Thursday, 23 November 2017

 

সৌন্দর্যের আঁধার অর্কিড

খন্দকার শফিকুর রহমান, উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা, টাঙ্গাইল সদর: বিশ্বজোড়া সৌন্দর্যের আঁধার অর্কিড। জীবনের প্রতিচ্ছবি। বি¯তৃত ও উন্নত সপুস্পক উদ্ভিদ। এ বিশাল উদ্ভিদ শ্রেণীর প্রায় ১৭ হাজার প্রজাতি ও বিভিন্ন রকমের পুষ্পবিন্যাস রয়েছে। অদ্ভূত ধরনের ফুলের পাঁপড়ি। মিষ্টি গন্ধ। তবে সব অর্কিডের পাতা ভেলভেটের মত নরম। তাতে সোনালী শিরা-উপশিরা ও রূপালী জাল বিছানো। অর্কিডের বৈচিত্র্যময় সমারোহ খুবই মনোমুগ্ধকর।

এর আকর্ষণে পাগল হয় ভ্রমররা, পাগল হয় প্রজাপতি। আনন্দ, উদ্বেগ চিত্তে পরাগ সংযোগ করে। মানুষ হয় দিশেহারা। অর্কিডের ফুলের ভেতর অনেক পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি ফুল দু’ভাগে বিভক্ত। এদের মধ্যে ৩টি ভেতরের অংশ। পেছনের অনেকগুলোকে পাঁপড়ি বলে এবং এগুলো কম-বেশি একই আকৃতির হয়। সব থেকে পেছনের অংশটিকে পুষ্প পাঁপড়ি বলে। ভেতরের তিনটি অংশের মধ্যে একটি খুবই অসমান এবং তার আকৃতি ও রঙে পার্থক্য দেখা যায়। এদের ঠোঁট বা ক্রোড়পত্র বলে। এগুলো সম আকৃতির হয়।

ফুলের মধ্যে একটি ছোট অথচ মোটা ডাটা থাকে। ফুলগুলো এই ডাঁটার উপরিভাগে সংযুক্ত থাকে। অর্কিডের গর্ভমুন্ডটি ঠোঁটের দিকে ঢাকা অবস্থায় থাকে। তার ওপর একটি গর্ভাকৃতি অংশের আঁঠাল পরাগরেণু ও ডিম্ব থাকে। এর সাহায্যে পরাগ সংযোজিত হয়। বেশিরভাগ অর্কিড পরাশ্রয়ী গাছ। কান্ড থেকে যে অস্থানিক মূল জন্মায়, তারা আশ্রয়দাতাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। কিন্তু এরা আশ্রয়দাতার রস শোষণ করে না। অর্কিড বাতাস থেকে নিজের খাদ্য জলীয় বাষ্প আহরণ করে বেঁচে থাকে।

সমভূমিতে অর্কিড বেশি জন্মায় না। কিছু কিছু অর্কিড মূল মাটিকে আঁকড়ে ধরে অন্যান্য গাছের মতো জন্মায়। এগুলোর মূল গুচ্ছ বা কন্দাকৃতির হয়। কান্ড লতিয়ে কন্দের মত হয়। এই শ্রেণীর অর্কিডকে মৃত্তিকাশ্রয়ী গাছ বলে। কিছু কিছু অর্কিডে কোন প্রকার সবুজ কণা বা সবুজ অংশ একেবারে থাকে না বল্লেই চলে। এগুলো পচা বা জৈব সারের ওপর জন্মায়। এই প্রজাতি নিজেদের বাঁচার জন্য খাদ্য তৈরি করতে পারে না; এদের বলে জৈবস্রষ্টা। এ ধরনের গাছে খুব ছোট ছোট ফুল হয়।

গাছ বৃদ্ধির স্বভাব অনুযায়ী অর্কিডের কান্ডের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এ জাতকে মনোপান্ডিয়াল বলে। আমেরিকা, ব্রাজিল এবং ভারতবর্ষের উষ্ণ অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের অর্কিড জন্মে। এখন পৃথিবীর সব স্থানেই প্রাকৃতিক উপায়ে অর্কিড চাষ করা হয়। সাধারণ গাছের মত স্বাভাবিক সূর্যালোকে অর্কিড বাঁচে না। ভোরের প্রথম রোদটি অর্কিডের জন্য খুব উপকারী। অর্কিড ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যে গাছ আলোতে বাঁচে না, সে গাছ ছায়াতে রাখতে হবে। বাঁশের কঞ্চি দিয়েও অর্কিড ঘর তৈরি করা যায়।

