের হল জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

ছাত্রী হলে সিট সঙ্কট থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হল জীবনের প্রথম বছর কাটে গণরুমে। এছাড়াও প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কিছু কিছু কাজে থাকে প্রতিকূলতা। তবে গণরুমের  মজাও রয়েছে অনেক। এখানে ঘুমানোর জায়গা কম হলেও আনন্দের পরিসীমা অনেক বিস্তৃত। হাসি-ঠাট্টা, নাচ-গান, একজনের খাবার অন্যজন জোর করে খাওয়া, বিশেষ করে আচার আনলে তো কথাই নেই। সেই সঙ্গে মাঝে মধ্যে মান-অভিমান, কিছু খুনসুটিও রয়েছে গণরুমে। তারপর ছয় মাস বা একবছর পর সুযোগ হয় ব্লকে থাকার। ব্লকের রুমের জীবন আবার সম্পূর্ণ আলাদা। চার শয্যাবিশিষ্ট রুম, পাশে বেসিন, রান্না করার জায়গা, লকার প্রভৃতি সুবিধা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আনন্দময় অভিজ্ঞতা টিভিরুম। কমনরুমে রয়েছে ইনডোর খেলার নানা সামগ্রী। টেবিল টেনিস, ক্যারাম, দাবা, লুডু খেলায় মেতে থাকেন ছাত্রীরা। সেমিস্টার সিস্টেম চালু থাকায় পড়াশোনার চাপ অনেক বেশি। সেই সঙ্গে আছে প্র্যাকটিক্যাল, নোট, অ্যাসাইনমেন্ট,  প্রেজেন্টেশন- যা ছাত্রীদের ব্যস্ততা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারপরও আড্ডার বিন্দুমাত্র কমতি নেই হলে। একবার শুরু হলে তা আর শেষ হয় না। কত যে বিষয় নিয়ে আড্ডা হয় তার কোন ইয়ত্তা নেই। মধুময় এ সময়গুলো খুবই মজাদার এবং কখনই ভুলবার নয়। যত গভীর রাতেই ঘুমাক না কেন সকাল ৮ টায় চোখ মুছতে মুছতে সবাই ক্লাসে যায় ঠিকই।

হল জীবনের আরও একটি উপভোগ করার মতো বিষয় হলো ফ্লোর ফিস্ট, এতে অনেক আনন্দ, আড্ডা, নাচ-গান, বিকালে শাড়ি পরে ঘুরতে বের হওয়া, সন্ধ্যায় প্রতিযোগিতামূলক খেলা, মজার মজার খাবার খাওয়া, সবকিছু মিলে অতুলনীয়। তবে ছোটদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে যেন কোন বড় আপু  যেকোন ভাবেই হোক কষ্ট না পায়, প্রচুর সম্মান দিতে হবে তাদের। তারা যেমন কটাক্ষ করে কথা শোনায়  তেমনি আবার স্নেহও করেন। এটা তেমন কোন ব্যাপার না। কেননা, টক-ঝাল-মিষ্টি তো থাকবেই, না থাকলেই বা কেমন হবে। এছাড়া হলে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করার সুযোগ হয়। খুব ভাল, খুব মন্দ, ধার্মিক, উচ্ছৃঙ্খল, আধুনিক, রাগী, বাচাল আরও যে কত ধরনের !

হলের কোন বান্ধবীর জন্মদিন পালন করা হয় খুব মজা করে। তাকে না জানিয়ে সবকিছু আয়োজন করে ঠিক রাত ১২.০১ মিনিটে সবাই মিলে হাজির হয় তার রুমে। তারপর হৈ-হুল্লোড় করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো, কেক কাটা, আনন্দ-উল্লাস করা হয়। পহেলা বৈশাখ বা কোন অনুষ্ঠানে সবাই মিলে দল বেঁধে বের হয় ঘুরতে। অবসরে চাঁদা তুলে কয়েকজনে মিলেও ভাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। অনেকে মাঝে মধ্যে বা প্রায় নিয়মিত রান্না করে খায়। এরপর সময় কাটে সিনেমা-নাটক দেখে, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। কেউ আবার সারা রাত পার হয়ে যায় ছেলেবন্ধুর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে। অনেক সময় বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে, কান্নাকাটি করে পরদিন না খেয়ে থাকা।

হলে অনেক পাওয়ার মধ্যে কিছু না পাওয়াও রয়েছে। শেখ ফজিলাতুনেছা মুজিব হলের ছোট্ট রুমে দুইজনের জায়গায় চার জনে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন মেয়েরা। মাত্র ৫ ফুটের করিডোর। এ যেন মুক্ত মানুষগুলোকে ইট-পাথড়ের চার দেয়ালের খুপড়িতে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। হল ডাইনিংয়ে খাবারের নিম্নমান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, ভাঙ্গা চেয়ার, টেবিল, বহু পুরাতন থালাবাসন প্রভৃতি প্রধান। হলে মশা নিধনের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে নিচ তলা থেকে চার/পাঁচ তলা পর্যন্ত চলে মশার দৌরাত্ম্য।

হলের টয়লেট, বাথরুমগুলো মেরামত জরুরি। প্রতিদিন সেগুলো পরিষ্কারও করা হয় না। ফলে অনেক ছাত্রী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়াশোনায় সঠিক ভাবে মনোযোগ দিতে পারছে না। সবকিছু মিলিয়ে হল জীবন একটা অসাধারণ জীবন। এখানে না আসলে এর মজা বুঝতে পারা খুবই কঠিন। অনেক বাস্তব একটা জীবনের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেয় এই হল জীবন। বন্ধুদের সঙ্গে অনেক রাত জেগে আড্ডা দেয়া, ছাদে বৃষ্টিতে ভেজা, জ্যোৎস্না উপভোগ করা, একসঙ্গে সবাই মিলে হঠাৎ  কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করা, ক্যান্টিনে বসে বিকালের নাস্তা করা, বড়দের সম্মান করা,  ছোটদের স্নেহ করা ইত্যাদি অনেক কিছুরই সুযোগ করে দেয় এই হল জীবন।