Sunday, 19 November 2017

 

স্বপ্নের ট্যুরের সারথীরা

মো মুস্তাফিজুর রহমান পাপ্পু,পবিপ্রবিঃবিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে দেশে কিংবা বিদেশে শিক্ষা সফরে যান।কখনো মাতৃভূমির অপার রুপের মহিমা দেখতে বেরিয়ে পড়েন দল বল নিয়ে। অনার্স জীবনে এমন ট্যুর হরহামেশা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে জুটলেও ব্যতিক্রম ছিলো পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিশাল ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে।

অজানা কারনে এই ধরনের শিক্ষা সফর ব্যতীত শিক্ষা জীবন শেষ করতে হতো এই ক্যাম্পাসের এনিমেল সায়েন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের শিক্ষার্থীদের। এই ট্যুর নিয়ে বিভিন্ন নানা আন্দোলনেও নামতে হয়েছে তাদের। বিভিন্ন স্থানে দাবি জানিয়েও কোন সুফল ভোগ করতে পারেন নাই। দেখতে দেখতে প্রায় ১০ টি ব্যাচএর শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করে ফেলেছেন। ইন কান্ট্রি ট্যুর যেন হয়ে গেলো এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের মত। অবশেষে এই ক্যাম্পাসের ডক্টর অফ ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম) ডিগ্রির ১১ ৩ম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ১ম বারের মত সেই স্বপ্নের ট্যুর সম্প্রতি শেষ করে ক্যাম্পাসে ফিরেছেন শিক্ষার্থীরা।

স্বপ্নের এই সব সারথীরা তাদের স্বপ্নের ট্যুর নিয়ে জানিয়েছেন তাদের নিজ নিজ মতামত। সাথে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি এন্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড এ কে এম মোস্তফা আনোয়ার এবং ফিজিওলজি এন্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা মিল্টন তালুকদার।

১০ নভেম্বর বরিশাল লঞ্চ ঘাট থেকে সী ট্র্যাকে চাদপুরের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরুর মাধ্যেমে ১০ দিনের এই শিক্ষা সফরের শুভ সুচনা হয়। ডিভিএম ১১ তম ব্যাচের ছাত্রী আনিকা অনি বলেন, “বাবুগঞ্জের ক্যাম্পাস থেকে ভোর বেলা বরিশাল লঞ্চ ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা, সেখান থেকে লঞ্চে করে লক্ষ্মীপুর, তারপর বাস যোগে বান্দরবন। লঞ্চে আড্ডা আর সেলফিবাজি, ক্লান্ত দেহে বাসে ঘুম এভাবেই চলে গেলাম বান্দরবন । জীবনে প্রথম এত বড় জার্নি, দেহে ক্লান্তির ছাপ আসলেও মনে ক্লান্তি কখনই আসে নি, একবারও না। পরের দিন চাঁন্দের গাড়ির সামনের সিটে বসে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি, প্রচন্ড পা ব্যাথা নিয়েও চিম্বুক, নীলাচল আর নীলগিরিতে পদচিহ্ন একে দিলাম”

বান্দরবনের অপার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের গন্তব্য হয় বিশ্বের সর্ব বৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। কক্সবাজারে পৌছে লাফালাফি, মাতামাতি ছিল সীমাহীন। সমুদ্রের গর্জন, বীচে ফুটবল খেলা, বন্ধুদের সাথে মজা মাস্তি, কেনাকাটা কোন কিছুই বাদ যায়নি। দল বেধে সমুদ্রস্নান ও নতুন মাত্রা দিয়েছে তাদের এই সফরে। পরের দিন পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশের দারুচিনি দ্বীপে। সেন্টমার্টিনের অপরূপ সৌন্দর্য্যেকে হাতের কাছে পাওয়ার লোভে অনেকে বিনিদ্র রজনী পার করেছেন।

অপর শিক্ষার্থী পার্থ ব্যানার্জী বলেন, “এতদিন দারুচিনি দ্বীপের মুগ্ধতা পত্র পত্রিকায় পড়েছি, টিভিতে দেখেছি আজ সেই স্বপ্ন সার্থক হলো, সত্যিই কি অপরূপ রুপের অধিকারিণী আমাদের এই দেশ”

নারিকেল জিঞ্জিরাতে একসাথে সাইক্লিং, ডাব খাওয়া, প্রবালের মধ্যে ছবি তোলা, এক সাথে দল বেধে ঘুরে বেড়ানোতে বেশি মজা করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সেন্টমার্টিন রাত্রিযাপন করে পরের দিন শিক্ষার্থীরা রওয়ানা দেন চট্টগ্রামের দিকে। চট্টগ্রামের খুলশীতে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা সময় ঘুরে বেড়াতে গিয়ে আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন তারা।