অর্কিড টবে বসানোর পদ্ধতি: ছিদ্রযুক্ত মাটির টবে বাড়ন্ত অর্কিড লাগাতে হবে। যে সমস্ত টবে বা কাঠের ঝুড়িতে অর্কিড বসান হয়, এতে প্রথমে পোড়া ইটের টুকরো বা মাটির ঢেলা দিয়ে একটি ন্তর তৈরি করতে হবে। সাথে কিছু জৈব সারের মিশ্রণ থাকবে একে কম্পোষ্ট পদ্ধতি বলে। কম্পোষ্ট যেন জমে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ৫ শতাংশ ইটের টুকরা এবং এক শতাংশ ফার্নের বা মলের ছোবড়া থাকবে।

ছোবড়াগুলো ভাল করে রেখে শুকিয়ে আঁশগুলো বের করে নিতে হবে। ছোবড়ার গায়ে যেন গুঁড়ো লেগে না থাকে। ছোবড়ার রং হালকা ধূসর হবে। ইটের টুকরোতে পানি জমে থাকে না বলে বাতাস চলাচলে সুবিধে হয়, এই পাত্রে অর্কিডটি বসিয়ে প্রয়োজন বোধে কাঠের খন্ড দিয়ে ঠেকের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব কাঠের খুঁটি সহজে পচে যায়, সেগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়। নারিকেলের দড়ি বা তামার পাত দিয়ে ঠেকের সঙ্গে অর্কিড গাছ বেঁধে দিতে হবে। অর্কিড রাখার পাত্র বা টব পরিষ্কার রাখতে হবে। ছত্রাক বা কীট-পতঙ্গের হাত থেকে রক্ষার জন্য ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। অর্কিড চাষের জন্য অসুমন্ডা পলিপাডিয়াস বা পাখির বাসা বা গাছ ফার্নের শিকড়যুক্ত গুঁড়ি খুবই উপযুক্ত।

অর্কিড পাত্রের দেয়া সবকিছুর কার্যকারিতা দু’ থেকে তিন বছরে শেষ হয়ে যায়। তাই দু’বছর অন্তর পাত্রের সমস্ত অংশগুলো পরিবর্তন করতে হয়। এ সময় পাত্র ভালভাবে পরিষ্কার করে গাছের মরা, পচা শিকড় বেছে ফেলে দিতে হবে। তাহলে ভাইরাস ছত্রাক রোগ গাছের ক্ষতি করতে পারবে না। জাব পোকা লাল মাকড়শার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কীটনাশক স্প্রে করা। এছাড়া হালকা সাবান পানি ব্যবহার করা যায়।

অর্কিড প্রজনন খুব কঠিন। ড্রেনড্রেশিয়াস ও অন্যান্য অর্কিডে যখন লম্বা ঝাড় হয়, তখন তাকে কয়েক খন্ডে টুকরো করে টবে বা আঁধারে লাগান হয়। রেনাথাম ভেনডাম জাতের অর্কিড শিকড়সহ টুকরো করে আঁধারে লাগাতে হয়। কিছু কিছু কোলজিন লিয়াজিন এবং প্রিয়োন অর্কিডে নিছক কন্দের ওপর ছোট ছোট কন্দ হয়। এ থেকে গাছের বংশ বিস্তার হয়। বাতাসে আর্দ্রতা সব সময় একই রকম থাকে না বলে আমাদের দেশে গাছের প্রসারতা বেশি বাড়ে না। তাছাড়া পুরনো পদ্ধতিতে গাছের বংশ বৃদ্ধি ততটা উন্নত নয়। বিভিন্ন দেশে আধুনিক পদ্ধতি টিসু কালচারের মাধ্যমে ব্যাপক ভিত্তিতে চারা করা হয়। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা থাকলেও এর আরও সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে পারলে প্রচুর ফুল পাওয়া যেত। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে এই কাঠফুল বিক্রি করে প্রচুর মুদ্রা আয় করা যেত।

বিদেশে বিশেষ করে জাপান, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি স্থানে নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সৃষ্টি করে উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগে এই কাঠফুল বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। বিদেশী অর্কিডগুলো নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে করা হয়। তাই কোন কোনটির গন্ধ থাকে না। তবে বস্তুত অর্কিডে গন্ধ দীর্ঘদিন থাকে। ঘরে রাখলে সুগন্ধির মত ব্যবহার করা যায়। বিদেশ থেকে আনা গাছগুলো খুব সতেজ থাকে। আমাদের এখানের আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় মরেও যায়।