রাত্রে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের উদ্দ্যেশে আবারো যাত্রা শুরু। এবার যানবাহন ঝক ঝকা ঝক ট্রেন। ঝক ঝকা ঝক ট্রেন চলেছে রাত দুপুরে ঐ, ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই ? কবি শামসুর রাহমানের এই কবিতা ছোটবেলায় প্রত্যেকে পড়লেও অনেকের জীবনে ১ম ট্রেন জার্নি ছিল এটা।
জীবনের ১ম ট্রেন জার্নির অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ছাত্রী সাবরিনা মিতু বলেন, “এক কথায় অসাধারণ, স্কুল কলেজ ভার্সিটি সব নিজ এলাকায়, মা বাবার বাধ্যবাধকতার মধ্যে সব সময়। স্বাধীনতা যে কত প্রশান্তি তা আমার থেকে কেউ বুঝেনি। পাহাড় নদী সাগর আর মেঘ ছুঁয়ে দেখার আনন্দ জীবনে ভোলার নয়। সারা রাতের ট্রেন জার্নির পর অভিযাত্রীরা পৌছে যান চায়ের দেশে। হযরত শাহজালাল (রহঃ) মাজার দেখে রাত্রে হোটেলে বিশ্রাম। পরের দিন জাফলং এর পানিতে গোসল অন্য রকম আনন্দ দিয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের। লেলিন মজুমদার বলেন, “ সিলেটে গিয়ে আমি মুগ্ধ, বিশেষ করে বিছানাকান্দি, জাফলং, চায়ের বাগান, সত্যিই অস্থির ছিলো সব”। সিলেটের পর্ব শেষ করে ঢাকা হয়ে আবারো বরিশালের উদ্দ্যেশে যাত্রা।

শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে মধুর সময়টূকু শেষ করে ফেলেছেন বলে মনে করছেন কেউ কেউ। সাদনান বাপিল বলেন, “আসাধারণ!! ক্যাম্পাস ছাড়ার আগে অনেক জল্পনা কল্পনা। ট্যুর আসলেই হবে কি হবে না । যখন বাসে উঠলাম বিশ্বাসই হচ্ছিল না ট্যুরে যাচ্ছি। জীবনের সেরা ১০টা দিন কাটাইলাম। বাসে গলা ছেড়ে গান রাতে ১ টা পর্যন্ত সি বিচে চন্দ্রস্নান । চান্দের গাড়িতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার। জাফলং বিছানাকান্দিতে গোসল, গান। নির্ঘাত ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় চোখ অশ্রুসিক্ত হবে এ দিনগুলোর কথা মনে করে। জার্নির ক্লান্তি ছিল ঠিকই কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী। আনন্দটাই বেশি করেছি। সব ক্লান্তি সাগরের ঢেউয়ে, প্রকৃতির যৌবনে ভেসে গেছে। পাশাপাশি ছোটখাটো রোমান্স তো ছিলই। ভুলবোনা দিনগুলো কোনদিন।যদিও আমার গলা ভাঙছিল ২ দিন পরই। তারপরও চিল্লানি থামাইনি। আনন্দের দিনগুলো কত তাড়াতাড়ি চলে যায়। বুঝতেই পারিনাই কিভাবে ১০টা দিন কেটে গেল। স্যাররা বলছিলেন ৭ দিন পর আর তোমাদের এনার্জি থাকবে না। ১০ দিন কাটার পরও আমরা বলছিলাম স্যার ট্যুর আরও ১০ দিন বাড়ান!!

বেচে থাকুক স্মৃতিরা অমর হয়ে। জীবন্ত হয়ে থাকুক এই মধুর স্মৃতি গুলো” নেপালী ছাত্র দিবেন্দ্র সাহা বলেন, “বাংলাদেশের এত রূপ, এত সুন্দর, এই ট্যুরে না আসলে বুঝতেই পারতাম না” । ছাত্র রনজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, “মানুষ সারাজীবন বাঁচে সুখের খোঁজ করতে করতে। আমরা কিছুটা হলেও সে সুখ খুঁজে পেয়েছি। পাহাড় কিংবা সমুদ্রের কাছে দাঁড়িয়ে ছোটবেলার পড়া কবিতা “পাহাড় আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে, কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে” মনে পরে গিয়েছিল। নিজেকে খুবই উদার মনে হচ্ছিল। হা করে উপভোগ করছিলাম বাংলার প্রকৃত রূপ।

রবি ঠাকুরের লেখা “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি/কি শোভা কি ছায়া গো কি স্নেহ কি মায়া গো.........” এই গানের সারমর্ম খুঁজে পাচ্ছিলাম। গলা ছেড়ে যে গান ছোটবেলা থেকে গেয়েছি সেই গানের আসল রূপ দেখতে পেলাম এই ২২ বছর বয়সে এসে। কি সুন্দর এই দেশ, আমার প্রিয় বাংলাদেশ। আমাদের সকলের অংশগ্রহণে এই সফর খুব ভালো ভাবেই শেষ হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞ সকলের কাছে। আমার খুব বলতে ইচ্ছা করে আমি বাংলাদেশকে দেখেছি আমি আর কিছু দেখিতে চাই না ।